“এখনকার পরিচালকদের শুটিংয়ের আগে বারবার ফোন করে স্ক্রিপ্ট পাঠাও স্ক্রিপ পাঠাও বলতে হয়।“
Published : 02 Apr 2025, 08:51 PM
স্কুলের মঞ্চ দিয়ে শুরু, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান, রেডিও এবং টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের বড় পর্দাজুড়ে অভিনেত্রী দিলারা জামানের অভিনয় জীবন চলেছে ছয় দশকের বেশি সময় ধরে। কাজের স্বীকৃতিতে পেয়েছেন একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
৮৩ বছর বয়সেও কাজে নিয়মিত এই অভিনেত্রী জানিয়েছেন তিনি আমৃত্যু অভিনয় করে যেতে চান। তবে ‘বদলে যাওয়া এই সময়ে’ এই বয়সেও কাজ করে চলার জন্য কটাক্ষ শুনতে হয় বলে আক্ষেপ করেছেন এই শিল্পী।
রাজধানীর উত্তরার এক বিকেলে একটি শুটিং হাউজে গ্লিটজের সঙ্গে কথোপকথনে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা বিষয়ের সঙ্গে বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রী বলেছেন, তিনি মনে করে জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয়টি এখনো তার করা হয়ে ওঠেনি।
গ্লিটজ: অভিনয়ে কত বছর পার করে দিলেন?
উ: ছয় দশকের বেশি হবে। অনেকগুলো পর্যায় পার করে ফেলছি, প্রথমে তো মঞ্চ বলতে আমাদের কাছে স্কুলের বছরের শেষে যে একটা অনুষ্ঠান হত সেটাই ছিল। সেখানে ছোট্ট একটা একাঙ্কিকা (এক অংকের নাটক) করতাম। তারপরে কলেজে গিয়েও সেরকম কিছুই করতাম। পরে আরেকটু বড় পরিসরে অভিনয় করা শুরু করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে। তখন প্রথম স্টেজে পারফরম্যান্স শুরু হল, আমাদের সময়ে কিন্তু ছেলে মেয়ে একসঙ্গে নাটক করতে দেখা যেত না। হলেও খুব অল্প। মেয়েদের হোস্টেলের মেয়েরা ছেলে সেজে নাটকে অভিনয় করতেন। একইভাবে ছেলেদের হলেও তারা মেয়ে সেজে নাটক করত। পরবর্তী সময়ে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে প্রথম যে কাজটা করলাম সেটা হল আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখা 'মায়াবী প্রহর'। সেখানে আব্দুল্লাহ আল মামুন, এনামুল হক আমরা একসঙ্গে নাটক করেছি। এখনো তাদের সঙ্গে কাজ করা সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে হয়। তারপরে চৌষট্টি ডিসেম্বরে (১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাস) টেলিভিশন শুরু হল, সেখানে কাজ শুরু হল।
গ্লিটজ: অভিনয়ে আসা নিয়ে পরিবারকে কতটা পাশে পেয়েছিলেন?
উ: আমার বাবা মা খুবই সংস্কৃতিমনা ছিলেন, তা না হলে আমার এইভাবে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার একেবারেই সম্ভব ছিল না। তারপরে আমার বিয়ের পরে আমার স্বামী ফখরুজ্জামান চৌধুরী। উনি একজন বিশিষ্ট অনুবাদক। তিনিও আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন এবং আমি বলব সহযোগিতা করেছেন। কারণ প্রথম দিকে কাজ শেষ করে বাসায় আসতে আসতে দেখা যেত রাত দুইটা তিনটা বেজে গেছে। সেই সময় আমার জন্য উনি জেগে থাকতেন। খাবার টেবিলে বসে হয়ত লেখালেখি করছেন। আমার বাচ্চারা ঘুমিয়ে আছে, সকালে স্কুলে যাবে, কলেজে যাবে বেল দিলে যদি উঠে যায় তাই আমি আস্তে আস্তে দরজায় নক করতাম বা গাড়ি থামার শব্দ হলে উনি উঠে দরজাটা খুলে দিতেন। উনি যদি সহযোগিতা না করতেন তাহলে তো আমি এত কাজও করতে পারতাম না। এতদূর আসতেও পারতাম না। আমার পরিবার থেকে পুরো সহযোগিতা পেয়েছি।
গ্লিটজ: একা বসে থাকলে অভিনয়ের কোন স্মৃতিগুলো বেশি মনে পড়ে?
