Published : 11 Jul 2023, 05:05 PM
‘শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা’ ফিরিয়ে এনে ঐক্যবদ্ধভাবে নাট্যান্দোলনকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানকে তাগিদ দিয়েছে 'সাধারণ নাট্যকর্মী ঐক্য'।
সংকট সমাধানের আহ্বান রেখে সাবেক চার সভাপতির পাঠানো চিঠির কোনো জবাব ফেডারেশন না দেওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছে এই প্ল্যাটফর্মটি।
'সাধারণ নাট্যকর্মী ঐক্য' এর মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ বারী এক বিবৃতিতে বলেছেন, "বিগত পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে যাদের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরলস শ্রমে-ঘামে ও মেধায় এ দেশের নাট্যান্দোলন ও নাট্যচর্চা আজ একটি গৌরবজনক অবস্থায় পৌঁছেছে, তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে অগ্রাহ্য করায় সাধারণ নাট্যকর্মীরা সংক্ষুব্ধ।"
গত ২০ জুন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীকে দ্বিতীয়বারের মত চিঠি পাঠান এর সাবেক চার সভাপতি রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, ম হামিদ, সারা যাকের। যারা দেশের শীর্ষ চার নাট্য সংগঠনের প্রধান এবং তিনজন বর্তমানে ফেডারেশনের ‘সম্মানিত সদস্য’।
ফেডারেশনের ‘বিভাজন কোনো অবস্থাতেই কাঙ্ক্ষিত নয়’ জানিয়ে পত্রদাতারা ওই চিঠিতে বলেছিলেন, সম্ভবত সেটাই তাদের ‘শেষ চিঠি’।
এর আগে ১৩ এপ্রিলও সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন এই চারজন। যার উত্তর এসেছিল ২৮ মে। ফেডারেশনের সেই জবাব ‘সন্তোষজনক’ মনে না হওয়ায় ফের চিঠি দেন সাবেক চার সভাপতি।
তবে দ্বিতীয় চিঠির কোনো উত্তর আসেনি লাকী নেতৃত্বাধীন ফেডারেশন থেকে।
সাবেক চার সভাপতির চিঠি দেওয়ার খবর এবং তাতে লাকীর ফেডারেশনের কোনো জবাব না আসার খবর গত রোববার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হলে, দেশের অনেক নাট্যকর্মীই ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা বলেছেন।
‘নাট্যকর্মী ঐক্যের; বিবৃতিতে বলা হয়, "আমরা অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করছি যে, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সাম্প্রতিক কার্যক্রমে সারাদেশের নাট্যকর্মীদের মাঝে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ফেডারেশানের নেতৃবৃন্দের কিছু কর্মকাণ্ডে নাট্যকর্মীদের মাঝে অনৈক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ এটিকে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের বিভাজন বলে উল্লেখ করছেন।
“এ সম্পর্কিত আলাপ-আলোচনা ও বিভিন্ন মাধ্যমে লেখালেখিতে উদ্বিগ্ন হয়ে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানে সাবেক চার চেয়ারম্যান এবং দেশের অগ্রগণ্য ও বর্ষিয়ান নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, ম. হামিদ ও সারা যাকের গত ১৩ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে ফেডারেশানের বর্তমান চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী লাকী বরাবর এক যৌথ চিঠির মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দীন ইউসুফসহ আরও ক'জন শীর্ষস্থানীয় নাট্যজনও একই আহ্বান জানান ফেডারেশানের চেয়ারম্যানের প্রতি।
“ফেডারেশানের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ইতিবাচক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ না থাকায় সম্মানিত সাবেক চার চেয়ারম্যান ২০ জুন তারিখে লিয়াকত আলী লাকী বরাবর আরও একটি চিঠি দিয়ে সংকট নিরসনের পুনঃআহ্বান জানান। “
নাট্যকমীরা হতাশ জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয় “গণমাধ্যমে সেই চিঠি প্রকাশিত হলে আমরা জানতে পারি, চেয়ারম্যান লাকী সাবেক চার চেয়ারম্যানের প্রথম চিঠির উত্তরে যে চিঠি দিয়েছেন তাতে তাদের মূল বক্তব্যকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। চলমান সংকট নিরসনের বিন্দুমাত্র আগ্রহও তাতে ছিলো না। যা শুধু শ্রদ্ধাভাজন চার নাট্যজনকে মর্মাহত ও উৎকণ্ঠিত করেনি, এ দেশের হাজার হাজার নিষ্ঠাবান নাট্যকর্মীকেও ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে।
