Published : 10 Jul 2026, 12:33 AM
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরপর দুই দিনের হামলায় ১৪ জন নিহত ও আরও ৭৮ জন আহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে ইরানের ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে 'শক্তিশালী' হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং সিরিক অঞ্চলে এই এসব হামলা চালানো হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় বুধবার ভোররাতে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ৮৫টি লক্ষ্যস্থলে পাল্টা হামলা চালায় ইরান।
বৃহস্পতিবার তেহরানের রাজধানীর কয়েকটি জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর ব্যাপক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় নেটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক ‘শেষ’ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়ার পর সেদিন রাতেই ইরানে কঠোর আঘাত হানার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই কথামতোই রাতে শুরু হয় হামলা।
তবে ট্রাম্প এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মার্কিন শান্তি আলোচকদেরকে আপাতত আলোচনা চালাতে দেবেন তিনি। তার এমন দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে পুরো শান্তিপ্রক্রিয়া এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে চলেছে কিনা উঠছে সে প্রশ্ন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে মার্কিন হামলাগুলোকে ‘দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পদক্ষেপ’ নয় বলে দাবি করলেও আশঙ্কা বাড়ছে যে, দুই দেশ হামলার তীব্রতা আরও বাড়াতে পারে এবং আরও একবার পশ্চিম এশিয়ার ব্যাপক অঞ্চল এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
কেন বৃহস্পতিবারও হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নাবিকদের ওপর ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও গুঁড়িয়ে দিতে বৃহস্পতিবার ভোররাতে ইরানজুড়ে প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। গত জুনে দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এটিই ছিল সবচেয়ে জোরাল হামলা।
এর আগে বুধবার সেন্টকম জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে তারা রাতে প্রায় ৮০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। হামলার পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা মওকুফের সুবিধাও বাতিল করে, যা সমঝোতা স্মারকের অংশ ছিল।
তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক হোসেন রয়ভারান সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানান, মাইন অপসারণের কাজে নিয়োজিত ইরানি বাহিনীর এলাকায় ভুলবশত ঢুকে পড়ার কারণে হয়ত ট্যাংকারগুলোর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
দুইদিনের হামলার কারণে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছেএবং সেখানে প্রায় ৬ হাজার নাবিক আটকে পড়েছেন।
কোথায় কোথায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র?
বৃহস্পতিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস, সিরিক, কুহেস্তাক, চাবাহার, জাস্ক, আবু মুসা দ্বীপ এবং কোনারকে আঘাত হানে।
পরে ইরানের বুশেহেরেও বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানিয়েছে আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের। বুশেহেরে ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত। তাছাড়া, সিরিক শহরে মার্কিন হামলায় একটি মাছ ধরার ঘাটে ৩ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয় বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
সেন্টকম সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করলেও, ইরানি গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে বৃহস্পতিবারের হামলায় বেসামরিক অবকাঠামো এবং সম্ভবত একটি হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী ইরানশাহরের বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১ জন নিহত হয়েছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মাশহাদ যাওয়ার সড়কের দুটি সেতুতে আঘাত হানা হয়েছে, যেখানে বৃহস্পতিবার সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা।
তাছাড়া, উত্তর গোলিস্তান প্রদেশের আক তাকেহ খান রেলসেতুতেও আঘাত হানা হয়েছে। যে সেতু তেহরান থেকে তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তান হয়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান রুট এবং মার্কিন অবরোধের সময় রাশিয়ার পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হত।
ইরান পাল্টা আঘাত হানে কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে আইআরজিসি বাহরাইন, কুয়েত এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার এই তিন দেশেই একযোগে সাইরেন বেজে ওঠে।
কুয়েতের আরিফজান ও আলি আল সালেম এবং বাহরাইনের জুফায়ার ও শেখ ঈসা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানান আল-জাজিরার এক সাংবাদিক।
কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল সৌদ আবদুল আজিজ আল-ওতাইবি জানান, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি ড্রোন প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে, জর্ডানের সামরিক বাহিনীও তাদের আকাশসীমায় ৮ টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে।
শান্তি আলোচনা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য:
ট্রাম্প আপাতত শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেও ব্যক্তিগতভাবে এগুলো ‘সময়ের অপচয়’ মনে করেন বলে জানিয়েছেন।
তবে পরে বৃহস্পতিবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সুর কিছুটা নরম করে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে পুরোদমে যুদ্ধে জড়ানোর পথ খোলা থাকলেও তেহরান এখন ‘একটি চুক্তি করতে চায়’।
ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারের মতো বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং খার্গ দ্বীপের তেল উৎপাদন কেন্দ্র দখলে নেওয়ার নতুন হুমকি দিয়েছেন।
হামলার পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল ভিডিও পোস্ট করে ট্রাম্প লিখেছেন, “এটি জাহাজে হামলার প্রতিশোধ। আবার এমন হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে!”
ইরান কী বলছে?
ইরানের রাজনৈতিক নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে দফায় দফায় হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে নিন্দা করেছে এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।
ইরান ইতোমধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মুহাম্মদ বাকের কলিবাফ এক্সে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র উত্তক্ত করার কৌশল নিয়েছে। তারা এখনও শেখেনি যে, উত্তক্ত করা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাটা এখন আর মূল্য না দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। “আমি সোজা কথায় বলছি: আঘাত করলে, পাল্টা আঘাত পাবেন।”
শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ:
গত ১৬ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে চলমান সামরিক লড়াইয়ের সাময়িক অবসান ঘটে এবং ৬০ দিনের একটি শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ২১ আগস্ট।
গত বুধবার নেটো সম্মেলনে ট্রাম্পের তীব্র ইরান-বিরোধী মন্তব্য সত্ত্বেও, এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা চুক্তি বাতিল করেনি।
চুক্তির আওতায় দুই পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক লড়াই বন্ধ করতে রাজি হয়েছিল। এছাড়া অন্তত ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমঝোতা স্মারকের ভাষা অস্পষ্ট হওয়ায় এর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দাঁড় করাচ্ছে দুই পক্ষই।
উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা পুনরায় শুরু করে এবং লেবাননে ইসরায়েলি দখলদারত্ব না থামিয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান জাহাজ চলাচলের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তির হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত ৫ নং ধারাই এখন সবচেয়ে বড় বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য বৃহস্পতিবার শেষ হওয়ার পর একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে আবার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। মূলত এই দাফনের সময়কালটিকে উত্তেজনা কমানোর একটি সময় হিসেবে ধরা হয়েছিল।
পরবর্তী ধাপের ওই আলোচনায় সবচেয়ে জটিল দুটি বিষয় নিয়ে কথা হওয়ার কথা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা।
তবে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক আলম সালেহ বলেন, তেহরান ওয়াশিংটনকে মোটেও বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ, শান্তি আলোচনা চলাকালে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে তিনবার ইরানে হামলা চালিয়েছে।
সালেহ বলেন, “ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া কোনও উপায় নেই, কারণ এটি এখন তাদের টিকে থাকার লড়াই।”
তার মতে, ওয়াশিংটন এই শান্তিপ্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখতে চাইলে তাদের উচিত শুধু নিজেদের ‘একতরফা বিজেতা’ হওয়ার মানসিকতা বাদ দিয়ে এমন একটি কৌশল বেছে নেওয়া, যা দুই পক্ষের জন্যই একটি 'উইন-উইন' বা পারস্পরিক লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারবে।