একদিকে ফেডারেশনের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে সাধারণ নাট্যকর্মীদের অনাস্থা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে সংগঠনের অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাট্যাঙ্গনের অগ্রজরা।
Published : 16 Jun 2023, 12:44 PM
দেশে নাট্যচর্চা তথা থিয়েটার আন্দোলনের অভিভাবক সংগঠন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে ঢাকার নাটকপাড়া এখন উত্তপ্ত।
ফেডারেশনের নানা অনিয়মের শুক্রবার বিকালে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে যাচ্ছেন 'সাধারণ নাট্যকর্মীবৃন্দ' নামের একটি প্ল্যাটফর্ম।
ফেডারেশনের মেয়াদত্তীর্ণ কমিটির ‘স্বেচ্ছাচারিতা, অগঠনতান্ত্রিক ও অবৈধ কার্যক্রম’ এবং ৬৭ নাট্যজনকে ‘কদর্য ভাষায় ব্যক্তিগত আক্রমণের’ জবাবে এই প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সাধারণ নাট্যকর্মীবৃন্দ ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশ ঘোষণার পর গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনও পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে একইদিন সেমিনার, বর্ধিতসভাসহ নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনও করবে নাট্যাঙ্গনের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনটি।
ফেডারেশনের প্রচার সম্পাদক মাসুদ আলম বাবু জানান, দুপুর থেকে জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে ‘সংস্কৃতির বাজেট ভাবনা’ বিষয়ক আলোচনা ও সারাদেশের সংস্কৃতিকর্মীদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন, বর্ধিত সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।
একদিকে ফেডারেশনের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে সাধারণ নাট্যকর্মীদের অনাস্থা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে সংগঠনের অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাট্যাঙ্গনের অগ্রজরা।
নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাধারণ নাট্যকর্মীরা যে কর্মসূচিটি করছে, সেটি তো আগেই ঘোষণা করেছে। কিন্তু গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনও একইদিন যে কর্মসূচি দিয়েছে, আমি মনে করি এটা একই দিন না করলেও পারত।”
একুশে পদকজয়ী নাট্যজন আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, “আমরা কেউই গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের বিপক্ষে নই। ফেডারেশনকে যে গুটিকয়েক লোক নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে, আমরা তাদের সংশোধন হতে বলছি। আমরা আমাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে প্রতিবাদ সমাবেশ করব, তারা একইদিন পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে নাট্যাঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
“ফেডারেশনে অনেকদিন ধরে চলা অনিয়ম নিয়ে আমরা যারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছি তাদেরকে চক্রান্তকারী বলে দিচ্ছে। এসবের মূল কারণ শিল্পকলার মহাপরিচালক এবং ফেডারেশন সভাপতি একই ব্যক্তি হওয়ায়। ফেডারেশন আর শিল্পকলাকে এখন আর আলাদা করা যাচ্ছে না। আমরা এসব অনিময় নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তারা তেড়ে আসছে, অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলছে। আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করতে প্রতিবাদ সমাবেশে দাঁড়াব।"
সম্প্রতি ফেডারেশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিবৃতি দিয়েছিলেন ৬৭ জন নাট্যকার, নির্দেশক ও শিল্পী। বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন নাট্যজন মোহাম্মদ বারী। পরে এই বিবৃতির প্রতিবাদ জানিয়ে ফেডারেশন মোহাম্মদ বারীকে হেয় করে পাল্টা বিবৃতি দেয়।
নাট্যকর্মীদের একাংশ ফেডারেশনের ভাষার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং মোহাম্মদ বারীকে কুরুচীপূর্ণ ভাষায় ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে বলে ফেইসবুকে প্রতিবাদ জানান অনেকে।
মোহাম্মদ বারীর প্রতিবাদী অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে থিয়েটার পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’সহ নাট্যকর্মীদের একাংশ তার পক্ষে অবস্থান নেন। পরে সাধারণ নাট্যকর্মীবৃন্দ ব্যানারে তারা শুক্রবার বিকালে জাতীয় নাট্যশালা প্রাঙ্গণে প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করেন।
অস্থিরতার শুরু যেভাবে
২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সম্পাদক (প্রচার) মাসুদ আলম বাবুর স্বাক্ষরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও সাংগঠনিক স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে’ কামাল বায়েজীদ (সাধারণ সম্পাদক) ও রফিকুল্লাহ সেলিমকে (অর্থ সম্পাদক) অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টি জানানো হয়।
পরে সংবাদ সম্মেলন করে কামাল বায়েজীদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এভাবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কাউকে অব্যাহতি দেওয়া ‘অগণতান্ত্রিক’।
কামাল বায়েজীদ তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে দুদকে একটি অনুসন্ধান চলছে। পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। আমি তাকে একদিন এ বিষয়ে মৌখিকভাবে বলেছিলাম, তিনি যেন কিছুদিন সংগঠনের কাজ থেকে বিরতি নেন। এই কারণে হয়ত তিনি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অব্যাহতি দিয়েছেন।”
