Published : 14 Jul 2026, 10:09 AM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জোয়ারের মধ্যেও হলিউডের সিনেমাগুলো মানুষের হাত ধরেই টিকে থাকবে বলে বিশ্বাস করেন অস্কারজয়ী পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান।
তার মতে, ওয়াল স্ট্রিট বা বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি এআইকে আপন করে নিলেও সাধারণ মানুষের মনে এআই কনটেন্ট নিয়ে অবজ্ঞা রয়েছে। আর, এআই মানুষের সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি বদলে দেবে– এমন দাবিকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ওপেনহাইমারের নির্মাতা।
নোলান বলছেন, তিনি যেভাবে বাস্তব লোকেশনে গিয়ে বড় বাজেটের অ্যাকশন ঘরানার সিনেমা তৈরি করেন এআই প্রযুক্তির প্রসারের পরও তা টিকে থাকবে। কারণ, এআই এমনই প্রযুক্তি।
ব্রিটিশ-আমেরিকান এ পরিচালক বর্তমানে গ্রিক মহাকাব্যভিত্তিক তার নতুন সিনেমা ‘অডিসি’র প্রচারণায় ব্যস্ত আছেন, যা এ সপ্তাহেই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে।
প্যারিসে এক সাক্ষাৎকারে নোলান বলেছেন, “এআইয়ের ক্ষেত্রে মজার বিষয় হচ্ছে, আমি আগে কখনো এমন কোনো প্রযুক্তি দেখিনি, যা ওয়াল স্ট্রিট, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি কোম্পানি এত সফলভাবে গ্রহণ করেছে, অথচ সাধারণ জনগণ এআইকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
“এমনটা বেশ অদ্ভুত বিষয়, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এ ধরনের কনটেন্ট বোঝাতে ‘এআই স্লপ’ শব্দটি তৈরি করেছে। এআই দিয়ে তৈরি জিনিসের প্রতি তাদের এক ধরনের অবজ্ঞা কাজ করে।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি নিম্নমানের টেক্সট, ভিডিও ও অডিওর যে বন্যা বয়ে গেছে তা বোঝাতেই তরুণরা ‘এআই স্লপ’ শব্দটি ব্যবহার করছেন।
ব্যবসায়িক বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন বা অনলাইন সার্চের ক্ষেত্রে এআই ব্যাপকভাবে যোগ হলেও সংগীত, চলচ্চিত্র ও চিত্রকলার মতো সৃজনশীল মাধ্যমগুলোতে তা তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ছে।
নিজের নতুন সিনেমা ‘অডিসি’তে আবারও চোখ ধাঁধানো স্পেশাল ইফেক্টের ব্যবহার করা নোলান এআইয়ের ইতিবাচক দিকও দেখছেন। তিনি আশা করছেন, এআই হয়ত ভবিষ্যতে ইমেজ বা ভিজুয়াল তৈরির ক্ষেত্রে কিছু দরকারি ‘টুল’ বা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
“তবে এ প্রযুক্তি মানুষের সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে—এমন ভাবনা আমার কাছে একেবারেই অর্থহীন মনে হয়।”
এআই নিয়ে পরিচালক নোলানের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। তার আগের সিনেমা ‘ওপেনহাইমার’ মুক্তির সময়েই ২০২৩ সালে গার্ডিয়ান’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি পরমাণু বোমার জনক জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আহ্বানের সঙ্গে বর্তমান এআই বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তার ‘তীব্র সমান্তরাল’ বা মিল খুঁজে পেয়েছিলেন।
ওই সময় গুগলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে উন্নত এআইয়ের ‘অস্তিত্বের ঝুঁকি’ নিয়ে কথা বলা ব্রিটিশ ‘গডফাদার অফ এআই’ ড. জিওফ্রে হিন্টনের মতো বিশেষজ্ঞদের উদাহরণ টেনে নোলান সতর্ক করে বলেছিলেন, এআই’কে যেন কোনোভাবেই নির্মাতা বা নিয়োগকর্তারা তাদের জবাবদিহিতা এড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারেন।
নোলান বলেছিলেন, এআই প্রযুক্তির এসব জটিল প্রশ্ন অনেক সময় তার পরবর্তী কাজের জ্বালানি বা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। সেই ধারাবাহিকতায় হলিউডের অভিনেতা, লেখক ও কলাকুশলীদের প্রতিস্থাপনে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ও সংশয় চলছে ঠিক তখনই তিনি নিয়ে আসছেন তার নতুন ধ্রুপদী সিনেমা।
পাশ্চাত্য সাহিত্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্য ‘অডিসি’র ওপর ভিত্তি করে নোলান নির্মাণ করেছেন নিজের নতুন চলচ্চিত্র। ট্রোজান যুদ্ধ শেষে হিরো অডিসিউসের ১০ বছরের গৃহপ্রত্যাবর্তনের রোমাঞ্চকর লড়াই, একচোখা দানব সাইক্লপস ও সাইরেনদের মতো গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত সব চরিত্র ও দৃশ্য এই সিনেমায় উঠে আসবে।
সিনেমাটির বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি ডলার। এ মোটা অংকের বাজেটের কল্যাণে নোলান ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন বাস্তব লোকেশনে গিয়ে এর শুটিং করেছেন। সিনেমাটির অডিসিউস চরিত্রে অভিনয় করছেন ম্যাট ডেমন।
এ ছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন জেনডায়া, টম হল্যান্ড, রবার্ট প্যাটিনসন ও অ্যান হ্যাথাওয়ের মতো একঝাঁক তারকা। তবে সিনেমাটি মুক্তির আগেই এক বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এর কাস্টিং।
গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে সুন্দরী নারী চরিত্র ‘হেলেন অফ ট্রয়’ হিসেবে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী লুপিটা নিয়ঙ্গোকে কাস্ট করায় ইলন মাস্কসহ কয়েকজন ডানপন্থী ব্যক্তিত্ব ক্রিস্টোফার নোলানের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তবে এ সমালোচনাকে একদমই পাত্তা দিচ্ছেন না অস্কারজয়ী অভিনেত্রী লুপিটা নিয়ঙ্গোও। তিনি বলেছেন, “আমাদের এ কাস্ট পুরো পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করে। আমি এর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না। আমি এতে জড়াই বা না জড়াই সমালোচনা থাকবেই।”