১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ভূপৃষ্ঠে গরম, ওপরে ঠান্ডা: কার্বন ডাই অক্সাইডের এমন আচরণ কেন?

নোবেলজয়ী জলবায়ু বিজ্ঞানী ১৯৬০-এর দশকে যেসব জলবায়ু মডেল তৈরি করেছিলেন তাতেই ইঙ্গিত মিলেছিল, কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে গেলে বায়ুমণ্ডলের নিম্নভাগ উষ্ণ ও ওপরে শীতল হবে।

ভূপৃষ্ঠে গরম, ওপরে ঠান্ডা: কার্বন ডাই অক্সাইডের এমন আচরণ কেন?
কার্বন ডাই অক্সাইড ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি অঞ্চলের উষ্ণায়নকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ছবি: নাসা

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 May 2026, 05:07 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:38 PM

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অদ্ভুত কিছু একটা ঘটছে তা বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জানেন। গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলের নিম্নভাগ দিন দিন উত্তপ্ত হলেও এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বায়ুমণ্ডলের ওপরের ভাগে, যেখানে তাপমাত্রা আসলে ক্রমান্বয়ে কমছে বা শীতল হচ্ছে।

এখন ‘কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা দাবি করছেন, অবশেষে এ অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ার পেছনের বিজ্ঞান তারা বুঝতে পেরেছেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে, কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের ঠিক কোন স্তরে অবস্থান করছে তার ওপর ভিত্তি করে কীভাবে এর আচরণ বদলে যায় এবং ইনফ্রারেড বা অবলোহিত আলোর সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।

বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ প্রতিবেদনে লিখেছে, ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি অঞ্চলে কার্বন ডাই অক্সাইড তাপকে আটকে রাখে, যা অন্যথায় মহাশূন্যে মিলিয়ে যেত। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর ভূমিকা রাখার প্রধান কারণ এটিই।

তবে বায়ুমণ্ডলের আরও ওপরের দিকে, বিশেষ করে স্ট্রাটোস্ফিয়ারে কার্বন ডাই অক্সাইড সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে।

স্ট্রাটোস্ফিয়ার স্তরটি ভূপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ১১ থেকে ৫০ কিলোমিটার ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ অঞ্চলে কার্বন ডাই অক্সাইডের বিভিন্ন অণু নিচের দিক থেকে আসা ইনফ্রারেড শক্তি শোষণ করে এবং পরবর্তীতে সেই শক্তির কিছু অংশ মহাশূন্যে ছেড়ে দেয়। ফলে গ্যাসটি সেখানে অনেকটা ‘কুলিং রেডিয়েটর’ বা শীতলীকরণ যন্ত্রের মতো কাজ করে।

বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ যত বাড়ছে স্ট্রাটোস্ফিয়ার মহাশূন্যে তাপ ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তত বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। ফলে মহাশূন্য আরও শীতল হয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা এ প্রভাবের কথা কয়েক দশক আগেই অনুমান করেছিলেন।

নোবেলজয়ী জলবায়ু বিজ্ঞানী শ্যুকুরো মানাবে ১৯৬০-এর দশকে যেসব জলবায়ু মডেল তৈরি করেছিলেন তাতেই ইঙ্গিত মিলেছিল, কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে গেলে বায়ুমণ্ডলের নিম্নভাগ উষ্ণ ও স্ট্রাটোস্ফিয়ার শীতল হবে।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে স্ট্রাটোস্ফিয়ার প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস শীতল হয়েছে।

গবেষকদের ধারণা, মানুষের তৈরি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন ছাড়া প্রাকৃতিক নিয়মে যেটুকু শীতল হতে পারত এই শীতলীকরণের হার তার ১০ গুণ।

তবে বিজ্ঞানীরা এর মূল ধারণাটি বুঝতে পারলেও এ শীতল হওয়ার পেছনের সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত প্রক্রিয়াটি এখন পর্যন্ত অস্পষ্টই ছিল।

শন কোহেনের নেতৃত্বে ও রবার্ট পিনকাস ও লরেঞ্জো পোলভানির সহযোগিতায় গঠিত এ গবেষক দলটি পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য নতুন গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন।

তারা বলছেন, এ শীতলীকরণ প্রক্রিয়াটি কার্বন ডাই অক্সাইড ইনফ্রারেড আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এর ওপর নির্ভর করে। সব ইনফ্রারেড আলো একইভাবে কাজ করে না।

গবেষক দলটি বলছে, নির্দিষ্ট কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্য এমন এক অঞ্চলে পড়ে যাকে তারা ‘গোল্ডিলকস জোন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এ অঞ্চলে কার্বন ডাই অক্সাইড মহাশূন্যে তাপ ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকরী। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা যত বাড়ছে এ কার্যকর জোন বা অঞ্চলটিও তত প্রসারিত হচ্ছে, যা স্ট্রাটোস্ফিয়ারের শীতলীকরণকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গবেষকরা ওজোন ও জলীয় বাষ্পের ভূমিকাগুলোও পরীক্ষা করে দেখেছেন। এসব উপাদানও বায়ুমণ্ডলের ওপরের অংশ শীতল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় এগুলোর প্রভাব কম।

গবেষণাটি একইসঙ্গে ব্যাখ্যা করেছে, ঠিক কী কারণে স্ট্রাটোস্ফিয়ার শীতল হওয়ার পাশাপাশি ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি অঞ্চলের উষ্ণতা আরও শক্তিশালী বা তীব্র হয়ে উঠছে।

বায়ুমণ্ডলের স্ট্রাটোস্ফিয়ার অঞ্চল তাপ হারিয়ে আরও শীতল হয়ে তা সার্বিকভাবে কম ইনফ্রারেড শক্তি বা তাপ নির্গমন করে। মানে, পৃথিবী থেকে সার্বিকভাবে কম তাপ মহাশূন্যে বের হয়ে যেতে পারে, যা বায়ুমণ্ডলের নিম্নভাগে আরও তাপ আটকে রাখে।

সহজ কথায়, কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের ওপরের অংশকে শীতল করার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি অঞ্চলের উষ্ণায়নকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

গবেষকরা বলছেন, এ কাজটি জলবায়ু পরিবর্তনকে নতুন করে প্রমাণ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রতি বায়ুমণ্ডল ঠিক কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় বিজ্ঞানীদের সেই সুনির্দিষ্ট বোঝাপড়াকে আরও উন্নত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ গবেষণা সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ ও সৌরজগতের বাইরের দূরের কোনো এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহের বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণা করতেও গবেষকদের সাহায্য করতে পারে।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার জিওসায়েন্স’-এ।