Published : 29 Jun 2026, 02:28 PM
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তির বাজারে ইলন মাস্কের স্টারলিংক দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে। কোম্পানিটির একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন মেগা প্রকল্প নিয়ে মাঠে নেমেছে চীন।
২০৩০ সালের মধ্যে কক্ষপথে ১০ হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইট বসানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা ‘স্পেসসেল’ নামের চীনা কোম্পানিটি রাজনৈতিক ও নীতিগত কারণে স্টারলিংক যেখানে সুবিধা করতে পারছে না সেসব দেশের বাজারকে টার্গেট করে মাস্কের সাম্রাজ্যে বড়সড় ধাক্কা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্টারলিংকের ১০ হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে, যার বিপরীতে চীনা কোম্পানিটির স্যাটেলাইটের সংখ্যা কেবল কয়েক’শ।
স্পেসসেল বলেছে, তাদের প্রথম বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্যাটেলাইট এরইমধ্যে কক্ষপথে রয়েছে এবং তারা দ্রুতগতিতে এর পরিধি বাড়াচ্ছে।
বিশ্বের ডজনখানেক দেশের সঙ্গে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার বিষয়ে তাদের আলোচনাও চলছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
হংকংভিত্তিক কোম্পানি ‘অরবিটাল গেটওয়ে কনসাল্টিং’-এর প্রতিষ্ঠাতা ব্লেইন কার্সিও বলেছেন, স্পেসসেল এমন সব দেশ ও অঞ্চলকে ‘টার্গেট’ করছে, যেখানে স্টারলিংককে বিভিন্ন রাজনৈতিক বা নীতিগত জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে।
প্রযুক্তি সাইট ‘রেস্ট অফ ওয়ার্ল্ড’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পেসসেলের এ কৌশলকে তিনি চীনা বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি বিওয়াইডি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
বিওয়াইডি যেভাবে শত কোটি ডলারের সরকারি ভর্তুকি কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে বিক্রির দৌড়ে টেসলাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল স্পেসসেলও ঠিক একই পথ অনুসরণ করছে।
স্পেসসেলের সাম্প্রতিক তহবিল সংগ্রহের পরিমাণটি স্টারলিংকের মূল কোম্পানি স্পেসএক্সের রেকর্ড ভাঙা ৮ হাজার ৫৭০ কোটি ডলারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও’র তুলনায় খুবই নগণ্য।
তবে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বমঞ্চে চীনের ক্রমাগত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি কি স্পেসসেলকে এই বাজারে দ্রুত এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে?
স্পেসসেল আসলে কী?
এ প্রকল্পটি ইংরেজিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্পেসসেল কনস্টেলেশন’ ও চীনা ভাষায় ‘কিয়ানফান’ নামে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে ‘উচ্চগতিওয়ালা, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য’ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক কোম্পানি ‘শ্যান্ডহাই স্পেসকম স্যাটেলাইট টেকনোলজি’ এটি চালু করেছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘বেইজিং রিভিউ’ ম্যাগাজিনের ভাষ্যকার ল্যান জিনঝেন বলেছেন, স্পেসসেল প্রকল্পটি চীনের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই চালু করা হয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য পশ্চিমা কোনো কোম্পানি বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর না করেই চীনের ‘বিদেশি প্রকল্প, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক বিভিন্ন মিশনকে’ ইন্টারনেট সেবা দিয়ে সহায়তা করা।
এসএসএসটি’র পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রপরিচালিত গবেষণা কোম্পানি ‘চায়নিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস’ ও সাংহাই ‘মিউনিসিপ্যাল পিপলস গভর্নমেন্ট’।
প্রকল্পটির প্রাথমিক তহবিল হিসেবে তারা ৬৭০ কোটি ইউয়ান দিয়েছিল, যা সম্পূর্ণভাবে চীন-অর্থায়িত একটি প্রকল্প, যার বিনিয়োগ কেবল চীনভিত্তিক করপোরেট কোম্পানি বা অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংস্থার মধ্যেই সীমিত। তবে হংকং ও ম্যাকাও এর আওতাভুক্ত নয়।
স্পেসসেলের কার্যক্রমের পরিধি সম্পর্কে জনসমক্ষে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে চীনের ব্যবসায়িক তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘কিচাচা’র সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে এসএসএসটি’র কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩৪৩ জন।
কোম্পানিটির অফিসিয়াল লিংকডইন পেইজে কর্মীর সংখ্যা ২০১ থেকে ৫০০ জনের মধ্যে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, চীনা ক্যারিয়ার প্ল্যাটফর্ম ‘জোবউ’ বলেছে, ২০২৪ সালে কোম্পানিটি ২২৪টি পদে নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।
এ পর্যন্ত কতটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে?