উ: আগে কিন্তু রেডিওতে নাটক সরাসরি নাটক সম্প্রচার হত এবং সেটা আরও কঠিন একটা ব্যাপার ছিল। গলা একটু যদি কেঁপে যায় বা কাশি আসে তাহলে তো মহাবিপদ। সেই নবীন সময়ের স্মৃতি মনে পড়ে। তাছাড়া যখন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে আলমাস সিনেমা হলের পাশে আমাদের বাসা ছিল। নাটক শেষ করে আসতে রাত হলে বাসার দোতলা তিনতলা থেকে মানুষ উঁকি দিত, এত রাত্রে গাড়ি করে আসছে কোথা থেকে? তাদের খুবই উৎসাহ কাজ করত। এখন সেগুলো মনে পড়লে হাসি পায়।
গ্লিটজ: কখনো কি মনে হয়েছে আপনার স্বপ্নের চরিত্র বা কাঙ্ক্ষিত চরিত্র এখন পর্যন্ত অধরা আছে?
উ: শিল্পীর তো অতৃপ্তি থাকেই। একজন শিল্পী কখনোই তৃপ্ত হতে পারেন না। তাহলে তো তিনি সেখানেই মারা যাবেন। আমারও ওরকম মনে হয় জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজটা হয়নি। হয়ত অনেক ভালো কাজ করেছি, তার জন্যে সম্মানিত হয়েছি, পুরস্কৃত হয়েছি। তারপরেও মনে হয় যে এমন কোনো একটা চরিত্র করব, যেটা যুগের পর যুগ মানুষের মনের মধ্যে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম গল্পের মত করে সেটা নিজের ভেতরে ধারণ করবে বা স্মরণ করবে আমাকে ওই চরিত্রটির জন্যে। আমার মনে হয় হয়ত সে চরিত্রটি এখনো আমার করা হয়নি। হয়ত বা করেছি, আমি নিজেই বুঝতে পারছি না।
গ্লিটজ: শুটিং-নির্মতা-সহশিল্পী-এই তিন বিষয়ে সেকাল-একালের কোন পার্থক্যটা চোখে পড়ে?
উ: পার্থক্য তো আছেই পোশাক আশাক, সংলাপ, মূল্যবোধ সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় ছিল যখন একটা মাত্র চ্যানেল ছিল টেলিভিশনে, সবাই একসঙ্গে বসে পরিবারের সাথে নাটক, সিনেমা দেখতে। তখন টেলিভিশনও এত সহজলভ্য ছিল না। এখন এত চ্যানেল, এত প্রতিযোগিতা। ভালো কাজ হলেও মানুষ জানতে পারে না। প্রযুক্তি সব কিছু পরিবর্তন করে দিয়েছে। তবে আমাদের হাজার বছরের যে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধ এগুলো যেন আমরা কখনো হারিয়ে যেতে না দেই সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
গ্লিটজ: নতুন পরিচালকদের সঙ্গে কাজে সমস্যা হয়?
উ: এখন অনেকেই আগে আগে স্ক্রিপ্ট দেয় না। শুটিংয়ের আগে বারবার ফোন করে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্ক্রিপ্ট পাঠাও স্ক্রিপ পাঠাও বলতে বলতে স্ক্রিপ্ট আসে। কাজের সময় আগে থেকে জানিয়ে দেয় না, মানে কোন কোন অবস্থার চরিত্র সেগুলো না জানলে আমি প্রস্তুতি নিব কী করে। অনেক সময় প্রপস আমি মনে করে নিয়ে যাই, কারণ জানি ওখানে গেলে পাব না। কিছুটা অগোছালো আছে, এগুলো হয়ত ঠিক হয়ে যাবে। কারণ এটা তো সম্মিলিত কাজ।
গ্লিটজ: আপনার অভিনীত সব থেকে পছন্দের কাজ কোনটি?
