Published : 24 Mar 2026, 12:47 AM
ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে পারস্য উপসাগরে খার্ক নামে যে ছোট পাথুরে দ্বীপ রয়েছে, সেটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আট বর্গমাইলের চেয়ে ছোট দ্বীপটি মার্কিন বাহিনীর কাছে যেমন যুদ্ধজয়ের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে; আবার বিপর্যয় ডেকে আনার উপলক্ষও হতে পারে।
খার্ক দ্বীপে যে হাজার বিশেক মানুষের বাস, তাদের বেশির ভাগই তেল শ্রমিক। ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপ থেকে ছাড় হয়।
যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ মার্চ খার্কে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এখন নতুন করে আবার সেখানে হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষক ব্রেন টেইনহিলের মূল্যায়ন হলো, ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়ে তেলের বাজারে নিজের প্রভাব বাড়িয়েছে। তারা নিজেদের তেল বহনকারী ট্যাঙ্কারগুলোকে বাঁধা দিচ্ছে না।
দ্যা আটলান্টিকে প্রকাশিত নিবন্ধে টেইনহিল লিখেছেন, “যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা নাকি অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। কিন্তু অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের তেল পরিবহনে বাধার মুখে পড়ছে। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইরানের আয় বেড়েছে।”
মার্কিন নৌবাহিনীতে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন টেইনহিল। এর মধ্যে ২০০৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ফিফথ ফ্লিট সদর দপ্তরে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও নীতি বিভাগে কাজ করেছেন তিনি।
নেভাল রিজার্ভে ইরান বিশ্লেষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। আর গেল এক দশক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিসেবে তিনি কাজ করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যান্ড করপোরেশনে।

টেইনহিল মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ইরান বর্তমান যুদ্ধাবস্থা জারি রাখতে চায়। তাদের লক্ষ্য হলো, অন্যদের জাহাজ যেন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলে।
হরমুজ প্রণালি থেকে হাজার-বারোশ মাইল দূরের আরেকটি স্পর্শকাতর নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে ইরান।
টেইনহিল বলেন, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের উসকে দিয়ে তেহরান যেকোনো সময় বাব-আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল এলোমেলো করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে সুয়েজ খালও কার্যত অচল হয়ে পড়বে।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে পারে— এই শঙ্কা তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে।
কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল, হরমুজ বন্ধ হয়ে গেলে ইরানের তেল রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর রপ্তানি কমে গেলে অর্থনৈতিক চাপ বেড়ে গিয়ে দেশটিতে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে।
কিন্তু বাস্তবে ইরান তেল রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের নড়বড়ে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে এবং সরকারকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রসদ যোগাচ্ছে।
এভাবে চলতে থাকলে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধ করার চাপ দেবে, এমন হিসাবও করছে তেহরান।
আবার, যুক্তরাষ্ট্রে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার চাপে থাকবেন বলে মনে করে ইরান।

