Published : 14 Dec 2025, 06:48 PM
পৃথিবীতে সময় বলা সহজ। অ্যাটোমিক ঘড়ির স্পন্দন, জিপিএস স্যাটেলাইটের নীরব ভেসেচলা ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের সব ঘড়িই নিখুঁতভাবে মিলিয়ে রাখা হয়।
তবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সব জায়গায় সময় একইভাবে এগোয় না। কারণ, কীভাবে ঘড়ি চলবে তার ওপর প্রভাব ফেলে মাধ্যাকর্ষণ ও গতি। এ কারণে সৌরজগতজুড়ে সময় মাপা অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা যখন ভবিষ্যতের মঙ্গল গ্রহ অভিযানের পরিকল্পনা করছে ঠিক তখন এক বিস্ময়কর কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন বিজ্ঞানীরা: মঙ্গল গ্রহে এখন কয়টা বাজে?
এখন পর্যন্ত এ প্রশ্নের সবচেয়ে সঠিক উত্তরটি গণনা করেছেন ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি’ বা এনআইএসটি’র পদার্থবিজ্ঞানীরা।
তাদের নতুন গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল’-এ।
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতিদিন মঙ্গলের ঘড়ি পৃথিবীর ঘড়ির চেয়ে ৪৭৭ মাইক্রোসেকেন্ড দ্রুত চলে, অর্থাৎ এক মিলিয়নতম সেকেন্ডেরও কম।
তবে এই পার্থক্য স্থির নয়। কারণ, মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথ একটু দীর্ঘাকৃতির এবং গ্রহটিতে সূর্য, পৃথিবী, চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহের মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে থাকে। ফলে মঙ্গলবর্ষে সময়ের পার্থক্য সর্বোচ্চ ২২৬ মাইক্রোসেকেন্ড পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে পারে।
২০২৪ সালে এনআইএসটি’র চাঁদে সময় কীভাবে চলে তা নিয়ে করা এক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে নতুন এ গবেষণাটি। একইসঙ্গে এসব গবেষণা ভবিষ্যতের গভীর মহাকাশে সময় মাপার সিস্টেমের ভিত্তি স্থাপন করেছে, যা মহাকাশযান, ন্যাভিগেশন নেটওয়ার্ক ও বিভিন্ন গ্রহের মধ্যে যোগাযোগ পরিচালনায় সাহায্য করবে।
মঙ্গল গ্রহের একটি দিন বা সল এরইমধ্যে পৃথিবীর দিনের চেয়ে ৪০ মিনিট দীর্ঘ, আর লাল গ্রহটির বছর চলে ৬৮৭ পৃথিবীর দিন ধরে। এখানে দু’ধরনের সময় পার্থক্য বোঝানো হচ্ছে। একটি, দিন ও বছরের দৈর্ঘ্য, যাকে আমরা গ্রহের ঘূর্ণন ও সূর্যকে কেন্দ্র করে কক্ষপথের হিসাব হিসেবে দেখি।
আরেকটি হচ্ছে, সময় প্রবাহের গতি, যা একই সময়কাল মঙ্গলে ও পৃথিবীতে একরকমভাবে কাটে না। মাধ্যাকর্ষণ ও গতির প্রভাবের কারণে ‘ঘড়ির কাঁটা’ ভিন্নভাবে এগোতে পারে।
সময় নিজেই মাধ্যাকর্ষণের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ অঞ্চলে ঘড়ি ধীরে চলে, আর দুর্বল মাধ্যাকর্ষণ অঞ্চলে দ্রুত চলে। যেহেতু মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, ফলে সেখানে ঘড়ির কাঁটা একটু দ্রুত চলে।
তবে এই হিসাব করার কাজটি সহজ নয়। মঙ্গলের জন্য নির্ভরযোগ্য এক সময়মান তৈরি করতে এনআইএসটি’র পদার্থবিজ্ঞানী বিজুনাথ প্যাটলা ও নীল অ্যাশবিকে অনেকগুলো প্রভাবের বিষয় বিবেচনা করতে হয়েছিল।
প্রথমে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব মডেল করার জন্য মঙ্গলের একটি নির্দিষ্ট স্থলবিন্দু নির্বাচন করলেন তারা, ঠিক যেমন পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয় বিষয়টি তেমনই।
মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ নির্ধারণ করতে বহু বছরের মঙ্গল অভিযান সম্পর্কিত তথ্য ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। এরপর অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তু, বিশেষ করে সূর্য, বৃহস্পতি, শনি, পৃথিবী ও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণও যোগ করতে হয়েছে তাদের। কারণ, মঙ্গল মহাকাশে কীভাবে চলে তার ওপর প্রভাব ফেলে এসব বিষয়।
এসব শক্তির জটিল সংমিশ্রণ মঙ্গলে কয়টা বাজে সেই হিসাবকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কঠিন করে তুলেছিল।
এসব ক্ষুদ্র পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। মাইক্রোসেকেন্ড স্তরের ছোট ত্রুটিও যোগাযোগ নেটওয়ার্কে ব্যাঘাত তৈরি করতে পারে। আধুনিক ফাইভজি সিস্টেমের জন্যও মাইক্রোসেকেন্ডের দশমিক ভাগের মধ্যে সময়ের সঠিকতা প্রয়োজন।
বর্তমানে পৃথিবী ও মঙ্গলের মধ্যে বার্তা পৌঁছতে চার থেকে ২৪ মিনিট সময় লাগে। তবুও ভবিষ্যতে সময় মিলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে বিভিন্ন গ্রহের মধ্যে প্রায় নির্বিঘ্নে যোগাযোগ সম্ভব হবে, যা চাঁদ, মঙ্গল বা আরও দূরে মানববসতি স্থাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
মঙ্গলের পৃষ্ঠে অনেক রোভার বা নভোচারী ঘুরে বেড়াবে এমন দৃশ্য এখনও বহু দশক দূরে রয়েছে। তবে সেখানে সময় কীভাবে বয়ে চলে তা বোঝা ভবিষ্যতের ন্যাভিগেশন সিস্টেম ডিজাইনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যেমনটি প্যাটলা বলেছেন, “প্রথমবারের মতো মঙ্গলের সময় কীভাবে যাচ্ছে তা জানা সত্যিই ভালো বিষয়।”