Published : 10 Jul 2026, 10:04 AM
সরকারের স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের আওতায় গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ও কাশিয়ানী উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিশুদের দুধ, ডিম, কলা বনরুটি ও বিস্কুট খাওয়ানো হচ্ছে। তবে সরবরাহ করা রুটি, কলা ও ডিমের গুণগত মানসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, বনরুটি শক্ত, খেতেও ভাল না। সিদ্ধ ডিম থাকে ফাটা-ভাঙা। কলাও কখনো কাচা আবার কখনো বেশি পাকা। আর সবগুলোই আকারে ছোট।
কোটালীপাড়া উপজেলার হিরণ ইউনিয়নের ৯৩ নম্বর দক্ষিণ হিরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশ্রাফুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের রুটি কখনো কোটালীপাড়ার বেকারির আবার কখনো ভোলা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ থেকেও প্রস্তুত করে দেওয়া হয়। তবে ভোলা, বরিশাল ও গোপালগঞ্জ থেকে আনা রুটি আকারে ছোট ও তেমন সফট নয়। খেতেও ভাল না।”
একই ধরনের অভিযোগ ১৩০ নং পূর্ব বর্ষাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিঞ্জুরী ইউনিয়নের ৮২ নং ছত্রকান্দা প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুশলা ইউনিয়নের ৯২ নং টুপুরিয়া সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদেরও।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে, উপস্থিতি বৃদ্ধি ও ঝরে পড়া রোধে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালাচ্ছে সরকার।
গোপালগঞ্জের দুটি উপজেলার ৩৫৮ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের নভেম্বর থেকে। এরমধ্যে কোটালীপাড়ার ১৮৭ ও কাশিয়ানী উপজেলার ১৭১টি বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ কার্যক্রমের আওতায় সপ্তাহের রোববার, বুধ ও বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের বনরুটি এবং সেদ্ধ ডিম, সোমবার বনরুটি ও দুধ এবং মঙ্গলবার বিস্কুট ও কলা খাওয়ানো হয়।
এর মধ্যে বনরুটির ওজন ১২০ গ্রাম, কলার ওজন ১০০ গ্রাম, ডিমের ওজন ৬০ গ্রাম, দুধের ওজন ২০০ গ্রাম ও ফর্টিফাইড বিস্কুটের প্যাকেটের ওজন ৭৫ গ্রাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার।
কোটালীপাড়া উপজেলার দক্ষিণ হিরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফাতেমা খানম বলেন, “এ কার্যক্রম শুরুর পর স্কুলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এটি অব্যাহত থাকলে আগামীতে শতভাগ শিক্ষার্থী উপস্থিত হবে বলে আশা করছি।”

এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, “আমার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২১৬ জন। এখন গড় উপস্থিতি প্রায় ৯০%।”
তিনি বলেন, “ঠিকাদারের লোকজন প্রতিদিন ১৯৫ জনের খাবার যথা সময়ে পৌঁছে দেয়। কোন দিন বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত হলে খাবার কম হয়ে যায়। তখন খাবার ভাগ করে দেই।
“আবহওয়া খারাপ থাকলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমে যায়। তখন বেঁচে যাওয়া খাবার ছুটির সময় উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মাঝে বণ্টন করে দেই। পরীক্ষার সময় প্রায় সব শিক্ষার্থী স্কুলে আসে তখন খাবার ভাগ করে দেওয়া হয়।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “এখানে ভোলা থেকে রুটি সরবরাহ করা হচ্ছে। সেখান থেকে রুটি আসতে ১-২দিন সময় লাগছে। তাই এ রুটি তুলনামুলকভাবে শক্ত, সফট নয় ও স্বাদ কম। আগে কোটালীপাড়ায় উৎপাদিত রুটি সরবরাহ করা হত। তার মান ভাল ও খেতে সুস্বাদু ছিল।”
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সৈয়দ সাজ্জাদ বলে, “খাবারের মধ্যে দুধ ও বিস্কুট খুবই ভাল। কিন্তু রুটি, কলা ও ডিম বেশি ভাল না।”
