Published : 10 Jul 2026, 12:44 AM
ছেলের ফেইসবুকে কমেন্ট নিয়ে যখন গ্রামবাসী আলোচনা করছে, তখনই বিপদ আঁচ করতে পেরে এলাকার ‘গণমান্য’ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন নিখিল রায়। মীমাংসার জন্য দ্রুত ছেলেকে নিয়ে তিনি বাড়ি থেকে বাদাঘাট বাজারে যান। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে কিছু লোক ‘মব’ তৈরি করে তাদের আটকে ফেলে বলে তার ভাষ্য।
একপর্যায়ে ছেলেকে নিয়ে নিখিল একজনের দোকানে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে উঠলে তাহিরপুর থানার পুলিশ এসে তার ছেলেকে পেছন দরজা দিয়ে থানায় নিয়ে যায়।
এদিকে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে মিছিল শুরু করে দেয়। সেই মিছিলকারীরা বাজারের প্রধান সড়ক ধরে গড়কাটি গ্রামে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মন্দির আর দোকানপাটে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। কয়েক দফা সেখানে হামলা-ভাঙচুর হয় বলে গ্রামের লোকজন অভিযোগ করেছেন।

সেদিন ছিল ২৩ জুন; সুনামগঞ্জের গড়কাটি ও বাদাঘাট বাজারের চারটি মন্দির, কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের এই ঘটনা ঘটে।
২১ বছর বয়সি ছেলে সুদীপ্ত রায়কে পুলিশে দেওয়ার পরও কেন এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটল, তা এখনও বুঝতে পারছেন না নিখিল রায় ও কেতকী রায় দম্পতি।
স্থানীয় হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ এমন হামলায় ঘটনায় অবাক, বিহ্বল। তারা কোনোদিন এ ধরনের সমস্যায় পড়েননি। পরস্পরের প্রতিবেশী হিসেবে তারা শান্তিতেই বসবাস করে আসছিলেন।
বাদাঘাট বাজার বণিক সমিতির সভাপতি নজরুল সিকদার বলেন, “এই এলাকায় মুসলমান-হিন্দুরা অনেক বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করছি। এলাকার হিন্দুদের সঙ্গে আমার চলাফেরা, গাড়কাটি গ্রামের নিখিল রায়, অজিত রায়ের সঙ্গে আমার খুব ভালো সর্ম্পক।”
তিনি বলেন, “বড় একটি বিশৃঙ্খলা ঘাটানোর জন্য এটি করা হয়েছিল। আমার চেষ্টা করেছি, পুলিশসহ বাজারের ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে।”
একই ধরনের কথা বললেন তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গণেশ তালুকদার।

“এমন ঘটনা আমাদের এলাকায় এই প্রথম হয়েছে। আমাদের এলাকাটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার এলাকা। দীর্ঘ বছর ধরে আমরা একসঙ্গে বসবাস করছি। আগে কখনও এরকম কিছু ঘটেনি।”
তার ভাষ্য, “ভাঙচুর ও হামলা বন্ধে বাজার বণিক কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তৎপর ছিলেন। কিন্তু সবাই মিলেও পারা যায়নি। এলাকার খুব ক্ষতি হয়ে গেল আরকি! আমরা তো সবাই একসাথে থাকি।”
তবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে সুনামগঞ্জ জেলায় হামলার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ২০২১ সালের মার্চ মাসে শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দোয়ারাবাজার উপজেলার মংলারগাঁও গ্রামেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে।
অদ্বৈত প্রভু আর শাহ আরেফিনের ভূমি
সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী গড়কাটি গ্রামটির অবস্থান মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের যাদুকাটা নদীর তীরে। নদীর অপরপারে রাজারগাঁও; লোকে যাকে ‘লাউর-নবগ্রাম’ বলেও ডাকে।
এখানেই রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অদ্বৈত আচার্য মহাপ্রভুর আশ্রম। এই আশ্রম থেকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই লাউরেরগড় গ্রাম। সেখানে রয়েছে হযরত শাহজালালের অন্যতম সহচর সুফি সাধক হযরত শাহ আরেফিনের (র.) আস্তানা (মাজার)।
