Published : 10 Jul 2026, 01:22 PM
ভাড়া দেওয়া বাড়িতে আগুন বা ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র স্মোক ডিটেক্টর না বসিয়ে উল্টো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি জমা দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এক প্রতারক বাড়িওয়ালা।
জালিয়াতিকে ‘কৌতুক’ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি; অবহেলা ও জালিয়াতির দায়ে আদালত ওই প্রবাসীকে মোটা অংকের জরিমানা করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়াই অননুমোদিতভাবে একটি বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর সেখানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বেশ কিছু ঘাটতি থাকায় মিনডগাস পালাইমা নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে স্থানীয় কাউন্সিল।
তদন্তের অংশ হিসেবে কর্মকর্তারা বাড়িটি পরিদর্শনের সময় সেখানে কোনো স্মোক অ্যালার্মেরই অস্তিত্ব পাননি। ওই সময় কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, কাউন্সিলকে বোকা বানাতে পালাইমা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ও নকল ছবি জমা দিয়েছিলেন।
ব্র্যাডফোর্ড ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানির সময় বলা হয়, ৪৪ বছর বয়সী পালাইমা দুটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে ভবনের মূল মালিকদের কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই সেগুলোকে বহু লোকের থাকার উপযোগী মেস বা শেয়ার্ড হাউজে রূপান্তর করেছিলেন।
লাইসেন্স ছাড়া মেস পরিচালনা করা ও যথাযথ স্থানে স্মোক অ্যালার্ম বসাতে ব্যর্থ হওয়াসহ বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগে পালাইমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। একইসঙ্গে তাকে ১১ হাজার ২১৮ পাউন্ড জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৭ লাখ টাকার বেশি।
তবে শুক্রবারের এ শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন না লিডসের ওর্টলি এলাকার সিলভার রয়ড টেরেসের বাসিন্দা পালাইমা।
আদালতের বরাত দিয়ে ‘লোকাল ডেমোক্রেসি রিপোর্টিং সার্ভিস’ বলেছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা সব কটি অপরাধই ২০২৫ সালের কয়েক সপ্তাহের নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ১৮ ফেয়ারফ্যাক্স অ্যাভিনিউ ও ৯ নরউড স্ট্রিটের দুটি বাড়ির বিষয়ে পালাইমার বিরুদ্ধে মোট ১০টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
তিনি নিজে ওই দুটি ভবনের কোনোটিরই মালিক ছিলেন না, বরং একজন ভাড়াটিয়া হয়েও বেআইনিভাবে সেগুলোকে শেয়ার্ড হাউজে রূপান্তর করে ব্যবসা করেছিলেন।
এ ছাড়া ‘ইনস্টাইল এভিয়েশন’ নামে এই কোম্পানির আবাসন ব্যবসা পরিচালনার আগে তিনি ব্র্যাডফোর্ড কাউন্সিলের কাছ থেকে কোনো প্রকার লাইসেন্সের জন্য আবেদনও করেননি।
এআই নিয়ে ‘কৌতুক’
অননুমোদিত মেস বা শেয়ার্ড হাউজে আগুন বা ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র ‘স্মোক ডিটেক্টর’ না বসিয়ে, উল্টো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি জমা দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টাকে ‘মজা’ বা ‘কৌতুক’ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।
ব্র্যাডফোর্ড কাউন্সিলের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ইমরান হুসাইন আদালতে বলেছেন, গত বছরের মে মাসে কাউন্সিলের কাছে আসা এক অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৮ ফেয়ারফ্যাক্স অ্যাভিনিউয়ের একটি বাড়ি অননুমোদিতভাবে পাঁচ শয্যার একটি মেস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
“ভবনের মূল মালিক বাড়িটি আসামিকে (মিনডগাস পালাইমা) এই শর্তে লিজ দিয়েছিলেন যে, তিনি সেখানে তার পরিবার নিয়ে বসবাস করবেন। তবে আসামি মূল মালিককে না জানিয়েই এসব ঘর অন্যান্য ব্যক্তিদের কাছে সাবলেট দিয়েছেন।”
