Published : 15 Jul 2026, 07:49 PM
ইরানে কঠোর আঘাত হানা অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন বাহিনী খুব শিগগিরই দেশটির ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ বা পিকঅ্যাক্স পর্বত ধ্বংস করে দেবে।
সোমবার ‘হিউ হিউইট শো’-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, "আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন গুঁড়িয়ে দিতে যাচ্ছি। ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বল।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ওপর নজর রাখছি। এই মুহূর্তে সেখানে কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। প্রতিবারই যখন আমরা এটি নিয়ে কিছু শুনি, তখনই সেখানে বোমাবর্ষণ করি। তাই তারা এটি নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে না। তবে খুব দ্রুতই আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে বড় আঘাত হানতে যাচ্ছি।"
এর আগে একই দিনে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর পুনরায় অবরোধ আরোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র এবং নির্দিষ্ট মাশুলের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা নিশ্চিত করা হবে।
‘হিউ হিউইট শো’-র সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "আজ (বুধবার) রাতে এবং আগামীকাল আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত মারাত্মক হামলা চালাতে যাচ্ছি। আর এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো বিন্দুমাত্র ক্ষমতাও তাদের নেই।”
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত। একটি খুবই সুরক্ষিত একটি পারমাণবিক স্থাপনা। এ স্থাপনায় পাহাড়ের গভীরে দুটি সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো মার্কিন অস্ত্রাগারের সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকার ধ্বংসকারী বোমার নাগালের বাইরে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ক্রমে তীব্র হওয়ার মধ্যে ট্রাম্প এবার পিকঅ্যাক্স পর্বত নামে পরিচিত এই পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করার নতুন হুমকি দিলেন।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের পেছনের রহস্য কী?
তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত এই অত্যন্ত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটির দুটি সুড়ঙ্গ শত শত মিটার পুরু নিরেট গ্রানাইট পাথরের নিচে পাহাড়ের গভীরে খনন করায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকার ধ্বংসকারী বোমা দিয়ে এটি পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘আল-মনিটর’ ওয়েবসাইটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্দেহ করছে যে, তেহরান সেখানে সম্পূর্ণ গোপন ও অঘোষিত একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ‘কৌশলগত সুরক্ষা ঢাল’ হিসেবে কাজ করবে।
তবে ২০২০ সালে ওই স্থানটিতে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেহরান দাবি করে আসছে যে, এটি কেবল উন্নত সেন্ট্রিফিউজ তৈরি ও তা সংযোজনের জন্য একটি সাধারণ কারখানা।
ইরানে মার্কিন হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি:
সামরিক উত্তেজনা ও নতুন করে এই হুমকির মধ্যে পশ্চিম এমিয়ায় ‘অস্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার’ জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে তেহরান। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অভিযোগ করেছে, মার্কিন হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেল সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে টানা তৃতীয় রাতের মতো বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী নিখুঁত ও লক্ষ্যভেদী এই অভিযানে মার্কিন বাহিনী ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং নৌবাহিনীর সক্ষমতা লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করেছে। উভয় পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তৃতীয় দফার বোমাবর্ষণে প্রধানত ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোকে নিশানা করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কিশ, কেশম ও আবু মুসা দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাস ও জাম নামক এলাকায় একের পর এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি কেশম ও কিশ দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর জানিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বন্দর আব্বাসে তিনটি এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কিশ দ্বীপে দুটি বিকট বিস্ফোরণের কথা নিশ্চিত করেছে। তবে কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানায়নি।
ওদিকে ইরানি ওয়েবসাইট নূর নিউজ নিশ্চিত করেছে যে, সোমবার রাতের ওই হামলার পর কিশ দ্বীপের বন্দরে তিনটি বোটে আগুন ধরে যায়। অন্যদিকে খুজেস্তান প্রদেশের এক কর্মকর্তা মেহর নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমের ওমিদিয়েহ শহরে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন আহত হয়েছেন।
কোন দিকে যাচ্ছে সংঘাত?
এত তীব্র সামরিক সংঘাতের মধ্যেও কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি ডনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, ওয়াশিংটন নতুন করে হামলা ও ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রাখলেও যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো "অবশ্যই সম্ভব"।