প্রতিবছর চৈত্র মাসে এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের লাখো ভক্ত পণতীর্থ গঙ্গা স্নানের জন্য আসেন। নদীর দুই তীরে কয়েক দিনব্যাপী বারুণী মেলা বসে।
একই সময় শাহ আরেফিনের মাজারে বার্ষিক ওরশের আয়োজন হয়। দুই আয়োজন মিলে চৈত্রের সেই সময়টা একাকার হয়ে যায়। দুই ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে দুটি অনুষ্ঠানই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
গড়কাটি গ্রামটি ছোট হওয়ায় হিন্দু তীর্থযাত্রীদের অনেককেই লাউরেরগড়ের মুসলমান সম্প্রদায়ের বাড়িতে ওঠেন। মুসলমান পরিবারগুলোও তীর্থযাত্রীদের পানি পানের ব্যবস্থা করে। হিন্দু ও মুসলমানরা মিলিতভাবেই মেলাটি পরিচালনা করে।

যে এলাকার পরিবেশ এমন, সেখানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে মিছিল করে হামলার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য দেখছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তাদের ভাষ্য, হামলায় এলাকার লোকজন কম ছিল, আশপাশের এলাকা থেকেও লোকজন এসেছে। অপরিচিত কিছু লোকও ছিল।
হামলা-ভাঙচুরের পর ওই এলাকা পরিদর্শন করেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সনাতন ধর্মাবলম্বী স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেন।
এই সংসদ সদস্য সেখানে বলেন, “আমার এই অঞ্চলের এই মন্দিরে আমি মনে হয় ২০ বছর যাবত প্রত্যেক দুর্গাপূজাতে আসি। দুর্গাপূজাতে হিন্দু-মুসলিম সকলে একসাথে মিলে এই পূজাপার্বণ উনারা শেষ করেন। আমরা আমাদের আগের সম্প্রীতিতে থাকতে চাই। আমার ধর্ম কখনোই বলে না, এক ধর্ম আরেক ধর্মের মন্দির কিংবা মসজিদ ভাঙার জন্য।”
মীমাংসায় গিয়ে ‘মবের’ মুখে
নিখিল রায় ও কেতকী রায়ের চার ছেলে ও এক মেয়ে। বড় তিন ছেলে বাড়ির বাইরে থাকে। সুদীপ্ত আর তার ছোট বোন বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে থেকেই পড়ালেখা করে। সুদীপ্তর এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল।
পুলিশ বলছে, সুদীপ্ত ফেইসবুকে তার আইডি থেকে একজনের পোস্টে ফটোকার্ড দিয়ে একটি কমেন্ট করেন। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
২৩ জুন সুদীপ্তর বিষয়টি নিয়ে গ্রামে আলোচনার মধ্যেই নিখিল রায় বাদাঘাট বাজারে তার পরিচিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা ছেলেকে নিয়ে বাজারে যাওয়ার কথা বলেন। বিষয়টি মীমাংসার জন্য নিখিল রায় ও তার এক আত্মীয় মিলে সুদীপ্তকে নিয়ে বাদাঘাট বাজারে যান।
কেতকী রায় বলেন, “আমরা তো মোবাইল চালাই না, আমার ছেলে মোবাইল চালায়, সে কী করেছে আমরা তো জানি না। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে আমার এক দেবর সুদীপ্ত ও তার বাবাকে নিয়ে বাদাঘাট বাজারে যায়।”

নিখিল রায় বলেন, “আমি ফেইসবুক বুঝি না। নিজে বাটন মোবাইল ব্যবহার করি। ছেলেকে বাদাঘাট বাজারে নিয়ে গেলে উত্তেজিত জনতার জন্য পারা যাচ্ছিল না। তাকে ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তখন একটা দোকানে নিয়ে ছেলেকে রাখি। দোকানোর ভিতর রাখার সময়ও তাকে নিয়ে যেতে বার বার চেষ্টা করছিল। মিছিল করে হাজার-হাজার লোক তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিল।”
তিনি বলেন, পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে সুদীপ্তকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে নিয়ে যায়। জনতা তখনও স্লোগান দিচ্ছিল।
‘মুক্তার হোসেন ভাই ছেলেটাকে বাঁচিয়েছে’
নিখিল রায় খুব স্পষ্টভাবে বলছিলেন, তার ছেলেকে বাঁচিয়েছেন সেখানকার দোকান মালিক মুক্তার হোসেন।