"সম্মানিত চার নাট্যব্যক্তিত্বের সর্বশেষ চিঠির মাধ্যমে আমরা আরও জানতে পারি, ফেডারেশানের সাবেক চারজন চেয়ারম্যানের মধ্যে তিনজনই বর্তমান কমিটির সম্মানিত সদস্য। নাসিরউদ্দীন ইউসুফও বর্তমান কমিটির একজন সম্মানিত সদস্য। অথচ এত বড় সংকট- সমস্যার ব্যাপারে তাদেরকে ফেডারেশানের পক্ষ থেকে কোনোকিছু জানানোও হয়নি, এমন কী তাদের পরামর্শও চাওয়া হয়নি। তাদেরকে কোনো মিটিংয়েও ডাকা হয়নি। বিষয়টি প্রথাবিরুদ্ধ।“
ফেডারেশনের বর্তমান কমিটিকে ‘স্বেচ্ছাচারিতা, একগুঁয়েমি’ ছেড়ে 'সাধারণ নাট্যকর্মী ঐক্য'র মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ বারী বলেন, “আমাদের নাটকের চার অভিভাবক তাদের সর্বশেষ চিঠিতে চেয়ারম্যান বরাবর নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে আর্থিক অনিয়মসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধানে যে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন, তা বাস্তবায়নের জোর দাবি জানায় সাধারণ নাট্যকর্মী ঐক্য।
“আজ যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এটা বর্তমান কমিটির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ এবং এর দায় পুরোপুরিভাবে বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিরই। অতএব, সমস্যার সমাধানে তাদেরকেই উদ্যোগী হতে হবে। আমরা আশা করব, দেশের সাধারণ নাট্যকর্মীদের আকাঙ্খা অনুযায়ী সাধারণ নাট্যকর্মী ঐক্যর ১১ দফা দাবি মেনে নিয়ে বর্তমান নেতৃত্ব ফেডারেশানের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হবেন।"
অস্থিরতার শুরু যেভাবে
২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সম্পাদক (প্রচার) মাসুদ আলম বাবুর স্বাক্ষরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও সাংগঠনিক স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে’ কামাল বায়েজীদ (সাধারণ সম্পাদক) ও রফিকুল্লাহ সেলিমকে (অর্থ সম্পাদক) অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টি জানানো হয়।
পরে সংবাদ সম্মেলন করে কামাল বায়েজীদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এভাবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কাউকে অব্যাহতি দেওয়া ‘অগণতান্ত্রিক’।
কামাল বায়েজীদ তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে দুদকে একটি অনুসন্ধান চলছে। পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। আমি তাকে একদিন এ বিষয়ে মৌখিকভাবে বলেছিলাম, তিনি যেন কিছুদিন সংগঠনের কাজ থেকে বিরতি নেন। এই কারণে হয়ত তিনি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অব্যাহতি দিয়েছেন।”
ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রামেন্দু মজুমদার গত ২৩ জানুয়ারি নাট্যকর্মীদের উদ্দেশ্যে এক খোলা চিঠিতে ফেডারেশানের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত করার আহ্বান জানান। বায়েজীদকে বহিষ্কারের প্রতিক্রিয়ায় মার্চে ফেডারেশন ছাড়ার ঘোষণা দেয় ঢাকা থিয়েটার। ফেডারেশনের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ ছিলেন ঢাকা থিয়েটার প্রতিনিধি।
তাতে ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করে এপ্রিলে ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীকে চিঠি দেন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, ম হামিদ ও সারা যাকের। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে অনাস্থা এবং সংগঠনের অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে থিয়েটার চর্চার সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে ৬৭ জন নাট্যকার, নির্দেশক ও সংগঠক বিবৃতি দেন।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে ঢাকার নাটকপাড়া উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই সংগঠনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অভিযোগ তুলে ১৬ জুন জাতীয় নাট্যশালার প্রধান ফটকের সামনে 'সাধারণ নাট্যকর্মীবৃন্দ' নামে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন একদল নাট্যকর্মী। ফেডারেশনের চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ নয় দফা দাবি জানানা তারা।
ওইদিনই জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন বলে, “যারা আন্দোলন করছেন, তারা মূলত ফেডারেশনের কেউ নন।”
পুরনো খবর: