Published : 12 Nov 2025, 04:55 PM
ভালোবাসা কখনও মধুর, কখনও বিভ্রান্তিকর। কখনও কেউ কাছে আসে, আবার হঠাৎ দূরে সরে যায়।
এই টানাপোড়েনের সম্পর্ককেই মনোবিজ্ঞানে বলা হয় ‘ডিসঅর্গানাইজড অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’ বা ‘বিক্ষিপ্ত সংযুক্তি ধরন’।
এক মুহূর্তে আপনি বা আপনার সঙ্গী ঘনিষ্ঠতা খোঁজেন, পরের মুহূর্তেই অজানা আতঙ্কে দূরে সরে যান।
এই সম্পর্কের ওঠানামা অনেক সময় মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে, যা বোঝা না গেলে সম্পর্ক ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
মনোবিজ্ঞানের বৃটিশ গবেষক জন বোলবি এবং কানাডা নিবাসী মনোবিজ্ঞানী মেরি এইনসওর্থ প্রথম এই ‘সংযুক্তি তত্ত্ব’ তৈরি করেন।
তাদের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে মনো-দৈহিক চিকিৎসা-বিষয়ক ওয়েবসাইট কাম ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- শিশুকালে অভিভাবকের সঙ্গে যেভাবে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ভবিষ্যতে প্রেম, বন্ধুত্ব বা বিবাহেও সেই ধারা প্রভাব ফেলে।
সংযুক্তি ধরনের চার রূপ
মনোবিজ্ঞানীরা মূলত চার ধরনের সংযুক্তি শনাক্ত করেছেন-
নিরাপদ সংযুক্তি: বিশ্বাসযোগ্যতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকে।
উদ্বিগ্ন সংযুক্তি: ঘনিষ্ঠতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু পরিত্যাগের ভয়।
বিচ্ছিন্ন সংযুক্তি: স্বাধীনতার আকর্ষণ, কিন্তু আবেগে দূরত্ব।
বিক্ষিপ্ত সংযুক্তি: ঘনিষ্ঠতার আকাঙ্ক্ষা ও ভয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
চতুর্থ ধরনটি-ই সবচেয়ে জটিল। কারণ এখানে একসঙ্গে থাকে ভালোবাসা ও আতঙ্ক— যেন সম্পর্কই একইসঙ্গে নিরাপদ ও বিপজ্জনক।
বিক্ষিপ্ত সংযুক্তির মূল কারণ
শৈশবে যেসব শিশুর অভিভাবক কখনও স্নেহশীল, কখনও রূঢ় বা অনুপস্থিত— তাদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একদিকে ভালোবাসার প্রয়োজন, অন্যদিকে ভয়।
মনোবিশ্লেষকরা বলছেন- এমন শিশু বড় হয়ে প্রেম বা বিবাহে এই দ্বন্দ্ব বহন করে আনে।
এমন অভিজ্ঞতা হতে পারে অবহেলা বা মানসিক নির্যাতন, মাদকাসক্ত বা মানসিকভাবে অস্থিতিশীল অভিভাবক, হঠাৎ বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর আঘাত।
ফলাফল হিসেবে গড়ে ওঠে এক ধরনের অবচেতন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাকে বিপদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে।
সম্পর্কের ভেতরে কেমন রূপে দেখা দেয়
এই সংযুক্তির ফলে সম্পর্কের মধ্যে দেখা দেয় কয়েকটি আচরণগত ধরন।
আবেগের দোলাচল: এক মুহূর্তে ভালোবাসা, পরের মুহূর্তে শীতলতা।
ঘনিষ্ঠতার ভয়: ভালোবাসা পেলেও তা সহ্য করতে না পারা।
হঠাৎ দূরে সরে যাওয়া: সংবেদনশীল আলোচনার সময় চুপ হয়ে যাওয়া বা সাড়া না দেওয়া।
নিজেকে সুরক্ষিত রাখা: ভালোবাসাকে নিয়ন্ত্রণ বা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চাওয়া।