তিনি বলেন, “শত শত লোক যখন সুদীপ্তকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছিল, তখন দোকানের শাটার নামিয়ে ওকে রক্ষা করেন মুক্তার ভাই। শাটার না লাগালে তাকে মেরে ফেলত। মুক্তার ভাইয়ের জন্যই ছেলেটাকে বাঁচানো গেছে, নাহয় ছেলেকে মেরে ফেলত ওরা। হাজার-হাজার লোক ওকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছিল বার বার।”
বাদাঘাট বাজারের ব্যবসায়ী মুক্তার হোসেন বলেন, “এলাকার কয়েকজনকে জানিয়ে বিষয়টি সমাধান করার জন্য ছেলেকে নিয়ে নিখিলদা আমার দোকানের সামনে এসেছিলেন। যাদের সঙ্গে কথা বলে এসেছিলেন, তারা বলেছিলেন, আমার দোকানে সামনে থাকার জন্য।
“এই সময় ওই লোকজনও (যারা মিছিল করছিলেন) খবর পেয়ে চলে আসে। তারা তাকে মারতে চায়, ধরে নিতে চায়। আমি তাদের বলি, আশ্রয় যেহেতু নিয়েছে, তাকে মেরে লাভ নাই। কিন্তু তারা নিয়ে যেতে চায়। আমি কোনো রকমে পারছিলাম না, পরে শাটার বন্ধ করে আটকাই।”
মুক্তার হোসেন বলেন, “পরে বাজার কমিটির লোকজন এসে হেল্প করে। পরে তাকে (সুদীপ্ত) নিরাপদে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়। পুলিশ এসে পেছন দিক দিয়ে তাকে বের করে নিয়ে যায়। হাজার-হাজার মানুষ, তাদের থামানো সম্ভব ছিল না।”

সুদীপ্তকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার পরই মিছিল
সুদীপ্তকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার পর পরই কয়েকশ মানুষ বাদাঘাট বাজারের প্রধান সড়ক ধরে নদীর পাড় দিয়ে মিছিল করে গড়কাটি গ্রামে ঢোকে।
সুদীপ্তর কাকা দিলীপ রায় বলেন, “শত শত লোক মিছিল নিয়ে এসে তিনবার বাড়িতে হামলা দিয়েছে। মানুষজন তাদের ফিরিয়ে দিলে আবার এসে তারা হামলা করে, এভাবে তিনবার এসেছে। বাড়ির মহিলারা অন্য ঘরে দরজা বন্ধ করেছিল।
“বাদাঘাট বাজারে আমাদের বাড়ির অরুণ রায় আর তার ছেলে রঙ্গন রায়কে মারধর করেছে হামলাকারীরা। আরও কয়েকটি দোকানে ভাঙচুরের চেষ্টা করেছে।”
কেতকী রায় বলেন, “আমার বাড়িঘরের সবকিছু ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘরে থাকা সবকিছু নিয়ে গেছে। ঘরে টাকা-পয়সা ছিল, স্বর্ণ ছিল, সবকিছু নিয়ে গেছে। আমাদের দোকানটাও ভাঙচুর করা হয়েছে। আমার ছেলেকে আইনের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙার কী প্রয়োজন? এ রকম ভাঙচুর আমরা কোনোদিন দেখিনি।”
বাদাঘাট বাজার এলাকার একজন ব্যবসায়ী বলেন, “গ্রামের মন্দির-বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনাটি হয়ত আটকানো যেত, যদি এলাকার স্থানীয় রাজনীতিবিদরা এগিয়ে আসতেন। ধর্মীয় সম্পৃক্ততার বিষয় হওয়ায় তারা হয়ত আসতে চাননি।”
বাদাঘাট বাজার ও গড়কাটি গ্রামের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, মিছিলে প্রচুর অপরিচিত ও মজুর শ্রেণির মানুষজনকে তারা দেখেছেন। এরা কোথা থেকে এসেছে, তা জানেন না তারা।
এখনও ধ্বংসস্তূপ
গড়কাটি গ্রামের সার্বজনীন মন্দির ও সুদীপ্ত রায়ের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের ক্ষতিচিহ্ন রয়ে গেছে। শুক্রবার দুপুরের দিকে সুদীপ্তের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে সুনসান নীরবতা। বাড়ির সামনে লোক অপরিচিত লোক দেখে এগিয়ে আসেন লিখিল রায়।
সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ঘরের চারদিক দেখাতে থাকেন। ঘরের ইটের দেয়াল ভাঙা হয়েছে হাতুড়ি দিয়ে, টিনের বেড়াও ভেঙেছে হামলাকারীরা। বাড়ির পেছনে থাকা টিউবওয়েল কয়েক টুকরো হয়ে আছে। পড়ে আছে পানির মোটর, ট্যাংক।

ঘরের পেছনের পেঁপে গাছও রক্ষা পায়নি তাণ্ডব থেকে; ভাঙচুরের ১০ দিন পার হলেও খাবার পানির উৎস টিউবওয়েলটি সারানো হয়নি হয়নি।
