Published : 10 Jul 2026, 09:42 PM
পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙতে সমুদ্রের বুকে জালের সাহায্যে সফলভাবে রকেট বুস্টার পুনরুদ্ধার করেছে চীন।
শুক্রবার সমুদ্রে তৈরি বিশেষ এক প্ল্যাটফর্মে জালের সাহায্যে ‘লং মার্চ ১০বি’ নামের রকেটের এ সফল পরীক্ষা দেশটিকে সাশ্রয়ী বাণিজ্যিক মহাকাশ অভিযান ও ২০৩০ সালের মধ্যে মানববাহী চন্দ্র অভিযানের পরিকল্পনায় অনেক দূর এগিয়ে দিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘সিসিটিভি’র প্রতিবেদন অনুসারে, ‘লং মার্চ ১০বি’ রকেটটি দক্ষিণ চীনের হাইনান বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে উৎক্ষেপিত হয়েছে।
উৎক্ষেপণের প্রায় ছয় মিনিট পর রকেটটির বুস্টার ও উপরের অংশটি আলাদা হয়ে যায়। এরপর বুস্টারটি উল্লম্বভাবে নেমে এসে সমুদ্রের ওপর থাকা এক অফশোর প্ল্যাটফর্মে সফলভাবে অবতরণ করলে সেটিকে উদ্ধার করা হয়।
অরবিটাল-ক্লাসের বা কক্ষপথ স্তরের কোনো রকেট সফলভাবে পুনরুদ্ধার করার ক্ষেত্রে এটাই চীনের প্রথম ঘটনা। এ পরীক্ষার সাফল্য চীনকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরির আরও কাছাকাছি নিয়ে গেল।
সফলভাবে ফিরে আসার আগে রকেটটি একটি স্যাটেলাইটকে এর নির্ধারিত কক্ষপথে পাঠাতে পেরেছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
এ সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই চীনের অ্যারোস্পেস বা মহাকাশ প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম হু হু করে বাড়তে দেখা গেছে। যার মধ্যে ‘চীন স্পেসস্যাট’ ও ‘চীন স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস’-এর মতো কোম্পানির শেয়ারের দাম দৈনিক সর্বোচ্চ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছে।
চীনের এ ‘লং মার্চ ১০বি’ রকেটটিকে মার্কিন কোম্পানি স্পেসএক্স-এর বহুল ব্যবহৃত মাঝারি পাল্লার ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটের সমান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ রকেটটি চীনের রকেট নির্মাতা প্রধান রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ‘চীন একাডেমি অফ লঞ্চ ভেহিকল টেকনোলজি’ বা ক্যাল্ট বাণিজ্যিক মহাকাশ অভিযানের জন্য তৈরি করেছে, যা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অন্তত ১৬ মেট্রিক টন ওজনের পেলোড বা মালামাল বহন করতে পারে।
তবে স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন ৯’-এর সঙ্গে রকেটের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। ফ্যালকন ৯ রকেটটি স্বয়ংক্রিয় ল্যান্ডিং লেগ বা পায়ের ওপর ভর করে মাটিতে বা ড্রোন শিপে অবতরণ করে।
অন্যদিকে, ‘লং মার্চ ১০বি’ রকেটের অবতরণের জন্য কোনো ল্যান্ডিং লেগ নেই। এর পরিবর্তে সমুদ্রের প্ল্যাটফর্মে থাকা জালের সঙ্গে নিজেকে আটকে নেওয়ার জন্য চারটি ‘ল্যান্ডিং হুক’ বা বিশেষ হুক ব্যবহার করেছে রকেটটি।
এ বিষয়ে রকেটটির নির্মাতা কোম্পানি ক্যাল্ট-এর বিশেষজ্ঞ চ্যান মুইয়ে বলেছেন, “জালের সাহায্যে রকেট উদ্ধারের এ প্রযুক্তি রকেটের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে সহজ করে তোলে, এর ওজন কমায় ও মালামাল বহনের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
“এ ছাড়া, অবতরণের সময় দিক কিছুটা পরিবর্তন হলেও পদ্ধতিটি বেশ কার্যকর। কারণ জালের সমন্বিত ব্যবস্থাটি রকেটটিকে সহজে আটকে ফেলার পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে।”
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় স্পেসএক্স ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো একটি অরবিটাল ফ্লাইট থেকে ফ্যালকন ৯ রকেট সফলভাবে মাটিতে ফিরিয়ে এনেছিল। এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্লু অরিজিন তাদের ‘নিউ গ্লেন’ রকেট ফিরিয়ে আনে।
বর্তমানে স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেট বছরে প্রায় ১৫০ বার মহাকাশে পাড়ি জমায়, যা সপ্তাহে গড়ে প্রায় তিনবার। প্রয়োজন অনুসারে এর বুস্টারটি ডজনখানেক বার পুনরায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাধারণত রকেটের ইঞ্জিনওয়ালা বুস্টার অংশটিই এর সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হিসেবে বিবেচিত।
চীন গত প্রায় এক দশক ধরে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। শুরুর দিকে স্বল্প-উচ্চতার হোভার টেস্ট বা ওড়ার পরীক্ষা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্ষপথ স্তরের বুস্টার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা সবখানেই নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে দেশটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেটের এ সফল প্রযুক্তি চীনের দ্রুত বর্ধনশীল বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক বা কনস্টেলেশনের উৎক্ষেপণ খরচ অনেক কমিয়ে আনবে।
বিশ্বজুড়ে এ প্রযুক্তি দখলের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে চীনের বিভিন্ন কোম্পানিও নিজেদের পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট পরীক্ষার তৎপরতা বাড়িয়েছে। আর এসব কোম্পানিকে তহবিল বা অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করতে চীন সরকার পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রস্তুতকারকদের জন্য আইপিও বা শেয়ার বাজারে যাওয়ার নিয়মকানুন আরও সহজ করেছে।
এর আগে, গেল বছর চীনের ‘ল্যান্ডস্পেস’ ও রাষ্ট্রায়ত্ত ‘চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কর্পোরেশন’ নামের দুটি কোম্পানি প্রচেষ্টা চালালেও অবতরণ ও বুস্টার পুনরুদ্ধারের মতো চূড়ান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপে এসে তারা ব্যর্থ হয়েছিল।
২০৩০ সালের মধ্যে চীনের মানববাহী চন্দ্র অভিযানের জন্য ‘লং মার্চ ১০’ সিরিজের যেসব রকেট তৈরি হচ্ছে, ‘লং মার্চ ১০বি’ তারই অংশ। ফলে রকেটের পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তি চীনের বৃহত্তর চাঁদ অভিযানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি বলেছে, এ বছরের শেষদিকেই আরেকটি উৎক্ষেপণের জন্য ‘লং মার্চ ১০বি’র এই উদ্ধারকৃত বুস্টারটি পুনরায় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে চীনের।