Published : 10 Jul 2026, 10:31 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশি-বিদেশি প্রজাতির ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২১৩টি ভেঙে পড়া, উপড়ে পড়া ও রোগাক্রান্ত হওয়াসহ নানা ঝুঁকিতে রয়েছে। বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বিদেশি জাতের গাছগুলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টারের উদ্যোগে পরিচালিত বৃক্ষ শুমারিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। অচিরেই একটি বিদেশি সাময়িকীতে শুমারির ফল প্রকাশ করা হতে পারে জানিয়েছেন আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক জসীম উদ্দিন।
শুমারির ফলে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬২ গোত্রের ২৭৭ প্রজাতির মোট ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ শনাক্ত করা হয়েছে। এসব প্রজাতির ৫৮ শতাংশ দেশি এবং ৪২ শতাংশ বিদেশি।

ক্যাম্পাসে সর্বোচ্চ পরিমানে থাকা ১৫টি গাছের মধ্যে বিদেশি প্রজাতির পাঁচটি, যার মধ্যে রয়েছে মেহগনি (১ম), দেবদারু (৪র্থ), ম্যাকারথুরি পাম (৮ম), রেইনট্রি (১১তম) ও সেগুন (১৩তম)।
এছাড়া ক্যাম্পাসের গাছগুলোর মোট ভূ-উপরিভাগীয় জীবভর (নির্দিষ্ট সময়ে ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী সমস্ত জীবিত উদ্ভিদ ও প্রাণীর মোট ভর) ৯ হাজার ৯০০ টন, ভূ-নিম্নীয় জীবভর (কোনো উদ্ভিদ বা বাস্তুতন্ত্রের মাটির নিচের অংশের মোট জীবন্ত জৈব বস্তুর ভর) ২ হাজার ৩৭০ টন এবং মোট কার্বন মজুদ আছে ৪ হাজার ৬৫০ টন।
শুমারির তথ্যে বলা হয়, উপযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফল উৎপাদনকারী গাছ আছে ২৫ শতাংশ। বন্যপ্রাণীদের জন্য সহায়ক গাছ আছে ২২ শতাংশ। এর বাইরে ঔষধি ২১ শতাংশ, কাঠ উৎপাদনকারী ২০ শতাংশ এবং শোভাবর্ধনকারী ১২ শতাংশ গাছ রয়েছে।
ক্যাম্পাসে থাকা ২২১৩টি বৃক্ষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণ হিসেবে শুমারিতে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৫২টি গাছের মুকুট (ক্রাউন) ভবন, দেয়াল বা অন্যান্য স্থাপনার সংস্পর্শে রয়েছে, যা অবকাঠামো ও জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ৭২২টি গাছ বিদ্যুতের তারের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ায়।
জরিপে ৪০২টি গাছ ভারসাম্যহীন অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভেঙে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। ১৯টি গাছের শিকড় সড়কের ক্ষতি করছে এবং ১৮টি গাছ সড়কের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করছে।
শুমারির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ প্যারামিটার বা বৈশিষ্টে দেখা গেছে মোট ১ হাজার ৮১১টি বৃক্ষ নানারকম বিপর্যয়ের শিকার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৬৯টি গাছের শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি সড়ক বা দেয়ালের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫১৪টি গাছে পরগাছা শনাক্ত করা হয়েছে।

আবার ১৫৯টি গাছে পোস্টার, ব্যানারসহ বিভিন্ন কারণে পেরেক লাগানো হয়েছে, যা গাছের জন্য ক্ষতিকর। ১২৫টি গাছের বাকল ক্ষতিগ্রস্ত, ১১৩টি গাছের ডাল ভাঙা, যা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া ৯৯টি গাছের কাণ্ড দুর্বল, ৯৪টি মরা গাছ এবং ৪৩টি গাছের ডাল ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।
৭৭টি গাছ রোগ বা রোগজীবাণুতে আক্রান্ত, ১৩টি গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৫টি গাছের পাতার রং পরিবর্তিত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে শুমারিতে।
আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেছেন, ক্যাম্পাসে মল চত্বর, ফুলার রোড ও প্রক্টর অফিসের সামনে আমতলা সংলগ্ন এলাকায় ভেঙে পড়া ও উপড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা গাছের সংখ্যা বেশি।
এছাড়া নীলক্ষেত সংলগ্ন তোরণ গেইটের পাশে দুই ধারের দেবদারু গাছ, ভিসি চত্বরের কেন্দ্রে থাকা রেইনট্রি গাছের নানা ডাল, টিএসসি এলাকায় বুদ্ধনারিকেল গাছ, মোকাররম ভবনের গেইটের পাশে (ফার্মেসি গার্ডেনের ভেতরে) আকাশনিম গাছ, কার্জনহল গেইটের পাশে (ইইই ডিপার্টমেন্টের সামনে) থাকা ইউক্যালিপটাস গাছ এবং কার্জনহল ভবনের বিপরীতে থাকা ক্রিসমাস ট্রিগুলোও উপড়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।
অন্যান্য এলাকার মধ্যে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভেতরে কিছু অংশের গাছ, ফুলার রোডে উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনের কিছু বৃক্ষ ও মল চত্বরের পূর্ব দিকের রাস্তা বরাবর বিদেশি গাছগুলো ভেঙে পড়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন অধ্যাপক জসীম উদ্দিন। এসব বিদেশি গাছের মধ্যে রেইনট্রির সংখ্যা বেশি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, “যে গাছগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, সেখান থেকে উত্তরণের উপায় বেশ কঠিন। কেননা অধিকাংশ গাছ মূলত অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে।
“এ ক্ষেত্রে গাছগুলো রক্ষা করতে হলে সব কংক্রিট তুলে ফেলতে হবে। কারণ অধিকাংশ গাছ মারা যায় তার খাদ্য গ্রহণের যে কাণ্ড থাকে, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে। এ ক্ষেত্রে আমাদের এখন কংক্রিট তুলে ফেলার মত সামর্থ্য নেই। এখন আমরা শুধু একটা কাজই করতে পারি, ঝুকিপূর্ণ গাছগুলো সরিয়ে সেখানে অন্য একটি গাছ প্রতিস্থাপন করা। এটার মধ্য দিয়ে আমরা সেই গাছগুলোর শূন্যতা পূরণ করতে পারব।”
একই বিষয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব গাছ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আরবরিকালচার সেন্টার চিহ্নিত করেছে, সেগুলোকে আর বাঁচান সম্ভব না। আমরা এখন সেগুলোকে সরিয়ে সেখানে নতুন গাছ কীভাবে প্রতিস্থাপন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করব।
“আমরা আরবরিকালচার সেন্টারকে বলেছি, তাদের চিহ্নিত গাছের ম্যাপ আমাদের কাছে দিতে। আমরা সে অনুযায়ী গাছগুলোকে যদি সংরক্ষণ করা যায় করব। যদি সম্ভব না হয়, সেখানে অন্য গাছ প্রতিস্থাপন করা হবে। আমাদের শুধু গাছের কথা ভাবলে তো হবে না, শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।”