পশ্চিম দিক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন আসবাপত্রে; যেগুলো ভেঙে ফেলে রাখা হয়েছে। ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে চেয়ার-টেবিল, কাচ, ঘুমানোর খাট, ড্রেসিং টেবিল, খাবারের পানির জগসহ নানা জিনিসপত্র।
রান্নাঘরের নানা জিনিসিপত্র মেঝেতে ছড়ানো। সেখানে দেয়ালে দেখা গেল হাতুড়ি দিয়ে ভাঙার চিহ্ন। হঠাৎ করে দেখলে কেউ মনে করবে এ যেন ধ্বংসস্তূপ। বাড়ির টিনের বেড়াগুলোতে ভাঙচুরের ক্ষত ভেসে আছে।
এ ছাড়া যাদুকাটা নদীর পারে থাকা সুদীপ্ত রায়ের বাবার দোকানেও ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা গেল।
হামলার বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তাহিরপুর উপজেলা সভাপতি মো. মুখলেছুর রহমান বলেন, “বাজার কমিটিসহ আমরা সবাই মিলে ছেলেটাকে পুলিশের কাছে দিয়েছি। এ সময় বাজার বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছিল। আমরা পাবলিককে না দেখিয়ে তাকে পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছি। পাবলিকের সমানে তাকে তুলে দিতে গেলে কিছু একটা হয়ে যেত। পাবলিক কমার পর আমরা তাকে গোপনে তুলে দিয়েছি।”
ভাঙচুরের বিষয়টি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ‘ঠিক নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “গাড়কাটি গ্রামে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি অনাকাঙ্ক্ষিত, এটি অনুচিত কাজ। আমরা কোনো সময় সাপোর্ট করি না। এটি লজ্জাজনক। আমরা বিষয়টি এমপি সাহেবের কাছে তুলে ধরেছি।
“আমরা এলাকার সম্প্রীতি বজায় রেখে চলছি। হিন্দু-মুসলমান না, সবাইকে মানুষ হিসেবে দেখছি আমরা। সকল সমাজে নিয়ম-শৃঙ্খলার বাইরে কিছু লোক থাকে, যারা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটায়। এই ঘটনাটি উভয়ের জন্য লজ্জার।”

হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় নাটমন্দির
সুদীপ্ত রায়ের বাড়ির পেছনে রয়েছে গড়কাটি গ্রামের সার্বজনীন মন্দির। মন্দিরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া নাটমন্দির। পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত বড় আকারের হাতুড়ি দিয়ে মন্দির ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নাটমান্দিরের পিলারগুলো ভেঙে ফেলায় টিনের চালাটি মাটিতে পড়ে আছে।
নাটমন্দিরের উত্তর দিকে রয়েছে একটি কালী ও একটি দুর্গা মন্দির। দুর্গা মন্দিরের কোথাও ভাঙা হয়েছে ইটের দেয়াল, কোথাও ভাঙা হয়েছে দাঁড়িয়ে থাকা পাকা পিলারের নিচের অংশ। ভেতরে থাকা পূজার নানা উপকরণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে।
আর কালীমন্দিরের বারান্দার টিন, ইটের দেয়াল ও মন্দিরের ভেতরে থাকা প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিমাটিকে টেনে দরজার সামনে আনা হয়েছে।
গড়কাটি উত্তরপাড়া সার্বজনীন মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুব্রত রায় সুমন বলেন, “বিষয়টি হচ্ছে, সে ধর্মীয় কূটক্তি করেছে, সেটা তার ভুল হয়েছে। সে তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে এটি সমাধানের জন্য এলাকার স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তির কাছে বাদাঘাট বাজারে যায়। বাদাঘাট যাওয়ার পরই উত্তোজিত জনতা তাকে আটক করে, পরে পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়।
“তারপর কিছু উত্তোজিত জনতা ফেইসবুকে লাইভ ও মাইকিং করে নদীর পারে সবাই এক হওয়ার জল্য বলে এবং ধর্মীয় কূটক্তি করার জন্য তাকে শায়েস্তা করতে চায়। তখন জনতা এসে তার বাড়িঘর ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে তা। কিন্তু এলাকার কিছু মানুষের চেষ্টায় এটা থেকে জনতা ফিরে আসে।”
