Published : 20 Mar 2026, 12:58 AM
হরমুজ প্রণালি থেকে হাজার-বারোশ মাইল দূরে আরেকটি স্পর্শকাতর নৌপথ রয়েছে, যেটা ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যেকোনো সময় গড়বড় হয়ে যেতে পারে।
আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের এ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ব্যস্ততা হরমুজের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে যুক্ত করা এই প্রণালির নাম বাব-আল-মান্দেব।
এর প্রস্থ মাত্র ২০ মাইল, যা হরমুজের চেয়েও সরু। কিন্তু ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
বাব-আল-মান্দেবের একপাশে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র হুথি যোদ্ধাদের আধিপত্য রয়েছে। তারা ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি হামলার সময় এ নৌপথে জাহাজ লক্ষ্য করে অনেকবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
হুথিরা ইরানের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। ইরান যদি মনে করে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাব হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতিকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলবে, সেক্ষেত্রে তারা যেকোনো সময় হুথিদের ব্যবহার করতে পারে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের আগের হামলাগুলো লোহিত সাগরের বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটিয়েছে। ওই সময় আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে চলাচল করতে হয় অনেক জাহাজকে।
হুথির এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা শনিবার আভাস দেন, তারা এই সংঘাতে জড়ালে সবার আগে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে বাব-আল-মান্দেব বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত ‘প্রেস টিভিতে’ দেওয়া সাক্ষাৎকারে আবেদ আল-থউর নামের ওই কর্মকর্তা বলেন, “হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত হলে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নিস্টদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নৌ-অবরোধ ঘোষণা করা।
“সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা অধিকৃত অঞ্চলের দিকে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজ ও যুদ্ধজাহাজ, এমনকি বিমানবাহী রণতরীগুলোকেও থামিয়ে দেওয়া হতে পারে।”
২০২৩ সালে হুথিদের অবরোধ শুরুর আগে এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ১০ শতাংশের মতো তেল ও ২০ শতাংশের বেশি কনটেইনারবাহী জাহাজ চলাচল করত।
অবরোধের পর এই পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যায়, যা এখানো স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে; ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ছাড়িয়েছে ১০০ ডলার।

লোহিত সাগরে সৌদি আরবের ইয়ানবু তেলের টার্মিনাল রয়েছে। দেশটি হরমুজ প্রণালি এড়াতে এবং ইরানের অবরোধের প্রভাব কমাতে এই নৌপথ ব্যবহার করে।
সৌদি আরব তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে ইয়ানবুতে তেল সরবরাহ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে এই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৭ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত তারা, যেটি চলতি মাসে বেড়ে ৫৯ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। এই সংখ্যা শিগগরিই ৭০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু হুথিরা যদি আবার জাহাজে হামলা শুরু করে, তাহলে লোহিত সাগরের এই বিকল্প পথ সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে।
বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান লয়িড’স লিস্টের সাইমন মিলার বলেন, “হুথিরা যদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইয়ানবুতে লোড হওয়া সুপারট্যাংকারগুলোকে প্রথমে উত্তরে সুয়েজ খালের দিকে সরে যেতে হবে। এরপর মিশরের সুমেদ পাইপলাইনে আংশিক তেল আনলোড করতে হবে।
“এরপর আবার মেডিটেরানিয়ানে গিয়ে সম্পূর্ণ তেল জাহাজে তুলে ক্যাপ অব গুড হোপ এলাকা ঘুরে ভারতসহ পূর্বের অন্যান্য গন্তব্যে যেতে হবে সৌদি আরবকে।”
এক্ষেত্রে সময় বেশি লাগবে এবং নৌপথে বাড়তি শুল্ক গুনতে হবে বলেও স্মরণ করিয়ে দেন মিলার।

কিন্তু হুথিদের হাতে এত গুরুত্বপূর্ণ ‘অর্থনৈতিক অস্ত্র’ থাকার পরও কেন তারা এখনো সংঘাতে জড়ায়নি, সেই প্রশ্ন তুলেছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।
তেহরানের কিছু মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালানোর সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হিজবুল্লাহ যুদ্ধে জড়ায় ইরানে হামলা শুরুর দুই দিনের মধ্যে।
ইরবিলে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি জানিয়েছে ইরাকের ইসলামিক রেসিসট্যান্সের যোদ্ধারা।
কিন্তু হুথিরা এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যদিও তাদের নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি বলেছেন, “আমাদের আঙুল ট্রিগারে, যেকোনো মুহূর্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।”
কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, হুথিদের নিজেদের কিছু হিসাব-নিকাশ রয়েছে, যা তাদের যুদ্ধ থেকে দূরে রেখেছে।
গবেষষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের অ্যালিসন মাইনর চলতি মাসের শুরুতে লিখেছেন, “হুথিদের নিরবতা সেই শ্রেণিকে অবাক করেছে, যারা তাদেরকে শুধু ইরানপন্থি ‘প্রোক্সি’ বাহিনী হিসেবে দেখে।”
হুথিরা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি বলয়ের একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। তবে শিয়াপন্থি হলেও তারা লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইরাকি মিলিশিয়াদের মতো ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি অনুগত নয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠার চাথাম হাউজের গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি গত ১৫ মার্চ বলেন, “হুথিরা ইয়েমেনের একটি স্থানীয় গোষ্ঠী। ইরান তাদেরকে ব্যবহার করে এবং সমর্থন যোগায়, কিন্তু ইরান তাদের হাতে তৈরি নয়।”

কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এমনও হতে পারে যে, গেল দুই বছর লোহিত সাগরে হামলা চালাতে গিয়ে তাদের অস্ত্রের টান পড়েছে। কারণ ওই সময় তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক বিমান হামলাও সইতে হয়।
সেই যুদ্ধের ইতি ঘটেছিল যে চুক্তির মাধ্যমে, তা আপাতত স্থগিত আছে। তবে সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে না জড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন হুথিদের সতর্ক করে দিয়েছে।
হুথি কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ওমানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটন এই সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
তাদের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা ফোনে কার সঙ্গে কী আলাপ করছে, তা আমেরিকা ও ইসরায়েলের নজরে আছে।
হুথি কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড থেকে রক্ষা পেতে তাদের নেতাদের প্রকাশ্যে না আসার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু ইরান যুদ্ধ আরো তীব্র বা বিস্তৃত হলে তেহরান কি লোহিত সাগরে হুথিদের উসকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে?
যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, তাহলে এরই মধ্যে অস্থিরতায় পড়ে যাওয়া ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে চিন্তায় পড়ে যাবে।
আরও পড়ুন
আঞ্চলিক সমন্বয়ের জন্য তুরস্ক-মিশর-পাকিস্তানকে ইরানের আহ্বান
'ইরান যুদ্ধ আমাদের নয়', ট্রাম্পকে জানিয়ে দিল ইউরোপ
ইরানে পুলিশ হত্যার দায়ে দণ্ডিত তিনজনের ফাঁসি কার্যকর
পশ্চিম তীরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ৩ ফিলিস্তিনি নারী নিহত
ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েল আর হামলা চালাবে না: ট্রাম্প
বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্রে হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায় দিয়েছে ইরান
রণতরী জেরাল্ড ফোর্ডে নাবিকরাই আগুন দিয়েছে? তদন্তে মার্কিন নৌবাহিনী