Published : 26 Jun 2026, 12:04 AM
তিস্তা প্রকল্পে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন তিয়াওইউথাইয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে আসেন মুখপাত্র।
তিনি বলেন, “তিস্তার প্রজেক্টের বিষয়ে আমাদের একটা মহাপরিকল্পনা রয়েছে যেটা বিএনপি নির্বাচনের ইশতেহারে পঠিত হয়েছে। তার আলোকে এই মহাপরিকল্পনার পরিকল্পনা পর্যায় থেকে শুরু করে যেখানে প্রয়োজন সেখানে কারিগরি সহায়তা করা তাতে…আমাদের ‘প্রজেক্ট ডিজাইন’ করা, ‘প্ল্যানিং’, ‘এক্সিকিউশন’ সব জায়গাতে ধারাবাহিকভাবে তারা সম্পৃক্ত হবেন বলে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।”
মাহদী আমিন বলেন, “যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করাটা খুব প্রয়োজন। এত বড় একটা প্রকল্পে সেই যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে চীন কাজ করতে চায় এবং পুরো পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় যে দক্ষতা, যেখানে রয়েছে সেটি বাংলাদেশের কাজে লাগানো সম্ভব…দুই দেশেরই সরকার প্রধান ঐক্যমত পোষণ করেছেন।”
এদিন স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব পিপল’ এ চীন সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এ বৈঠক হয়।
বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীনের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং।
বৈঠকের পর বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩টি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন।

সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক বিষয় অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এর আগে সকালে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’-এ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে সমঝোতা স্বারক সই হয়। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি কুওইংয়ের বৈঠক হয়, যেখানে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও চীন একমত হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, “বাংলাদেশের সবচাইতে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন। আমাদের একটা বড় সুযোগ রয়েছে। একদিকে যেমন সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, একই সাথে আমাদের বাংলাদেশ থেকে চীনে যে পরিমাণ রপ্তানি হয়, চীন থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি হয় তার চেয়ে অনেক বেশি।
“সেক্ষেত্রে আমরা আমদানি বাড়াতে পারি কিনা, ‘ডাইভার্সিফাই’ কীভাবে করতে পারি? চীনের বাংলাদেশের দিক থেকে রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে আলোপ-আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের শুল্কমুক্ত আমদানি চীনে রয়েছে। এটাতে আরও কীভাবে সুবিধা পাওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”
চীনের বিশাল বাজারে রপ্তানির সুযোগ কীভাবে করা যায় তা নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র।
তিনি বলেন, “চীনের প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় মেগা সাইজ মার্কেট… এই মার্কেটে অবশ্যই বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যদি আমাদের ‘সাপ্লাই চেইন’টাকে সেভাবে উন্নত করতে পারি চীনের যে অভ্যন্তরীণ চাহিদা আছে সেটার সাথে সমন্বয় করতে পারি তাহলে বাংলাদেশ যে, আমাদের রপ্তানি বাড়ানো সম্ভবনা আছে।”
চীনের বাজারে অনেক কিছু রপ্তানি করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, “আজকে ‘কনফার্ম’ করেছে যে বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল, পাঁচ হাজার রপ্তানি হবে সেখানে। এই ধরনের ফল, সবজি, কৃষিপণ্য, মৎস্য, অনেক ক্ষেত্রে আমরা নতুন নতুন ‘ডাইভার্সিফিকেশন’ করতে পারি।
“একই সাথে ফার্মাসিউটিক্যালস, সিরামিক, হাইটেক বেশকিছু ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে একদিকে যেমন চীনের বিনিয়োগ করা সম্ভব। ঠিক একই সাথে বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানিরও সুযোগ রয়েছে। এজন্য যৌথ একটা কর্মপরিকল্পনা করার বিষয়ে কথা হচ্ছে, যেটা বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে হতে পারে।”
কূটনীতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রচুর সুবিধার ক্ষেত্র তৈরির জন্য সেভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একদিকে যেমন বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে উপকৃত হবে। একই সাথে চীনেও তাদের বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফা পাবে।”
চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায় বলেও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
তিনি বলেন, “কিছু চীনা ব্যাংক সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে চায়। আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাটাকে আমরা যেভাবে পুনরুদ্ধার করছি এবং সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। চীন মনে করছে যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে।”

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে চীন হাসপাতাল নিয়ে কাজ করছে তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, “চীনের বিনিয়োগকৃত হসপিটালের সংখ্যা কিভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে কথা হয়েছে, চীনের প্রধানমন্ত্রী আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা করতে চান। চীনে যদি আসেন বাংলাদেশিরা, সেক্ষেত্রে ভিসা যদি সহজতর করা যায়, তাহলে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা কীভাবে বাংলাদেশিদের জন্য বাড়ানো যায় সেগুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে।
“বাংলাদেশ শিক্ষার্থীরা চীনে যেন সহজে ভিসা পায় এবং বৃত্তি বাড়ানোর সুযোগ পায় সেই বিষয়গুলো নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান। ওই সফরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে সোমবার তিনি পৌঁছান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তালিয়ানে।
সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে বুধবার বিকালে তারেক রহমানের বেইজিংয়ে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হয়।
শুক্রবার গ্রেট হল অব পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে। স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা।
আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি চীনের: উপদেষ্টা