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বলা হয়েছে, ওই বাড়ির বাসিন্দারা কেউ কারও আত্মীয় নন।
আইনজীবী ইমরান হুসাইন বলেছেন, “বাড়িটি লাইসেন্সওয়ালা মেসের আওতায় পড়লেও এ বাড়ির নামে কোনো লাইসেন্স নেওয়ার রেকর্ড কাউন্সিলের কাছে নেই।”
বাড়ির বাসিন্দারা তাদের ভাড়া পরিশোধ করতেন ‘ইনস্টাইল এভিয়েশন’ নামের এক কোম্পানির কাছে, যার একমাত্র পরিচালক ছিলেন পালাইমা। সরকারি নিবন্ধন খাতা ‘কোম্পানিজ হাউস’ এর তথ্য অনুসারে, কোম্পানিটি টেক-অ্যাওয়ে খাবারের দোকান ও আবাসিক সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ব্যবসার সঙ্গে যোগ ছিল।
অভিযোগ পাওয়ার পরপরই কাউন্সিল কর্মকর্তারা বাড়িটি পরিদর্শন করেছেন। সেখানে গিয়ে তারা দেখেছেন, বেশ কিছু রুমে জরুরি মুহূর্তে আগুন থেকে বাঁচার জন্য কোনো জানালা বা ফায়ার এস্কেপ উইন্ডো, ফায়ার ডোর বা আগুন ও ধোঁয়া শনাক্তকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই।
আইনজীবী হুসাইন বলেছেন, “এমনটা যে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এ চরম ঝুঁকির কারণে তাকে অবিলম্বে স্মোক অ্যালার্ম বসানোর জন্য জরুরি নোটিশ পাঠানো হয়।”
আসামি সেদিনই কাজটি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পালাইমা কর্তব্যরত কর্মকর্তাকে উপহাস করে বলেছিলেন, “তিনি চাইলে অফিসারকে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি পাঠিয়ে দিতে পারেন।”
তখন কর্মকর্তা পালাইমাকে সতর্ক করে বলেছেন, বিষয়টিকে রসিকতা হিসেবে না নিয়ে গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
তবে পালাইমা সেই সতর্কবার্তা গায়ে মাখেননি। পরবর্তীতে তিনি একটি ছবি পাঠান, যেখানে আগে কোনো স্মোক ডিটেক্টর না থাকলেও ছবিতে একটি সিলিংয়ে সেটি দেখা যাচ্ছিল। কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয় যে ছবিটি এআই দিয়ে বানানো।
গেল বছরের ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টায় তিনি ওই ছবি পাঠান। এর ঠিক পরদিন সকাল সাড়ে ১১টায় কর্মকর্তারা যখন আবার বাড়িটি পরিদর্শনে যান তখন সিলিংয়ে কোনো স্মোক ডিটেক্টরের অস্তিত্ব খুঁজে পাননি।
এতে কর্মকর্তাদের সন্দেহই সত্যি হয়, ছবিটি এআই দিয়ে কারসাজি করা হয়েছিল। আগুনের চরম ঝুঁকির কারণে পরবর্তীতে বাড়িটির ওপর জরুরি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
কোম্পানি বিলুপ্ত
সম্পত্তির মালিকানার বিষয়ে হুসাইন আদালতে বলেছেন, “আগের মালিক এ বিশ্বাসে বাড়িটি আসামিকে দিয়েছিলেন যে, তিনি পরিবার নিয়ে থাকবেন। বর্তমান মালিক এক বছর আগে সম্পত্তিটি কিনেছেন ও তখন থেকেই আসামির সঙ্গে তার নানা ঝামেলা চলছিল। স্মোক অ্যালার্মের এআই ছবি জমা দিয়ে আসামি মানুষের জীবন সুরক্ষার আইনকে চরম অবজ্ঞা করেছেন।”
মামলার অন্যান্য অভিযোগ ছিল ৯ নরউড স্ট্রিটের আরেকটি বাড়ির বিষয়ে। সেটিও লাইসেন্স ছাড়াই মেসে রূপান্তর করা হয়েছিল। গেল সেপ্টেম্বরে ওই বাড়িটি পরিদর্শনের সময়ও কোনো স্মোক অ্যালার্ম না থাকাসহ বেশ কিছু নিরাপত্তা ঘাটতি দেখা যায়।
এ বাড়িটিও পালাইমা লিজ নিয়ে মালিকের অজান্তেই অন্যদের কাছে ভাড়া দিয়েছিলেন। কয়েক দিন পর সেখানে পুনরায় পরিদর্শনে গিয়ে আরও ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায়।
আইনজীবী হুসাইন বলেছেন, “ত্রুটি সংশোধনের জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও আসামি তা মেনে চলেছেন এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।”
সব কিছু পর্যালোচনার পর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আসামির অনুপস্থিতিতেই পালাইমাকে দোষী সাব্যস্ত করে। প্রতিটি বাড়ির জন্য ২ হাজার ৬৪০ পাউন্ড করে জরিমানা, ব্র্যাডফোর্ড কাউন্সিলকে ৩ হাজার ৯৩৮ পাউন্ড মামলার খরচ ও আরও ২ হাজার পাউন্ড কোর্ট সারচার্জ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সব মিলিয়ে তাকে মোট ১১ হাজার ২১৮ পাউন্ড পরিশোধ করতে হবে।
আদালতকে আরও বলা হয়েছে, তার কোম্পানি ‘ইনস্টাইল এভিয়েশন’ গত ২০২৫ সালের জুনেই বিলুপ্ত হয়েছে।