অতিরিক্ত সতর্কতা: সঙ্গীর আচরণে ক্রমাগত সন্দেহ বা ভয়ের প্রতিক্রিয়া।
মনোবিজ্ঞানী তামারা লেভিট, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘কাম অ্যাপ’–এর সঙ্গে যুক্ত, তিনি বলেন, “এই ধরনের মানুষ আসলে ভালোবাসাকে ভয় পায় না, বরং নিরাপত্তা হারানোর আশঙ্কায় নিজেদের আড়ালে রাখে।”
নিরাময়ের সাত উপায়
নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন: আপনি কি ভালোবাসা পেলে ভয় পান? নাকি ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবুন। ডায়েরিতে লিখে ফেলুন কী ঘটল, কী অনুভব করলেন, শরীর কেমন প্রতিক্রিয়া জানাল।
নিয়মিত পর্যবেক্ষণে নিজের মানসিক ধারা বোঝা সহজ হয়। সচেতনতা হল পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
স্নায়ুতন্ত্র শান্ত: বিক্ষিপ্ত সংযুক্তিতে অনেক সময় শরীরের প্রতিক্রিয়া বাস্তবতার চেয়ে বেশি তীব্র হয়। তাই বড় কোনো আলোচনার আগে নিজেকে স্থির করতে হবে। হাঁটা, গভীর শ্বাস নেওয়া, ঠাণ্ডা পানি পান বা চারপাশে দৃশ্যমান পাঁচটি জিনিস লক্ষ করা। এতে মস্তিষ্ক শান্ত হয়, নিজে স্পষ্টভাবে ভাবতে পারেন।
নিরাপদ সম্পর্কের চর্চা: শুরুতেই প্রেমের সম্পর্কে না গিয়ে বন্ধুত্ব, সহকর্মী বা পরিবারের সঙ্গে ধীরে ধীরে সংযোগ গড়ে তোলা উচিত। নিয়মিত যোগাযোগ, সময়মতো সাড়া দেওয়া বা একসঙ্গে কোনো সাধারণ কাজ করা— এসব অভ্যাস নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে।
প্রতিক্রিয়ার আগে বিরতি: বিক্ষিপ্ত সংযুক্তির মানুষরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে প্রতিক্রিয়া দেখান— কেউ সাড়া না দিলে তাৎক্ষণিক রাগ, ভয় বা প্রত্যাখ্যানের অনুভূতি জাগে।
‘কামঅ্যাপ’-এর আরেক মনোবিজ্ঞানী জে শেঠি পরামর্শ দেন, “বিরতি নিন, হাঁটুন বা কয়েক মিনিট চুপ থাকুন—তারপর সাড়া দিন।”
এতে অস্থিরতা কমে ও সম্পর্ক স্থিতিশীল হয়।
ভালোবাসাকে অর্জন নয় বরং গড়ে তুলতে হবে: অনেকেই মনে করেন ভালোবাসা পেতে হলে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়— অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া, ত্যাগ করা কিংবা চুপচাপ সহ্য করা।
তবে প্রকৃত ঘনিষ্ঠতা আসে যখন দুজনেই নিরাপদ বোধ করেন। নিজেকে বদলানোর নয়, গ্রহণ করার সুযোগ দিন।
ক্ষুদ্র সাফল্য উদ্যাপন: বড় পরিবর্তনের আশা না করে ছোট অগ্রগতি লক্ষ করা, যেমন- ভয় পেলেও মেসেজের জবাব দেওয়া, রাগের মুহূর্তে কথা না বাড়ানো বা আলোচনার আগে সময় চাওয়া।
এই ছোট ছোট মুহূর্তই আসল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ট্রমা–সচেতন থেরাপিস্টের সহায়তা: মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিক্ষিপ্ত সংযুক্তি নিরাময়ের জন্য ‘ট্রমা-ফোকাসড থেরাপি’ বা ‘সোমাটিক এক্সপেরিয়েন্সিং’ খুব কার্যকর।
একজন থেরাপিস্ট নিরাপদ পরিবেশে পুরানো ট্রমার প্রতিক্রিয়া শনাক্ত করতে সাহায্য করেন।
আরও পড়ুন