স্মার্ট চশমা নিষিদ্ধ হল নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সকল আদালতে
ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক মাধ্যমের আসক্তি নিয়ে এক জুরি ট্রায়ালে সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হয়েছিলেন জাকারবার্গ। এ সময় তার দলের সদস্যদের চোখে মেটা স্মার্ট চশমা দেখা যায়।
আদালতের ভেতরে গোপনে ছবি তোলা বা রেকর্ডিং ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে সব আদালতে স্মার্ট চশমা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে নিউ ইয়র্ক প্রশাসন।
২০ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এ সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার ফলে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী বা আদালতের কর্মী কেউই আর ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনওয়ালা স্মার্ট চশমা পরে আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
এ নিষেধাজ্ঞা নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য, কাউন্টি, সিটি, টাউন ও গ্রাম পর্যায়ের মোট ১ হাজার ২৪০টি আদালতের জন্য কার্যকর হবে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সিরাকুজ’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, গেল সপ্তাহে ‘অনারেবল জেমস সি. টর্নি থ্রি ক্রিমিনাল কোর্টহাউস’-এর প্রবেশদ্বারে এ নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নোটিশ সেঁটে দিয়েছে নিউ ইয়র্ক প্রশাসন।
‘ইউনিফাইড কোর্ট সিস্টেম’ বা সমন্বিত আদালত ব্যবস্থার আওতাধীন সব ভবনের ভেতরে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনওয়ালা যে কোনো ধরনের চশমা বা মাথায় পরার গ্যাজেট ব্যবহার এ আদেশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হল।
প্রেসক্রিপশন বা চোখের পাওয়ারের জন্য তৈরি বিশেষ স্মার্ট চশমাও এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে। আদালত প্রাঙ্গণে সাঁটানো নোটিশে বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষকে ভবনে প্রবেশের সময় স্মার্ট চশমার বদলে সাধারণ চশমা সঙ্গে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের কিছু আদালতে আগে থেকেই স্মার্ট চশমা ব্যবহারের অনুমতি না থাকলেও পুরো অঙ্গরাজ্যজুড়ে এমন সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে নিউ ইয়র্কই প্রথম।
কেন আদালতে নিষিদ্ধ হল স্মার্ট চশমা?
প্রথমত, আদালতে সাধারণত কোনো ধরনের রেকর্ডিংয়ের অনুমতি থাকে না। আর ‘নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিফাইড কোর্ট সিস্টেম’-এর নিয়মেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “আদালতের অধিবেশন চলুক বা না চলুক যে কোনো সময় বা যে কোনো অনুষ্ঠানে কোর্টহাউস, এর ভেতরের কোনো এজলাস, অফিস বা বারান্দায় ছবি তোলা, ফিল্ম বা ভিডিওটেপ, অডিও রেকর্ডিং, সম্প্রচার বা টেলিকাস্টিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।”
সাধারণ ক্যামেরা বা ফোন উঁচিয়ে ধরার কোনো প্রয়োজন না থাকায় স্মার্ট চশমা দিয়ে খুব সহজেই এই নিয়ম ভেঙে গোপনে রেকর্ড করা সম্ভব। সাধারণত এ ধরনের চশমায় ছোট আলো বা এলইডি থাকে, যা ছবি বা ভিডিও ধারনের সময় জ্বলে ওঠে বা মিটমিট করে আশপাশের মানুষকে সতর্ক করে দেয়।
তবে ব্যবহারকারীরা চাইলে নিজেদের সুবিধার্থে এ আলোটি নিষ্ক্রিয় করে দিতে বা অর্থের বিনিময়ে কোনো প্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞকে দিয়ে তা পুরোপুরি সরিয়েও ফেলতে পারেন।
আদালতে স্মার্ট চশমা ব্যবহারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজরে এসেছে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আলোচিত এক ঘটনার পর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তি নিয়ে এক জুরি ট্রায়ালে সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হয়েছিলেন মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ।
তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার সময় তার দলের সদস্যদের চোখে ‘মেটা রে-ব্যান’ স্মার্ট চশমা দেখা যায়। এ দৃশ্য দেখে বিচারক তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন, এসব ডিভাইস দিয়ে যেন আদালতের কোনো কার্যক্রম রেকর্ড করা না হয়।
সতর্কবার্তার আগে তাদের কেউ চশমা দিয়ে রেকর্ড করেছিলেন কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে জুরিদের চেহারা রেকর্ড হওয়া ও তাদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিচারক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
বর্তমানে মেটার তৈরি বিভিন্ন স্মার্ট চশমা বাজারে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজে মেলে। এসব ডিভাইসের সিস্টেম যদি বুঝতে পারে যে এর ‘ক্যাপচার এলইডি’ বা রেকর্ডিং নির্দেশক আলোটি কিছু দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে তবে চশমাটি আর ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারে না।
নিজেদের ডিভাইসের বিরুদ্ধে এমন সমালোচনার জবাবে এক পোস্টে মেটা বলেছে, তারা নতুন সফটওয়্যার আপডেট নিয়ে আসছে, যার ফলে সিস্টেম যদি বুঝতে পারে যে ‘ক্যাপচার এলইডি’র সঙ্গে কোনো ধরনের বাহ্যিক কারসাজি বা তা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চশমার ক্যামেরাটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।
নিষেধাজ্ঞা যেভাবে কার্যকর হবে
ব্যবহারকারীরা তাদের স্মার্ট চশমা মডিফাই বা পরিবর্তন করেছেন কি না তা আদালতের জন্য কোনো বিবেচ্য বিষয় হবে না। কারণ নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন আদালত এই ধরনের কোনো ডিভাইসকে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে দেবে না।
নতুন নিয়ম অনুসারে, কেউ স্মার্ট চশমা পরে এলে ভবনে প্রবেশের আগেই দায়িত্বরত ইউনিফর্মধারী কোর্ট অফিসারদের কাছে তা জমা দিতে হবে। এ নিয়ম আইনজীবী থেকে শুরু করে আদালতের সব কর্মীর জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।
স্মার্ট চশমা নিয়ে আরও যত কড়াকড়ি
কেবল আদালতই নয়, গোপনে ছবি ও ভিডিও ধারণের সুবিধা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের আরও অনেক জায়গাতেই এ ডিভাইসের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।
এ বছরের শুরুতে ‘রয়াল ক্যারিবিয়ান’ ক্রুজ লাইন তাদের জাহাজের বেশ কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় স্মার্ট চশমার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে পাবলিক রেস্টরুম বা শৌচাগার, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি এলাকা, চিকিৎসাকেন্দ্র ও ক্যাসিনো।
এর আগে, গেল বছর প্রাইভেসি লঙ্ঘনের আশঙ্কায় ‘এমএসসি ক্রুজেস’ও এ ডিভাইসের ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
অন্যদিকে, গাড়ি চালানোর সময় চালকদের মনোযোগ বিচ্যুতি ঠেকানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতারাও নিষিদ্ধ ডিভাইসের তালিকায় স্মার্ট চশমাকে যোগের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
গোপনে ছবি ও ভিডিও তোলার এ সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও উদ্বেগ যত বাড়ছে অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক কোম্পানিই যে এই চশমার ওপর যে কড়াকড়ি দেখা যাবে তা বলাই বাহুল্য।