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নাট্যকর্মীদের উদ্দেশ্যে গত ২৩ জানুয়ারি খোলা চিঠি লেখেন ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রামেন্দু মজুমদার। নাট্যকর্মীদের কাছে লেখা চিঠিটি থিয়েটার বিষয়ক পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’র ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন তিনি।
চিঠিতে রামেন্দু মজুমদার বলেছিলেন, "বর্তমানে ফেডারেশানের কর্তাব্যক্তিদের এই বিরোধ জনসমক্ষে নাট্যকর্মীদের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে কালিমালিপ্ত করেছে। এর দায় নাট্যকর্মীরা কেন নেবেন? তারা সুন্দর পরিবেশে নাটক করতে চান, নোংরা রাজনীতি চান না।"
তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্যে ফেডারেশানের কর্মকাণ্ড স্থগিত এবং ব্যাংক হিসাব স্থগিত করার পরামর্শও দেন।
এরপর রামেন্দু মজুমদারের চিঠিকে গুরুত্ব না দিয়ে ফেডারেশনে লিয়াকত আলী লাকীর অনুসারীরা রামেন্দু মজুমদারকেও হেয় করে নানা মন্তব্য করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফেডারেশন জানায়, তারা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
নাট্যকর্মীদের সভায় অংশ নেননি লাকী
গতবছর ২৩ জুলাই রাজধানীর মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে ‘সাধারণ নাট্যকর্মীদের’ ব্যানারে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। অগ্রজ প্রায় সব নাট্যজন সেখানে বক্তব্য দিলেও লাকী সেখানে যাননি।
ওই সভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, মফিদুল হক, আসাদুজ্জামান নূর, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, আহমেদ ইকবাল হায়দার, মোহাম্মদ বারী, আজাদ আবুল কালাম, অলোক বসু, কামাল বায়েজীদ, রফিকুল্লাহ সেলিম, কামরুন নূর চৌধুরী, তপন হাফিজ প্রমুখ। এর আগে সভার ধারণাপত্র পাঠ করেন অলোক বসু। সঞ্চালনা করেন মারুফ কবির। মূলত ফেডারেশনের প্রতি ক্ষোভ, হতাশা থেকেই তখন 'সাধারণ নাট্যকর্মী' প্লাটফর্মটি আত্মপ্রকাশ করে।
ফেডারেশন ছাড়ে ঢাকা থিয়েটার
অস্থিরতার মধ্যে কামাল বায়েজীদকে বহিষ্কারের প্রতিক্রিয়ায় গত ২২ মার্চ ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীকে লেখা এক চিঠিতে ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক নাসির উদ্দীন ইউসুফ সংগঠন ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানান।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “অগঠনতান্ত্রিকভাবে কামাল বায়েজীদকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রতিবাদে ফেডারেশন থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহার করেছে ঢাকা থিয়েটার।”
চার সাবেক সভাপতির চিঠি, ৬৭ নাট্যজনের বিবৃতি
ঢাকা থিয়েটারের সংগঠন ছাড়ায় ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করে গত ১৩ এপ্রিল ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীকে চিঠি দেন দেশের শীর্ষ চার নাট্যসংগঠনের প্রধান, যারা বিভিন্ন মেয়াদে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। তাদের মধ্যে আছেন ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রামেন্দু মজুমদারও। এছাড়া ‘নাট্যচক্রের’ পক্ষে ম হামিদ, ‘আরণ্যকের’ পক্ষে মামুনুর রশীদ এবং ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের’ পক্ষে সারা যাকের চিঠিতে সই করেন।
এমন পরিস্থিতিতে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে অনাস্থা এবং সংগঠনের অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে থিয়েটার চর্চার সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে ৬৭ জন নাট্যকার, নির্দেশক ও সংগঠক বিবৃতি দিয়েছিলেন।
এমন অস্থির পরিস্থিতিতে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রামেন্দু মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাধারণ নাট্যকর্মীরা প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকার পর একই সময়ে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনও পালটা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এই অবস্থা তৈরি হয়েছে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অনেক দিনের অসাগংঠনিক ও স্বেচ্ছাচারি তৎপরতার কারণে।”
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং ফেডারেশনের সভাপতি একই ব্যক্তি হওয়ায় এই পরিস্থিতি ও সংকট তৈরি হয়েছে বলেও মনে করেন এই নাট্যজন।
“শিল্পকলার মহাপরিচালক কে হবেন সেটা রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে। কিন্তু সরকারের প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল পদে থেকে ফেডারেশনের সভাপতি থাকাটা ঠিক নয়। ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকী শিল্পকলার মহাপরিচালক হওয়ার পরই আমি তাকে বলেছিলাম, ফেডারেশনের সভাপতির পদে আর থাকাটা ঠিক হবে না। এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে নাট্যাঙ্গন মানুষের কাছে হেয় হচ্ছে। এই সংকট দূর করতে সবাইকে এক হতে হবে এবং নাট্য আন্দোলনের জন্য যা মঙ্গলজনক সেটাই করতে হবে।”
এই বিষয় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর ফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি।
তবে ফেডারেশন এবং শিল্পকলা সূত্রে জানা গেছে, সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানাবেন লিয়াকত আলী লাকী।
আরও পড়ুন
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন: অব্যাহতি পাওয়া কামাল বায়েজীদের পাল্টা অভিযোগ
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ছাড়ল ঢাকা থিয়েটার
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ‘সংকট’ সমাধানে সভাপতিকে সাবেকদের চিঠি