২০২৪ সালের অগাস্টে স্পেসসেল তাদের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। সে সময় ‘লং মার্চ সিক্স-এ’ রকেটের মাধ্যমে ১৮টি ফ্ল্যাট-প্যানেল স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। এর ঠিক দুই মাস পর দ্বিতীয় দফায় আরও ১৮টি ও একই বছরের ডিসেম্বরে তৃতীয় দফায় আরও ১৮টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপিত হয়।
এ বছরের জুনে ‘লং মার্চ এইট’ রকেটের সাহায্যে চালানো ১২তম ও সবচেয়ে সাম্প্রতিক উৎক্ষেপণটির পর পৃথিবীর কক্ষপথে এখন স্পেসসেলের সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত দুইশোটি।
কোম্পানিটি বলেছে, সমুদ্রে বাণিজ্যিক বিভিন্ন জাহাজের অবস্থান ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাদের প্রথম বাণিজ্যিক অ্যাপ্লিকেশন বা সেবা চালুর জন্য এখন পর্যাপ্ত স্যাটেলাইট তাদের হাতে রয়েছে।
কোম্পানিটির লক্ষ্য ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আরও বড় পরিসরে বাণিজ্যিক সেবা চালু করা। ওই সময় কক্ষপথে তাদের মোট সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা ৬৪৮-এ পৌঁছাতে পারে।
এসএসএসটি’র তথ্য অনুসারে, বিশ্বজুড়ে সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক কাভারেজ নিশ্চিত করতে এ কনস্টেলেশনে শেষ পর্যন্ত ১৫ হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইট যোগ করা হবে।
স্টারলিংকের সঙ্গে স্পেসসেলের তুলনা কেমন?
বিশ্বের ১৬০টি দেশ ও অঞ্চলে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি সক্রিয় গ্রাহক নিয়ে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট খাতের একচ্ছত্র শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে স্টারলিংক। বর্তমানে কক্ষপথে তাদের প্রায় ১০ হাজার ৪১৩টি স্যাটেলাইট সক্রিয় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ৪২ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
সংখ্যা ও গ্রাহকের বিচারে স্পেসসেল এখনো স্টারলিংকের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও তাদের লক্ষ্য বেশ বড়। কোম্পানিটির দাবি, ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে তাদের ১০ হাজারেও বেশি স্যাটেলাইট সক্রিয় থাকবে।
তবে বাজার বিশ্লেষক ব্লেইন কার্সিও সতর্ক করে বলেছেন, স্পেসসেলের এ সফলতা মোটেও নিশ্চিত নয় এবং খোদ চীনের ভেতরেই তাদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
রকেট ও তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে স্পেসসেলকে লড়াই করতে হচ্ছে তাদের দেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বী ‘স্যাটনেট’-এর সঙ্গে, যা চীনের আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। স্যাটনেট ‘গুওওয়াং’ নামে প্রায় একই আকারের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরি করছে।
স্যাটনেট চীনের অভ্যন্তরীণ টেলিকম ও জাতীয় নিরাপত্তা খাতের ওপর বেশি নজর দিচ্ছে। ফলে স্টারলিংকের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্পেসসেলই বেশি এগিয়ে।
এরইমধ্যে ৩০টি দেশের সঙ্গে নিজেদের সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে স্পেসসেল, বিশেষ করে যেসব দেশে মাস্কের স্টারলিংকের চুক্তি ভেস্তে গেছে, সেখানে তারা বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। যেমন, ব্রাজিলে তারা বড় এক চুক্তি করেছে।
২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এর কনটেন্ট মডারেশনে ব্যর্থতার দায়ে মাস্কের সঙ্গে ব্রাজিল সরকারের তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্রাজিলের টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘আনাতেল’ স্পেসসেলকে বাণিজ্যিক সেবা চালুর অনুমোদন দিয়েছে।
একইভাবে কাজাখস্তানেও বেশ অগ্রগতি দেখিয়েছে স্পেসসেল। ডেটা সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নীতিমালার শর্ত নিয়ে স্টারলিংকের সঙ্গে কাজাখস্তানের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্পেসসেল সেখানে তাদের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা সাবসিডিয়ারি নিবন্ধন করেছে।
এ ছাড়া, গেল বছরের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় প্লেন নির্মাতা কোম্পানি ‘এয়ারবাস’-এর সঙ্গে চুক্তি সই করেছে স্পেসসেল, যার ফলে প্লেনের ভেতরের ইন-ফ্লাইট ওয়াইফাই সেবায় স্পেসসেলের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ মিলবে।