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তায়েবা জান্নাত ত্বহা বলে, “আমাদের বনরুটি মাঝে মাঝে পোড়া ও শক্ত থাকে। রুটি থেকে গন্ধ আসে। খেতেও মজা নয়। মাঝে মাঝে ফাটা ডিম পাওয়া যায়। কলা ছোট, কাঁচা বা বেশি পাকা থাকে।”
একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী সানজিতা বলে, “আমাদের মাঝে মাঝে খাবার ভাগ করে দেওয়া হয়। পরীক্ষার সময় এ ঘটনা বেশি ঘটে। তাই পর্যাপ্ত খাবার দিতে অনুরোধ করছি।”
ওই বিদ্যালয়ের দপ্তরী মুন্সি মাসুম বিল্লাহ বলেন, “ঠিকাদারের সরবরাহকারীর কাছ থেকে আমি বেছে বেছে ডিম, কলা, রুটি সংগ্রহ করি। তারপরও ফাটা, ভাঙা ডিম থাকে। কলা পাকতে ২ দিন সময় লাগে। কখনো কখনো রুটির মধ্যে ছত্রাক থাকে। এসব রুটি শিক্ষার্থীরা খেতে পারে না।

পূর্ব বর্ষাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান বলেন, “প্রতি স্কুলেই গড় উপস্থিতির উপর নির্ভর করে ৯০ শতাংশ খাবার সরবরাহ করা হয়। ডিম ৬০ গ্রাম, কলা ১০০ গ্রাম ও বনরুটির ওজন ১২০ গ্রাম হওয়ার কথা। কিন্তু এগুলোর ওজন প্রায়ই কম থাকে।কলার মান সবচে খারাপ। মাঝে মধ্যেই আমরা এসব খাবার ফেরত দেই।”
কাশিয়ানী উপজেলার ৪৩ নং পরাণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজবুন্নাহারের বলেন, “এসব খাবার শতভাগ মানসম্মত নয়। এদিকে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের তদারকি আরো বৃদ্ধি করা দরকার। পাশাপাশি শিশু খাদ্যের ব্যাপারে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে যত্নবান ও আন্তরিক হতে হবে। শুধু ব্যবসা করলে হবে না।”
এ বিষয়ে খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার ফরিদপুর অঞ্চলের জেলা ম্যানেজার মোহাম্মদ সেলিম হোসেন বলেন, “আমাদের সংস্থা ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি পরিচালনা করছে। রুটি, ডিম বা কলা নিয়ে কোনো অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট খাদ্যসামগ্রী পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “শিশুদের জন্য নিম্নমানের বা ফাঙ্গাসযুক্ত রুটি কখনো সরবরাহ করা হয় না। প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচিত বেকারি থেকে কেমিস্ট ও পুষ্টিবিদের তত্ত্বাবধানে রুটি প্রস্তুত করা হয় এবং সংস্থার নিজস্ব পুষ্টিবিদও মান নিয়ন্ত্রণ করেন।”
তিনি আরও বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত ওজনের ডিম ও কলা সরবরাহের চেষ্টা করা হয়। কোনো ডিম বা কলার ওজন কম হলে তা পরিবর্তন বা অতিরিক্ত দিয়ে পূরণ করা হয়।
“ভবিষ্যতেও কোনো অভিযোগ এলে প্রয়োজনে সরবরাহ পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাচ্চাদের মানসম্মত খাবার সরবরাহে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
কোটালীপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্ত বলেন, “স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরুর পর সরবরাহ অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তদারকি করে আমরা সে অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটিয়েছি। তদারকি অব্যাহত রয়েছে।”
বনরুটি নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে ‘রুটি কিছুটা শক্ত ও স্বাদ কম’ স্বীকার করে তিনি বলেন, “কোটালীপাড়ার লোকনাথ বেকারীর রুটি সফট ছিল। কিন্তু স্কুল ফিডিং পরিদর্শন টিম ওই কারখানা পরিদর্শন করেন। তারা সেখানে ভাল পরিবেশ পায়নি, তাই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই বেকারি থেকে রুটি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। তাই বর্তমানে সফট রুটি দেওয়া হচ্ছে না।”
ডিম ও কলা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা সেটি সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি। সরবরাহকারীরা এগুলো পরিবর্তন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া খাবারের মান খারাপ হলে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ফেরৎ দিতে বলেছি।”