Published : 13 Mar 2026, 01:18 PM
বিশালাকার তারার মৃত্যু মানেই মহাকাশে এক মহাপ্রলয়, যাকে বলে সুপারনোভা। তবে কিছু সুপারনোভা সাধারণের চেয়ে শতগুণ বেশি উজ্জ্বল হয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘকাল ধরে রহস্যে রেখেছিল। সাম্প্রতিত এক গবেষণায় সেই রহস্যের জট খুলেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
রয়টার্স লিখেছে, সুপারনোভা বিশালাকার তারার জীবনের শেষ মুহূর্তের এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ এবং মহাকাশের অন্যতম উজ্জ্বল ঘটনা, যা সূর্যের চেয়ে প্রায় একশ কোটি গুণ বেশি উজ্জ্বল। তবে এর মধ্যেও কিছু বিরল বিস্ফোরণ আছে যেগুলো আরও ১০ থেকে ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এদেরকে বলে ‘সুপারলুমিনাস সুপারনোভা’।
মহাকাশ বিজ্ঞানে এ বিষয়টি এতদিন রহস্যেই মোড়া ছিল। তবে পৃথিবী থেকে প্রায় ১০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ছায়াপথের এক বিশালাকার তারার ‘সুপারলুমিনাস সুপারনোভা’ এখন বিজ্ঞানীদের এই রহস্য সমাধানে সাহায্য করছে। আলো
এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলে, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম শনাক্ত হওয়া এ সুপারনোভাটি ক্যালিফোর্নিয়ার ‘লাস কামব্রেস অবজারভেটরি’ ও চিলির ‘অ্যাটলাস সার্ভে টেলিস্কোপ’ ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষকরা বলছেন, এ সুপারনোভাটি এত বেশি উজ্জ্বল হওয়ার কারণ, এর ভেতরে থাকা ‘ম্যাগনেটার’। তারাটি বিস্ফোরিত হলে এর অবশিষ্টাংশ হিসেবে ঘন ও দ্রুত ঘূর্ণনশীল একটি কেন্দ্র বা কোর তৈরি হয়, যার চৌম্বক ক্ষেত্র বিস্ময়কর রকমের শক্তিশালী।
ম্যাগনেটারটি প্রতি সেকেন্ডে শত শত বার ঘোরে। ঘোরার সময় তা চার্জিত বিভিন্ন কণাকে টেনে নেয় এবং প্রবল শক্তিতে সেগুলোকে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়া ধুলা ও গ্যাসের মেঘের দিকে ছুঁড়ে মারে। এ প্রক্রিয়াই বিস্ফোরণের উজ্জ্বলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ম্যাগনেটার হচ্ছে এক ধরনের ‘নিউট্রন স্টার’। বিশালাকার তারার মুত্যুর সময় এর সংকুচিত হয়ে যাওয়া কেন্দ্রটিই হচ্ছে নিউট্রন তারা।
এ গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ও ‘লাস কামব্রেস অবজারভেটরি’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া’র ডক্টোরাল শিক্ষার্থী জোসেফ ফারা বলেছেন, “বড় আকারের তারার যখন সব পারমাণবিক জ্বালানি শেষ হয়ে যায় তখন তা আর নিজের ওপর মহাকর্ষ বলের প্রচণ্ড চাপ সামলে রাখতে পারে না এবং সংকুচিত হয়ে বিস্ফোরিত হয়।”
গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’ সাময়িকীতে।
গবেষক ফারা বলেছেন, “তারার কেন্দ্রটি যখন এর ওপরের স্তরের প্রচণ্ড চাপে সংকুচিত হয় তখন তা এতই শক্তিশালী হয় যে পরমাণুর ভেতর থাকা প্রোটন ও ইলেকট্রন মিলে গিয়ে নিউট্রন তৈরি করে।