উ: অনেক কাজ, অনেক চরিত্র করেছি। ইউটিউব সার্চ দিলে অনেক পুরনো কাজ আসে। অবাক হই যে এই কাজটা কবে করলাম, আবার নিজেকে বলি এইভাবে না করে এভাবে করলে হয়ত আরও ভালো হত। পুরোনো কাজগুলো দেখতে তো ভালোই লাগে, সব কাজই পছন্দের। তখনকার একরকম ধরণ, কাপড়চোপড় অন্যরকম ছিল। আবার কত সহযোদ্ধা আছে যাদেরকে হারিয়েছি, তাদের কথা মনে হলে কষ্ট হয়। অসময়ে তারা চলে গেছে। তারা বেঁচে থাকলে আরও অনেক কিছু দিতে পারত। স্মৃতিকাতর হয়ে যাই।
গ্লিটজ: সহশিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
উ: সহযোদ্ধা যাদের সাথে কাজ করেছি তাদের মধ্যে আবুল হায়াত, হাসান ইমাম ভাই উনি আর এখন দেশে নেই। প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছেন। কিছুদিন আগে মারা গেলেন মাসুদ ভাই। অনেক আগে চলে গেলেন গোলাম মোস্তফা ভাই। আমার সঙ্গে যারা কাজ করেছেন সবার সঙ্গে অনেক ভালো সম্পর্ক ছিল। হায়াত ভাই আছেন, একসঙ্গে কাজ করা হয়। খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। আমাদের শরীর ভালো থাকে না, নানান অসুখ বিসুখ থাকে। তবুও যখন কাজের জন্য ডাক পাই একটা টান থেকেই চলে যাই। আবুল হায়াত ভাই একজন বড় মাপের শিল্পী। উনি আমার বয়সের ছোট। কিন্তু উনি আমাকে ভাবী ডাকেন। তার স্ত্রী, কন্যা, পরিবারের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রয়েছে। একসঙ্গে কাজ করতে আসলে দেখা যায় আমরাই নতুন ডিরেক্টরদের ডিরেকশন দেই, কাজের ধরনটা দেখিয়ে দেই। এই ভাবে সবার সঙ্গেই অভিজ্ঞতা খুব ভালো।
গ্লিটজ: অভিনয় জীবন নিয়ে কোনো আক্ষেপ?
উ: আক্ষেপ কিছু নেই, যতটুকু পেয়েছি তা খুব ভালো। অভিনয় আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে এটাই আমি মনে করি।
গ্লিটজ: আপনার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই, প্রবাসে থাকা মেয়েদের কাছে থাকার পরিকল্পনা আছে নাকি দেশকে আঁকড়ে ধরে থাকবেন?
উ: আমার দেশ, আমার মাটি, আমার চারপাশের জীবন, অভিনয় এটাই আমি। যুক্তরাষ্ট্রে মেয়েদের কাছে গিয়ে একটা অতৃপ্তিতে ভুগতে হয়, ওদেরকে কাছে পেয়েছি সেই আনন্দ কাজ করে। কিন্তু আমার যে কাজ, এই কাজটা না করতে পেরে আমার ভেতরে কষ্টে হাহাকার লাগে। তারাও বুঝে আমি দেশেই ভালো থাকি। আগে ওদের কাছে যেতে পারতাম, এখন যেতে পারি না। এত দূরের যাত্রা। এতক্ষণ বসে যেতে খুব কষ্ট হয়।
গ্লিটজ: বাসায় সময় কীভাবে কাটানো হয়?
উ: আমি একা মানুষ, নিজে রান্না করি, বাজার করি। মাথার চারপাশে আমার স্ক্রিপ্ট থাকে, এগুলো পড়ি। এভাবেই সময় কেটে যায়।
গ্লিটজ: ইদানিং কোন প্রত্যাশাটা কাজ করে?
উ: কবির কথায় বলি, 'সেই হোক মোর পরিচয়, আমি তোমাদেরই লোক'। এই যে রাস্তা ঘাটে সবাই আমাকে দিলারা জামান নামে ডাকে না। অমুকের দাদি, অমুকের মেয়ে, এই যে পরিচয় সবাই আমাকে কাছে টানে, আমাকে ডাকে, ভালোবাসে। এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া। আমি একটা ছোট বাচ্চার কাছ থেকেও ভালোবাসা পাই। এই অভিনয় নিয়েই শেষ দিন পর্যন্ত কাটিয়ে দিতে চাই এটাই চাওয়া।
গ্লিটজ: দর্শকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
উ: আমার বয়স প্রায় ৮৩ হতে চললো, এখনো যখন কাজ করি, রাস্তায় পথে অনেকে দেখা হলে বলে যে এখনো করেন, ছেড়ে দেন। আর কত? আমি বলি ‘না’। প্রশ্ন করি উল্টা যে, কী ছাড়ব? আমি তো একটা ভালো কাজ করছি। আনন্দ দিচ্ছি। মানুষকে নির্মল আনন্দ। এখানে তো কারও কোনও ক্ষতি হচ্ছে না। কাউকে আমি ঠকাচ্ছি না। আমার কাজের প্রতি আমি সৎ আছি, যতক্ষণ না কাজটি শেষ হয় ততক্ষণ শ্রম দেই। আমি তাদের কথায় মনে কষ্ট পাই না। আমার কাজ তো আমি করেই যাব। যেভাবে সবার ভালোবাসা পাই, সেই ভালোবাসা আমার প্রতি সবার যুগ যুগ ধরে থাকুক।