Published : 25 Aug 2025, 11:43 AM
দেশে নাগরিকদের তথ্যভাণ্ডারে ‘রোহিঙ্গা’ রয়েছে কিনা, স্বয়ংক্রিয় আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার (এএফআইএস) মাধ্যমে তা যাচাইয়ের জন্য দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ডেটাবেজ এখন পর্যন্ত ব্যবহারের সুযোগ যাচ্ছে না নির্বাচন কমিশন।
ইসির এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুন কবীর বলছেন, রোহিঙ্গাদের ডেটাবেজ ব্যবহার করার সুযোগ না মিললেও নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে।
“আমরা প্রবাসীদের জন্য (ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির) দুয়ার খুলে দিয়েছি। সব জায়গায় ব্যাক ডোর দিয়ে ঢোকার সুযোগ থাকতে পারে। সেজন্য ইসির চেকিং ব্যবস্থা আছে। সরেজমিন তথ্য যাচাই করে ভোটার করা হচ্ছে।”
দেশে ও প্রবাসে জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা সহজতর করতে নানা উদ্যোগের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ঠেকাতে ‘রোহিঙ্গা ডেটাবেজ’ ব্যবহারের সুযোগ চেয়ে আসছে নির্বাচন কমিশন।
ছয় মাস ধরে সে বিষয়ে আলোচনা এবং কারিগরি বিষয় নিয়ে বৈঠক চললেও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর সে সুযোগ ইসিকে দেয়নি।
এখন ১২ কোটি ৩৭ লাখের বেশি ভোটারের তথ্য রয়েছে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভাণ্ডারে। সবশেষ বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে ৪৬ লাখ নাগরিকের তথ্য নেওয়া হয়েছে, তারা ভোটার তালিকাভুক্ত হবেন ৩১ অগাস্ট। তারা জাতীয় পরিচয়পত্রও পাবেন।
প্রতিবছর ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় মৃতদের যেমন বাদ দেওয়া হয়, তেমনি ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নিবন্ধন তথ্য নেওয়ার পর এএফআইএস ম্যাচিং (অটোমেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম) পদ্ধতি ব্যবহার করে যাচাই করা হয়। তাতে কেউ দ্বৈত ভোটার হলে তা যেমন ধরা পড়ে; তেমনি তালিকার সঠিকতাও যাচাই হয়ে যায়।
কোনো রোহিঙ্গা কোনোভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে তাকেও যেন শনাক্ত করা যায়, সেজন্য কক্সবাজারে করা রোহিঙ্গা ডেটাবেজ ব্যবহারের সুযোগ চাইছে ইসি। ভোটার তালিকার জন্য নাম আসা কারো আঙুলের ছাপ ওই ডেটাবেইজের সঙ্গে মিলে গেলে সহজেই বোঝা যাবে যে তিনি রোহিঙ্গা।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্টের পর রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে স্রোতের মত ঢুকতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। যেখানে আগে থেকেই ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও চার লাখ।
শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে তাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়, ২০১৮ সালেই ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নিবন্ধনের আওতায় আসে।
রোহিঙ্গারা যেন পরিচয় গোপন করে বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়তে না পারে, সেজন্য গত মার্চে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ডেটাবেজ নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহারের অনুমতি দেয় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর। সে সময় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়।
ইসির এনআইডি উইং ডিজি এএসএম হুমায়ুন কবীর সে সময় বলেছিলেন, “ইউএনএইচসিআর-এর ‘রোহিঙ্গা ডেটাবেজ’ পেলে ইসির সুবিধা বহুমাত্রিক। রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে আর এত কষ্ট করতে হবে না। কেননা, আমরা ওই ডেটা পাব, হাতের আঙ্গুলের ছাপ দিলেই জেনে যাব ম্যাচ করছে কি করছে না। ম্যাচিং হলেই বুঝে যাব এটা রোহিঙ্গা। ম্যাচ না করলে সহজেই বুঝতে পারা যাবে এ ভোটার রোহিঙ্গা না।”
কিন্তু সেই ডেটাবেজ ব্যবহার করার সুযোগ নির্বাচন কমিশন এখনো পায়নি বলে রোববার জানিয়েছেন হুমায়ুন কবীর।
তিনি বলেন, “ডেটাবেজ ব্যবহারের বিষয়ে মার্চে এক ধরনের অগ্রগতি হলেও শেষ পর্যন্ত আনফরচুনেটলি আমরা আর পাইনি।”
২০০৭-২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়ন শুরুর পর থেকে রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে নানা ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে আসছে ইসি। এরপরও বাংলাদেশের নাগরিকদের সঙ্গে মিশে যেতে মরিয়া রোহিঙ্গাদের সব সময় আটকানো যায় না। ভুয়া তথ্য ও নথিপত্র দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়ার বেশ কিছু ঘটনা ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে।
