জিয়াউর রহমান হত্যা: ৪৫ বছর পর মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তার
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিনি পালিয়ে যান; তাকে ধরিয়ে দিতে সে সময় পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
সাড়ে চার দশক আগে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
গ্রেপ্তার মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন সে সময় ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দিতে সে সময় পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশ প্রধান শফিকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বুধবার রাতে বনানী ডিওএইচএস থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, “সে এখন পুলিশ হেফাজতে আছে। যেহেতু সে এতদিন পলাতক ছিল, নিয়ম অনুযায়ী আগে তাকে তার বাহিনীতে হস্তান্তর করা হবে।”
এরপর সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে মোজাফফর হোসেনকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে ডিএমপি।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা।
ঘটনার আগের দিন দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম যান রাষ্ট্রপতি জিয়া। তার সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বিরোধ নিরসন। প্রথমদিন নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে তিনি মধ্যরাতে ঘুমাতে যান।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি দল তার উপর গুলি চালায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ৩০ মে সকালে রেডিওতে তার মৃত্যুর খবর ঘোষণা করা হয়।
পরে সরকারের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিপ্লবী পরিষদ’ পরিচয় দেওয়া কিছু সেনা সদস্য রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করেছে। উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার তখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর জিয়ার লাশ গোপনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাহাড়ি এলাকায় তাকে কবর দেওয়া হয়। পরে সরকারের উদ্যোগে সেখান থেকে তার মরদেহ তুলে ঢাকায় এনে ২ জুন দাফন করা হয় দাফন করা হয় সংসদ ভবনের পাশে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার পর অভ্যুত্থানকারীরা বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেওয়ায় চট্টগ্রাম পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা জিয়ার লাশও হস্তান্তর করতে রাজি হচ্ছি না।
ওই অবস্থায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সবাইকে ৩১ মে দুপুর ১২টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন তখনকার সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, যিনি পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অভ্যুত্থানকারী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সেদিন রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যান।
পরদিন ১ জুন অভ্যুত্থানে জড়িত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুব চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সরকার সমর্থক সেনা সদস্যদের গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে খবর আসে। মঞ্জুরকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফের সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পায়।
মেজর জেনারেল মঞ্জুর ২ জুন ফটিকছড়ির একটি চা বাগানে ধরা পড়েন। সেখান থেকে তাকে থানায় নেওয়া হয়। পরে রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষিত সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যের হাতে জেনারেল মঞ্জুর নিহত হয়েছেন।
সে সময় ‘বিদ্রোহের’ অভিযোগে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়।
তবে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদের দুজনকে ধরিয়ে দিতেও সে সময় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
এদিকে রাতে ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পলাতক আসামি ৭৭ বয়সি মোজাফফর হোসেনকে বনানীর একটি বাসা হতে গ্রেপ্তার করা হয়।
"হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মেজর মোজাফফর হোসেন বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। বিশ্বস্ত সোর্স ও তথ্য প্রযুক্তির বিশ্লেষণপূর্বক গোয়েন্দা বিভাগ তার অবস্থান শনাক্ত করে। পরে গত বুধবার রাত ১০টার কিছু পরে বনানীর একটি বাসা হতে গ্রেপ্তার করা হয়।"
জিজ্ঞাসাবাদে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে অবহিত করা হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
"এর পরেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের একটি দলের নিকট যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হয়েছে।"