“কেন্দ্রের ভর অনেক বেশি হলে তা সরাসরি ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। তবে পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সেই সদ্যজাত নিউট্রন তারাটি টিকে যায় ও একটি ম্যাগনেটার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।”
এভাবেই একটি ম্যাগনেটার সুপারনোভার কেন্দ্রের ভেতরে লুকিয়ে থেকে এর প্রচণ্ড উজ্জ্বলতা ধরে রাখে।
২০০৬ সালে প্রথম ‘সুপারলুমিনাস সুপারনোভা’ শনাক্ত করেছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যান্ডি হাওয়েল। এ নতুন গবেষণার একজন সহ লেখকও তিনি।
২০১০ সালে প্রথম এই ধারণা বা হাইপোথিসিস দেওয়া হয়েছিল যে, ম্যাগনেটারই হতে পারে এই অতি উজ্জ্বল বিভিন্ন সুপারনোভার শক্তির উৎস। এখন হাওয়েল বলেছেন, নতুন এসব তথ্য সেই ধারণাকেই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে।
সাধারণ কিছু সুপারনোভার উজ্জ্বলতা একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বাড়ে ও পরে কমে যায়। তবে কিছু ‘সুপারলুমিনাস সুপারনোভা’ কয়েক মাস ধরে বারবার উজ্জ্বল হয় আবার স্তিমিত হয়ে পড়ে। ঠিক এ সুপারনোভাটির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উজ্জ্বলতার এ হ্রাস-বৃদ্ধির স্থায়িত্ব কমেছে।
এর পেছনে ‘লেন্স থিরিং প্রিসিশন’ নামের এক বিশেষ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন গবেষকরা। এ ঘটনায় তীব্র বেগে ঘুরতে থাকা ম্যাগনেটারটি মহাকাশের সময় ও স্থানের কাঠামোকে পেঁচিয়ে ফেলে। বিস্ফোরণের পর ম্যাগনেটারের শক্তিশালী মহাকর্ষ বল তারাটির কিছু অংশকে নিজের কাছে টেনে নেয় এবং চারদিকে একটি ঘূর্ণায়মান চাকতি বা ‘ডিস্ক’ তৈরি করে। এ লেন্স থিরিং প্রিসিশনের কারণেই সেই ডিস্কটি বারবার কাঁপতে বা দুলতে থাকে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী হাওয়েল বলেছেন, “এর ফলে ম্যাগনেটার থেকে সুপারনোভায় শক্তির প্রবাহ কম-বেশি হতে থাকে, যা এ বিস্ফোরণের উজ্জ্বলতাকে বারবার পরিবর্তন করে।”
তবে এ বড় তারাটি ধ্বংস হওয়ার ঠিক আগে আকারে ঠিক কতটা বড় ছিল তা গবেষকরা এখনও সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি।
গবেষক জোসেফ ফারা বলেছেন, “বিস্ফোরিত হওয়া তারাটি সম্পর্কে আমরা খুব বেশি কিছু জানি না। তবে এটি সম্ভবত অনেক বড় আকারের তারা, যা আমাদের সূর্যের চেয়ে কয়েক ডজন গুণ বেশি ভারী ও কয়েক লাখ গুণ বেশি উজ্জ্বল।”
সুপারনোভার উজ্জ্বলতা কল্পনা করাও কঠিন। এ বিষয়ে মজার একটি উদাহরণ দিয়ে ফারা বলেছেন, “একটি প্রশ্ন প্রায়ই করা হয় যে, যদি পৃথিবী থেকে ৯ কোটি ৩০ লাখ মাইল (সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব) দূরে সূর্য একটি সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হয় তবে তা বেশি উজ্জ্বল হবে, নাকি আপনার চোখের মণির ওপর একটি হাইড্রোজেন বোমা ফাটানো হলে তা বেশি উজ্জ্বল হবে? উত্তর হচ্ছে, সুপারনোভাটিই হবে কয়েকশ কোটি গুণ উজ্জ্বল।
“এমনটি সাধারণ এক সুপারনোভার কথা। আর সুপারলুমিনাস সুপারনোভার এর চেয়েও ১০ থেকে ১০০ গুণ বা তারও বেশি উজ্জ্বল হতে পারে। এ সুপারনোভাটির একার উজ্জ্বলতা আমাদের পুরো মিল্কি ওয়ে ছায়াপথের সব তারার সম্মিলিত উজ্জ্বলতার চেয়েও বেশি।”