হুমায়ুন কবীর বলেন, “এএফআইএস চেক করার জন্য এটা (রোহিঙ্গা ডেটাবেজ) চেয়েছিলাম আমরা। তা না পেলে বিদ্যমান সিস্টেমে আমরা করছি। আমাদের নিজস্ব প্রসিডিউর রয়েছে, আমরা সে প্রসিডিউর করেছি। আমরা কনফিডেন্ট, মোটামুটি ভালোভাবে করতে পেরেছি বা করতে পারছি। না পাওয়ার কারণে আমাদের কাজ তো থেমে নেই। তবে ওই ডেটাবেজ পেলে ইসির কাজ সহজ হত।”
কীভাবে সেই কাজ চলছে, তা ব্যাখ্যা করে এনআইডি উইং ডিজি বলেন, “ধরুন কক্সবাজারের কেউ ভোটার হতে এসেছেন। সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের এনআইডি দিতে হবে। বাবা-মায়ের এনআইডি থাকলে তো বাংলাদেশের নাগরিক।
“তারপর অন্যান্য তথ্যও চেক করা হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, জমির দলিল, এসব রেফারেন্স দেখা হচ্ছে। এছাড়া বিশেষ কমিটি রয়েছে (যাচাই করার জন্য), যাতে প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, সংস্থাসহ অনেক প্রতিনিধি আছেন।”
তিনি বলেন, “এ পরিশ্রমগুলো করতে হত না, যদি ওই ডেটাবেজটা পেতাম। ডেটাবেজ না পাওয়ায় এ কষ্টটা করতে হচ্ছে।”
বিষয়টি কোথায় আটকে আছে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবীর বলেন, “ইউএনএইচসিআর আমাদের কিছু বলেনি আর। টেকনিক্যাল লেভেলে মিটিংও হয়েছিল। জাস্ট দিয়ে দেবে–এমন একটা পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা মিটিংয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এটা আমাদের (ইসিকে) দিচ্ছে না; অন্য একটা মন্ত্রণালয়কে দেবে। এ হচ্ছে মূল কাহিনী।”
তিনি বলেন, ইসিকে না দিয়ে কোনো মন্ত্রণালয়কে ওই ডেটাবেইজ ব্যবহারের সুযোগ দিলেও কমিশনের অসুবিধা নেই।
“ইসির দরকার সেবাটা পাওয়া। আমরা এখনও ওই সেবা পাচ্ছি না। যে কোনো মন্ত্রণালয়কে (স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, আইসিটি) একসেস দিলেও আমরা চেক করে নিতে পারতাম। কিন্তু সেটা হয়নি।”
এদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার তালিকাভুক্ত করে এনআইডি দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করেছে ইসি।
মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টধারীরাও এখন এনআইডির জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবার কোনো দেশে অবস্থান করা তিনজন বাংলাদেশি এনআইডিধারী যদি প্রত্যয়ন করে যে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক, তাকেও এনআইডি দেবে ইসি।
তাতে রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি যাওয়ার সুযোগ বাড়বে কি না প্রশ্ন করলে ডিজি বলেন, “প্রথমে বোঝা দরকার উনি বাংলাদেশি কিনা, বাংলাদেশি হলে এনআইডি পাওয়ার জন্য আবেদন করার অধিকার তার রয়েছে। এখন আবেদন করার পর সব তথ্য নিয়ে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করছি। তদন্ত করে যদি পাই তিনি বাংলাদেশি, তাহলে অসুবিধা কী?”
হুমায়ুন কবীরের ভাষ্য, রোহিঙ্গা বা ভিনদেশি কেউ যে বিদেশে বসে বাংলাদেশি এনআইডি নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, সেই সম্ভাবনা তারা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকানায়, জেলা, উপজেলায় তদন্তে তার আবেদন ঠিকই আটকে যাওয়ার কথা।
প্রবাসে এনআইডি দেওয়ার উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “অনেক লোক আবেদন করতে পারছিল না, নিজের দেশে আসতে পারছিল না, কারণ তারা পাসপোর্ট নবায়ন করতে পারছে না। এনআইডি পাচ্ছে না, ভোট দিতে পারছে না। আমরা এ দুয়ার খুলে দিয়েছি। এ নিয়ে অন্য কোনো জটিলতা নেই।”
রোহিঙ্গাদের ভোটার করার পেছন ইসির আউট সোর্সিংয়ের লোকজন ও ইসি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার ঘটনাও এর আগে জানা গেছে। বর্তমান ইসি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে এনআইডির ডিজির ভাষ্য।
তিনি বলেন, আমরা হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চয়তা দিতে পারব না; কিন্তু আমরা কঠোর বার্তা দিয়েছি। এখনকার ইসি যাদের সম্পৃক্ততা পাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
তাতে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রবণতা কমেছে দাবি করে হুমায়ুন কবীর বলেন, “ইসির লোকজনের মধ্যেও এখন সতর্কতা বেড়েছে।”
পুরনো খবর
ইউএনএইচসিআরের রোহিঙ্গা ডেটাবেজ ব্যবহার করতে পারবে ইসি
ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা: বিশেষ এলাকায় 'কঠোর পদক্ষেপ'
রোহিঙ্গাদের এনআইডি পেতে তৎপরতা নিয়ে ইসির সর্তকতা
রোহিঙ্গা ভোটার: ইসি কর্মী-জনপ্রতিনিধিরাও জড়িত, বলছে দুদক
দ্বৈত এনআইডিধারীদের দ্বিতীয়টি বাতিল হবে: হুমায়ুন কবীর
প্রবাসে এনআইডি সেবা: মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট দিয়েও ভোটার হওয়ার সুযোগ