সুব্রত বলেন, “প্রথমে সুদীপ্তর বাড়ি ভাঙচুর করা হয়। তারপর আমাদের গ্রামের মন্দিরে তাণ্ডব চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। আমাদের গ্রামের কালীমন্দির, দুর্গামন্দির এবং নাটমন্দিরে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। মন্দিরে থাকা জিনিসপত্র লুট হয়েছে। মন্দিরে ভক্তদের জন্য বসার জায়গাটি ভাঙচুর ও বসার জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়।”
তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গণেশ তালুকদার বলেন, গড়কাটি গ্রামের কালীমন্দির, একটি দুর্গামন্দির ও একটি নাটমন্দিরে হামলা-ভাঙচুর করা হয়েছে। মোট তিনটি ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাদাঘাটবাজারে থাকা কালীমন্দিরে ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। মন্দিরে থাকা কালী প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। মন্দিরের বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নেই, অফিস কক্ষের চেয়ার-টেবিলও ভাঙচুর করা হয়েছে।
গণেশ বলেন, “মন্দিরের এই ঘটনায় প্রশাসনের লোকজন তথ্য নিয়ে গেছে, কিন্ত কারা জড়িত সেটা এখনও জানা যায়নি।”
‘ছেলের ভবিষ্যৎ শেষ’
ছেলে পড়ালেখা করে সংসারের হাল ধরবে এই আশায় বুক বেঁধে ছিলেন নিখিল রায় ও কেতকী রায়। কিন্তু ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পুলিশের করা মামলায় সুদীপ্ত এখন করাগারে। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাবা-মা।
জল টলমল চোখে কেতকী রায় বলেন, “আমার ছেলে এইচএসসি পরীক্ষা ছিল। সে তো আর পরীক্ষা দিতে পারেনি। তার ভবিষ্যৎ তো শেষই হয়ে গেছে।”
নিখিল রায় বলেন, “আমরা আবেদন করেছিলাম যেন সে পরীক্ষাটা দিতে পারে। কিন্তু পাবলিকের ভয়ে পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কারণ তাকে মেরে ফেলে কি না, আগুন দিয়ে যদি জ্বালিয়ে দেয়।
“ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো ছিল, ছাত্র ভালো ছিল। কিন্তু ওপর ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আমাদের স্বপ্ন ছিল, সে পড়ালেখা করে কিছু একটা করবে। কিন্তু বিধাতা সেটাও হতে দিল না।”

হামলা-ভাঙচুরে মামলা-গ্রেপ্তার নেই
সুদীপ্তর বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছেন তাহিরপুর থানার এসআই নাজমুল হোসেন। সেই মামলাতেই এখান কারাগারে আছেন সেই কিশোর।
তবে বাড়ি ও মন্দিরে হামলা-ভাংচুরের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানান তাহিরপুর থানার ওসি ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, এই ঘটনায় কেউকে আটকও করা হয়নি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, “যে ছেলেটা ঘটনাটা ঘটিয়েছে, সেটা শুধু ছেলেটাই জানে। আমার বিশ্বাস, তার মা-বাবাও জানে না। এটার জন্য তার সম্প্রদায় দায়ী না। এটার জন্য তার মন্দির দায়ী না।
“আমরা সবাই চেষ্টা করব আইনকে মেনে চলার জন্য। আমরা আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নই। যারাই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাবে, তারা সবাইকে আইনের আওতায় নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যদি কেউ করে, এটার জন্য আরও কঠিন শাস্তিতে শাস্তি ভোগ করতে হবে।”
আরও পড়ুন:
সুনামগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবকের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
সুনামগঞ্জে ধর্ম অবমাননার মামলায় যুবক কারাগারে