Published : 14 May 2026, 05:18 PM
আবারও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সংক্রান্ত মামলার মুখে পড়েছে ওপেনএআই। সন্তানের মৃত্যুর জন্য কোম্পানিটিকে দায়ী করে মামলা করেছেন এক দম্পতি।
লেইলা টার্নার-স্কট ও অ্যাঙ্গাস স্কট নামের ওই দম্পতির অভিযোগ, ওপেনএআইয়ের ‘ত্রুটিপূর্ণ পণ্য’ বা চ্যাটজিপিটি’র দেওয়া ভুল চিকিৎসা পরামর্শ মেনে অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ সেবনের ফলে তাদের ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুসারে, ১৯ বছর বয়সী স্যাম নেলসন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলেন। তিনি ২০২৩ সাল থেকে পড়াশোনার কাজে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার শুরু করেন। একপর্যায়ে চ্যাটবটটির কাছে ওষুধ সেবন সম্পর্কে জানতে চান। শুরুতে চ্যাটজিপিটি তাকে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায় ও স্বাস্থ্যের ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করে দেয়।
তবে মামলার অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালে ‘জিপিটি-৪ও’ সংস্করণ আসার পর এমন পরিস্থিতি বদলে যায়। নতুন সংস্করণটি স্যামের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পরামর্শও দিয়েছিল।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, স্যাম ‘সেসব পরামর্শ হুবহু মেনে চলার কারণেই’ শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বলে তার পরিবারের দাবি।
মামলায় দাবি করা হয়েছে, এক পর্যায়ে চ্যাটজিপিটি স্যামকে কীভাবে ‘নিরাপদে’ মাদক সেবন করা যায় সে বিষয়েও পরামর্শ দিতে শুরু করে।
অভিযোগপত্রে স্যামের সঙ্গে চ্যাটবটের আলাপের বেশ কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে। যেমন, একটি অংশে দেখা যায়, চ্যাটবটটি তাকে ডাইফেনহাইড্রামিন, কোকেন ও অ্যালকোহল পর পর সেবন করার বিপদ সম্পর্কে জানাচ্ছে।
অন্য এক আলাপে চ্যাটবটটি স্যামকে বলেছে, ‘ক্র্যাটম’ নামের এক ভেষজ ড্রাগের প্রতি তার সহ্যসক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় কীভাবে ভরা পেটে তা বেশি মাত্রায় নিলেও এর প্রভাব খুব একটা বোঝা যাবে না।
স্যামের এ সহ্যসক্ষমতা কমানোর জন্য কীভাবে ওষুধের মাত্রা ধীরে ধীরে কমাতে হবে চ্যাটবটটি সেই উপায়ও বাতলে দিয়েছিল।
মামলার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হচ্ছে, ২০২৫ সালের ৩১ মে চ্যাটজিপিটি সরাসরি স্যামকে ‘ক্র্যাটম’ ও ‘জ্যানাক্স’ মিশিয়ে সেবনের পরামর্শ দিয়েছিল।
ক্র্যাটম নেওয়ার পর স্যাম বমি বমি ভাব অনুভব করছেন জানালে চ্যাটজিপিটি নিজে থেকেই পরামর্শ দিয়েছিল, এ অস্বস্তি কমাতে ০.২৫ থেকে ০.৫ মিলিগ্রাম জ্যানাক্স নেওয়া হবে এ মুহূর্তের জন্য ‘সবচাইতে বুদ্ধিমানের কাজ’।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, “চ্যাটজিপিটি নিজেকে ওষুধের মাত্রা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। স্যাম যে ওই সময় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন তা বুঝতে পারলেও চ্যাটজিপিটি একবারও তাকে সতর্ক করেনি যে, এ দুটি ওষুধের মিশ্রণ স্যামের জন্য মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।”
অকাল মৃত্যুর অভিযোগ ছাড়াও বাদীরা ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন চিকিৎসা পেশা চর্চার অভিযোগে মামলা করেছেন। তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাওয়ার পাশাপাশি আদালতে আবেদন করেছেন যেন ‘চ্যাটজিপিটি হেলথ’-এর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
এ বছরের শুরুতে চালু হওয়া ফিচারটির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের মেডিকেল রেকর্ড ও ফিটনেস অ্যাপগুলো চ্যাটবটের সঙ্গে যোগ করতে পারেন, যাতে স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশ্নের আরও ব্যক্তিগত বা সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়।
‘টেইক জাস্টিস ল প্রজেক্ট’-এর নির্বাহী পরিচালক মিতালি জৈন বলেছেন, “চ্যাটজিপিটি এমন পণ্য, যা যে কোনো মূল্যে ব্যবহারকারীদের ব্যস্ত রাখার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
“ওপেনএআই জানত যে তাদের এ এআই বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক চিকিৎসা বা রোগ নির্ণয়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এরপরও তারা কোনো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সঠিক পরীক্ষা ছাড়াই তা বাজারে চালু রেখেছে।
“ওপেনএআইয়ের এ অবহেলার কারণেই একটি পরিবার তাদের প্রিয় সন্তানকে হারিয়েছে, যে ট্র্যাজেডি ছিল প্রতিরোধযোগ্য। যতক্ষণ পর্যন্ত না বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিষয়টি শতভাগ নিরাপদ প্রমাণিত হচ্ছে ততক্ষণ ‘চ্যাটজিপিটি হেলথ’ বন্ধ রাখতে ওপেনএআই’কে বাধ্য করতে হবে।”
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘জিপিটি-৪ও’ মডেলটি সরিয়ে নিয়েছে ওপেনএআই, যা কোম্পানিটির অন্যতম বিতর্কিত মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল। কারণ ব্যবহারকারীর কথার সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত সুর মিলিয়ে কথা বলত এ মডেল।
এর আগে, আত্মহত্যা করা এক কিশোরের মা-বাবাও ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছিল, ‘জিপিটি-৪ও’ এমনভাবে ডিজাইন, যা ব্যবহারকারীর মনে ‘মানসিক নির্ভরশীলতা’ তৈরি করে।
এ মামলার প্রেক্ষিতে ওপেনএআইয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, স্যাম যে সংস্করণের চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছিলেন সেটি পুরানো এক সংস্করণ এবং তা বর্তমানে আর সচল নেই।
“চ্যাটজিপিটি কখনোই চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নয়। আমরা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সংবেদনশীল ও জটিল পরিস্থিতিতে চ্যাটবটের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছি।
“বর্তমানের চ্যাটজিপিটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যা ব্যবহারকারীর মানসিক কষ্ট বা বিপদ বুঝতে পেরে ক্ষতিকর বিভিন্ন অনুরোধ নিরাপদে ঠেকাবে এবং ব্যবহারকারীকে বাস্তব জগতের সাহায্য নিতে দিকনির্দেশনা দেবে। এ উন্নয়নের কাজ এখনও চলছে এবং আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।”
আরও পড়ুন…
ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলায় আত্মহত্যা করা টিনএজারের মা-বাবা