খার্ক হাতছাড়া হয়ে গেলে ইরানের এসব হিসাব ওলটপালট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি দেখছেন টেইনহিল।
তিনি মনে করেন, খার্ক দখল করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে দর-কষাকষির একটা অস্ত্র চলে যাবে।
“নিজেদের তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে ইরানও একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়বে, যে চাপটা তারা এখন অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে।”
বিশ্লেষকদের ধারণা, খার্কে অভিযান চালানোর চিন্তা থেকেই হয়ত গত সপ্তাহে জাপান থেকে একটি নৌ ইউনিটকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠান ট্রাম্প।
এই ইউনিটে প্রায় ২২০০ থেকে ২৫০০ নৌসেনা রয়েছে। এ ধরনের একটি ইউনিটকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তর করাটা তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
টেইনহিল বলেন, “এই ইউনিটে যত সৈন্য রয়েছে, তা খার্ক দ্বীপ দখলের জন্য যথেষ্ট; হরমুজ প্রণালির ইরানের অংশ দখলের জন্য যথেষ্ট নয়। তার মানে, খার্ক দ্বীপের কথা মাথায় রেখেই তাদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।”
সামরিক বিশ্লেষকদের হিসাব বলছে, আক্রমণের শুরুতে খার্কে ইরানের অবশিষ্ট সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে আরেক দফা বিমান হামলা হতে পারে। ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে, এমন স্থাপনাও বিমান হামলার নিশানা হবে।
তবে পারস্য উপসাগর এখনো যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই জাপান থেকে পাঠানো নৌবহর সম্ভবত দূরেই অবস্থান করবে। সেক্ষেত্রে ‘এমভি-২২ ওসপ্রে’ বিমান ব্যবহার করে নৌ-সেনোদের দ্বীপে নামানো হতে পারে।
টেইনহিল মনে করেন, মার্কিন বাহিনীর প্রথম লক্ষ্য হবে এমন সব স্থাপনা দখলে নেওয়া, যেগুলোর মাধ্যমে ইরান সেনা বা ভারী সরঞ্জাম আনতে পারে। এ তালিকায় খার্ক বিমানবন্দরের ৫ হাজার ৯২২ ফুট দীর্ঘ রানওয়ে রয়েছে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাপক বিমান হামলা চালাতে হতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, খার্ক দখল করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যতটা কঠিন, ধরে রাখাটা তার চেয়ে বেশি কঠিন; মারাত্মক পরণতিও ডেকে আনতে পারে।
খার্ক রক্ষায় সেখানে তেল স্থাপনাগুলোতে ইরান আগুনও ধরিয়ে দিতে পারে। যেমন— উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েতের তেলক্ষেত্রে সাদ্দাম হোসেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
খার্কে আগুন ধরিয়ে দিলে পুরো এলাকা দূষিত হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে মার্কিন সেনারা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খার্কের মতো ছোট দ্বীপে প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার মতো রসদ মার্কিন বাহিনীর হাতে নেই। এমনকি ভৌগলিকভাবে দ্বীপটির অবস্থান এমন স্থানে, যেখানে আগুন ধরলে বাতাসের বিপরীতে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই।
খার্কে সামরিক অভিযান চালাতে ১৫ দিনের বেশি সময় লাগতে পারে মন্তব্য করে টেইনহিল বলেন, ওই দ্বীপ থেকে কুয়েত সিটির দূরত্ব প্রায় ১৪০ মাইল। কিন্তু ইরানের উপকূলের খুব কাছাকাছি।
সেখান দিয়ে যাতায়াতকারী পণ্যবাহী জাহাজ শুধু ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং ইরানের তথাকথিত ‘মশা বাহিনীর’ রোবোটিক ড্রোন হামলার মুখে পড়ার ঝুঁকিতেও আছে। এ ধরনের বাহিনী ব্যবহার করে রাশিয়ার একটি নৌবহর ইউক্রেইন আটকে রেখেছিল।
আকাশপথে সহায়তা পাঠানোও মার্কিন বাহিনীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। কুয়েত থেকে খার্কের দূরত্বের কারণে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা সম্ভবত সীমিত থাকবে।
সেক্ষেত্রে মূলত কাঁধে বহনযোগ্য ম্যানপ্যাডস ক্ষেপণাস্ত্রে ভরসা করতে হবে। সঙ্গে মিলবে মার্কিন যুদ্ধবিমানের টহল। এসব ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা যুদ্ধবিমান ড্রোন প্রতিহত করতে পারে, কিন্তু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারে না।
ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে খার্কের রানওয়ে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কার্গো বিমান সেখানে অবতরণ করতে পারবে না।

দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলার সক্ষমতা তেহরানের সীমিত হতে পারে, কিন্তু খার্ক তাদের বহু স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই রয়েছে। এর মধ্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্রও সফলভাবে লক্ষ্যভেদ করতে পারলে পুরো রানওয়ে অচল হয়ে পড়বে।
আরেকটি বড় হুমকি রয়েছে মার্কিন বাহিনীর জন্য, যেটা চলমান ইউক্রেইন যুদ্ধ থেকে এসেছে। সেখানে রাশিয়া এমন ড্রোন ব্যবহার করেছে, যেগুলো আকাশে ভেসে থেকে লক্ষ্যবস্তু খুঁজতে থাকে এবং পরে হামলা চালায়।
‘ল্যানসেট’ নামে পরিচিত এসব ড্রোনের খরচ ‘শাহীদ’ ড্রোনের মতোই কম। ইরান খার্কে এগুলো ব্যবহার করে সামরিক যান ও সৈন্যদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরান তাদের নিজস্ব ‘ল্যানসেট, সংস্করণ উন্মোচন করে। এটি যদি সত্যি হয়, তাহলে তা বাস্তবে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
যুদ্ধে ট্রাম্পের হাতে এখন যতগুলো অস্ত্র রয়েছে, খার্ক দ্বীপ সেগুলোর একটি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কখনো এ ধরনের অভিযান চালায়নি। ফলে প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে সেটি দখল করা এবং যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখা— এ ধরনের অভিযান সম্পূর্ণ নতুন ঝুঁকি তেরি করে।
এছাড়া এ ধরনের অভিযানে সাফল্য পাওয়ার নজির মার্কিন বাহিনীর নেই।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী বা গেরিলা কৌশল ব্যবহারকারী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কখনো জয়ী হতে পারেনি।
ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধগুলোতে তা স্পষ্ট হয়েছে। এসব যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু জয়ও পায়নি।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সরে যেতে হয়েছে এবং প্রতিপক্ষ নিজেদের বিজয়ী দাবি করেছে।
ইরান এসব বিষয় জানে এবং তারা চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হোক।
যুদ্ধ নিয়ে ইরানের হিসাবটা হলো, তেহরান যতদিন মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা সইতে পারবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ততদিন হরমুজ বন্ধের চাপ সইতে পারবে না।
আরো পড়ুন
ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা থেকে পিছু হটলেন ট্রাম্প, বললেন ‘ভালো আলোচনা চলছে’
ইসরায়েল ও প্রতিবেশীদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পাল্টা হামলার হুমকি ইরানের