Published : 20 Jan 2026, 11:52 AM
মহাকাশের অতি পরিচিত এক নীহারিকা নিয়ে গবেষণায় এবার বিস্ময়কর মোড় এসেছে। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের নখদর্পণে থাকা এ নীহারিকায় হঠাৎ করেই এক বিশাল ও রহস্যময় ‘আয়রন বার’ বা লোহার দণ্ডের সন্ধান মিলেছে।
আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কাছেই অবস্থিত চমৎকার এক মহাজাগতিক কাঠামো ‘রিং নেবুলা’, যা ১৭৭৯ সালে প্রথম খুঁজে পান ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী শার্ল মেসিয়ে। তখন থেকেই এ নিয়ে অনেক গবেষণা চলছে। তবে আজও এ নীহারিকাটি রহস্যই রয়ে গেছে, যার সবটুকু এখনও বিজ্ঞানীদের জানা নেই।
এ নীহারিকার মাঝে লোহা বা আয়রন পরমাণুর বিশাল এক মেঘ দেখতে পেয়েছেন গবেষকরা, যা দণ্ড বা বারের মতো আকৃতি নিয়ে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে আছে। নীহারিকা মূলত মৃতপ্রায় তারা থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাস ও ধূলিকণার এক উজ্জ্বল আবরণ। বিশাল এ লোহার মেঘ আসলে কীভাবে তৈরি হল বিজ্ঞানীরা এখন সেই রহস্যেরই উত্তর খুঁজছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেখানে থাকা লোহার বিভিন্ন পরমাণুর মোট ভর আমাদের পৃথিবীর গলিত কেন্দ্রের সমান হতে পারে। তারাটি যখন এর বাইরের বিভিন্ন স্তর মহাকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছিল তখন হয়ত কোনো পাথুরে গ্রহ বাষ্পীভূত হয়ে যায়। আর এসব লোহা সেই গ্রহেরই অবশিষ্টাংশ।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, এমনটি আপাতত তাদের অনুমান। কোটি কোটি বছর পর আমাদের সূর্য যখন একইভাবে মৃত্যুমুখে পড়বে তখন আমাদের সৌরজগতের ভেতরে থাকা পাথুরে বিভিন্ন গ্রহ, আমাদের পৃথিবীরও হয়ত এ পরিণতি হতে পারে।
স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের লা পালমায় অবস্থিত ‘উইলিয়াম হার্শেল টেলিস্কোপ’-এর মাধ্যমে এ পর্যবেক্ষণটি চালিয়েছেন গবেষকরা। এজন্য ‘ডব্লিউএইচটি এনহ্যান্সড এরিয়া ভেলোসিটি এক্সপ্লোরার’ নামের নতুন যন্ত্র ব্যবহার করেছেন তারা।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘মান্থলি নোটিসেস অফ দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’তে।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের ‘কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি’ ও ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী রজার ওয়েসন বলেছেন, “কয়েক দশক ধরে অনেক গবেষণার পর খুব পরিচিত মনে হওয়া এক বস্তুও যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে চমক দিতে পারে তা সত্যিই রোমাঞ্চকর।
“পেশাদার ও শৌখিন উভয় ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্যই পর্যবেক্ষণের চিরাচরিত বস্তু এ নীহারিকা। খালি চোখে নীহারিকাটি দেখার মতো যথেষ্ট উজ্জ্বল না হলেও বাইনোকুলার দিয়ে খুব সহজেই একে খুঁজে পাওয়া যায়। আর ছোট টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলে এর আংটির মতো আকৃতিটি স্পষ্ট বোঝা যায়।”
‘রিং নেবুলা’কে ‘মেসিয়ে ৫৭’ নামেও ডাকা হয়। পৃথিবী থেকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ আলোকবর্ষ দূরে ‘লাইরা’ তারাপুঞ্জে অবস্থিত এ নীহারিকা। এক আলোকবর্ষ বা এক বছরে আলো প্রায় সাড়ে নয় ট্রিলিয়ন কিলোমিটার অতিক্রম করে। নীহারিকাটি প্রায় চার হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল, যা মহাজাগতিক সময়ের হিসেবে খুবই সাম্প্রতিক ঘটনা।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের একদম নতুন শিক্ষার্থীদের কাছেও খুবই পরিচিত বস্তু এ নীহারিকা। এ গবেষণার সহ-লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যানেট ড্রু বলেছেন, “আপনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের অনেক পাঠ্যবইতেই এ নীহারিকার উল্লেখ পাবেন।”
ঠিক এ কারণে নীহারিকার মধ্যে লোহার তৈরি সেই বিশাল দণ্ডটি বিজ্ঞানীদের কাছে এত বেশি কৌতূহল জাগানিয়া হয়ে উঠেছে?
জ্যানেট ড্রু বলেছেন, “আমাদের খুঁজে পাওয়া অন্য কোনো রাসায়নিক উপাদান এই বিশেষ দণ্ড বা বারের মতো কাঠামোতে দেখা যাচ্ছে না। সত্যি বলতে বিষয়টি বেশ অদ্ভুত। এর গুরুত্ব ঠিক এখানেই যে, আমাদের কাছে এখনও এর কোনো তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা নেই।
“এ লোহার উৎস হয়ত কোনো গ্রহের বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে। তবে এমনও হতে পারে, কোনো গ্রহ ছাড়াই এ কাঠামোটি তৈরি হওয়ার অন্য কোনো কারণ রয়েছে।”
গবেষক ওয়েসন বলেছেন, “পৃথিবীর মতো একটি গ্রহে যে পরিমাণ লোহা থাকে তা এই দণ্ড বা বারটি তৈরির জন্য যথেষ্ট। তবে এসব লোহা কীভাবে ঠিক এমন দণ্ড আকৃতির হল সেটির কোনো সঠিক ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত নেই।”
নীহারিকাটি তৈরি হয়েছিল সূর্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভরের এক তারার জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে তারাটি ফুলে-ফেঁপে ‘রেড জায়ান্ট’ বা লাল দানব তারায় পরিণত হয় এবং এর বাইরের বিভিন্ন স্তর মহাকাশে ছিটকে দেয়। অবশেষ হিসেবে তারাটি ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ বা শ্বেত বামন তারায় পরিণত হয়, যা আকারে প্রায় আমাদের পৃথিবীর সমান।
গবেষক ওয়েসন বলেছেন, “পৃথিবী থেকে দেখলে একে আংটির মতো মনে হয়, তবে নীহারিকাটি আসলে সিলিন্ডার আকৃতির একটি বস্তু, যা আমরা এক প্রান্ত থেকে দেখছি। এর বেশিরভাগই হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসে তৈরি। সামান্য পরিমাণে ভারী উপাদানও এতে রয়েছে।”
আমাদের ছায়াপথে এ ধরনের প্রায় তিন হাজারটি নীহারিকার সন্ধান মিলেছে। এগুলো নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তারাদের জীবনের সেই পর্যায়টি পরীক্ষা করতে পারেন যে সময় এদের ভেতরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এসব উপাদানই পরবর্তীতে আবার নতুন তারা ও গ্রহ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ওয়েসন বলেছেন, “আমরা এ আবিষ্কারটি নিয়ে আরও তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি, যাতে এ নতুন রহস্যের জট খোলা এবং এ লোহার দণ্ডটি আসলে কোথা থেকে এসেছে তা খুঁজে বের করা যায়।”