Published : 13 Feb 2026, 01:10 PM
রাত বাড়লেই মাথার ভেতর চিন্তার মেলা বসে। বালিশে মাথা রাখলেই যেন গোটাবিশ্বের তাবৎ দুশ্চিন্তা জেঁকে ধরে। বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের মস্তিষ্ক মহাবিশ্বের জটিলতম বস্তু হলেও ঘুমের সময় তা মাঝেমধ্যে যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু কেন এমন হয়? আর কেনইবা মন শান্ত হতে চায় না?
বিবিসি লিখেছে, মানুষের ঘুম না এলে মাথায় চিন্তার ঝড় ওঠা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। বাতি নিভে যায়, মাথা বালিশে পড়ে তখনও মানুষের মস্তিষ্কের ‘ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশটি সারাদিনের কাজ শেষ করে উঠতে পারে না। ক্যাফেইন, উদ্বেগ বা দৈনন্দিন দুশ্চিন্তায় উত্তেজিত হয়ে মস্তিষ্ক তখন যেন ‘পিনবল মেশিনের’ মতো আচরণ করে, যেখানে বিভিন্ন চিন্তা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আছড়ে পড়তে থাকে।
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘রুমিনেশন’ বা অবিরাম একই চিন্তা করা বা মানসিক অস্থিরতা, যা নেতিবাচক চিন্তার এক পুনরাবৃত্তিমূলক ধরন, যার অনেকটুকুই মানুষের অবচেতন মনে ঘটে, যেখানে মানুষ নিজেদের ভুলগুলো নিয়ে পড়ে থাকেন, সারাদিনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ ও আগামীকাল কী হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন।
যাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা আছে তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও প্রকট। তবে বিষয়টি যে কারো সঙ্গেই হতে পারে, বিশেষ করে যখন কাজের অনেক চাপ থাকে বা জীবন মনের মতো চলে না।
তবে ঘুমের সময় মানুষের এ লাগামহীন মনকে নিয়ন্ত্রণের উপায় রয়েছে।
মনোবিজ্ঞানী ড. লুক বিউডোইন বলেছেন, তার কাছে একটি সমাধান আছে, যাকে বলে ‘কগনিটিভ সাফল’। বিষয়টি কোনো জাদুকরী কৌশল নয়, বরং ঘুমের শুরুতে মানুষের মস্তিষ্কে যা ঘটে তাকে কাজে লাগানোর পদ্ধতি। ‘কগনিটিভ সাফল’ হচ্ছে ঘুমের আগের সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা, যেখানে মানুষ পুরোপুরি সচেতন নন, আবার পুরোপুরি ঘুমিয়েও পড়েননি।
‘কগনিটিভ সায়েন্স’ ও ঘুম নিয়ে কাজ করেন কানাডার ‘সাইমন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটি’র খণ্ডকালীন অধ্যাপক বিউডোইন। তিনি বলেছেন, “ঘুম হুট করেই চলে আসে না, ধাপে ধাপে এগোয়। এ সময় আপনার বিভিন্ন চিন্তাভাবনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র থাকে না।”
‘কগনিটিভ সাফল’-এর লক্ষ্য মানুষের চিন্তাভাবনা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে ঠিক তখন সেগুলোকে এক হালকা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। বিষয়টি মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবে যা করে তারই অনুকরণ, যেখানে অসংলগ্ন সব ছবির মতো দৃশ্য তৈরি হয়, যা মানুষকে অবচেতনভাবে ঘুমের দেশে নিয়ে যায়।
বিউডোইন বলেছেন, “কগনিটিভ সাফল আপনাকে একের পর এক জিনিসের কথা কল্পনা করতে সাহায্য করে। এর একটি উপায়, যে কোনো একটি শব্দ বেছে নেওয়া। যেমন ধরুন, পিয়ানো। এবার ৫ থেকে ৬ সেকেন্ডের জন্য একটি পিয়ানোর কথা ভাবুন। ভাবুন আপনি সেটি স্পর্শ করছেন বা বাজাচ্ছেন, বাজাতে না জানলেও তা কল্পনা করুন।
“এরপর আমরা ‘পিয়ানো’ শব্দের প্রতিটি অক্ষর ধরে এগোব এবং প্রতিটি অক্ষর দিয়ে শুরু হয় এমন যতগুলো সম্ভব শব্দ বা অনুষঙ্গ খুঁজে বের করব।”
যেমন ‘পিয়ানো’র ক্ষেত্রে আপনি ইংরেজি অক্ষর ‘পি’ দিয়ে শুরু করতে পারেন। পেঁপে, পেন্সিল, পুতুল ও পাহাড় ইত্যাদি। প্রতিটি জিনিস ৫ থেকে ৬ সেকেন্ডের জন্য মনে মনে কল্পনা করুন। যখন ‘পি’ দিয়ে শব্দ শেষ হয়ে যাবে তখন পরবর্তী অক্ষর ‘আই’, তারপর ‘এ’ এভাবে এগোতে থাকুন। শব্দের শেষ অক্ষরে পৌঁছানোর অনেক আগেই মানুষ গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে পারেন।
এ পদ্ধতিটি কার্যকর হওয়ার কারণ হচ্ছে, মানুষ মনে মনে যেসব ছবি আনছেন সেগুলো একটির সঙ্গে অন্যটির খুব সামান্যই মিল থাকে।
বিউডোইন বলেছেন, “আমরা চাই আপনার মস্তিষ্ক যেন ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবে। কারণ আপনি যখন স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর প্রক্রিয়ায় থাকেন মস্তিষ্ক তখন ঠিক এ কাজটিই করে।”
‘কগনিটিভ সাফলিং’ সচেতন ও অবচেতন চিন্তার ঠিক মাঝখানের ভারসাম্য বজায় রাখে। বিষয়টি মস্তিষ্ককে এমন কাজে ব্যস্ত রাখে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত বিভিন্ন দুশ্চিন্তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। তবে কাজটি এমনও জটিল নয়, যার জন্য মস্তিষ্কের গভীর মনোযোগ বা বড় কোনো পরিশ্রমের প্রয়োজন।
বিউডোইন বলেছেন, “আপনি যখন এ কাজটি করবেন তখন কোনো দুশ্চিন্তা আপনার মাথায় আসবে না।”
এ কৌশলটি বিউডোইনের তৈরি করা ঘুমের সূচনার বৃহত্তর তত্ত্বের একটি অংশ, যাকে ‘সমনোলেন্ট ইনফরমেশন প্রসেসিং’ বলে। এ ধারণাটি ঘুমের শুরুতে মানুষের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বর্ণনা এবং এমন কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করে, যা এ প্রক্রিয়াকে সহজ বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
মানসিক অস্থিরতা বা মাথার ভেতর চিন্তার যে অবিরাম দৌড় মাঝেমধ্যে অনুভব করেন মানুষ তা মূলত ঘুমের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিউডোইন এ ‘কগনিটিভ সাফলিং’ পদ্ধতির ওপর বেশ কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা চালিয়েছেন। তবে তিনি আরও বড় পরিসরে গবেষণা করতে চান, যেখানে ঘুমের জন্য ব্যবহৃত অন্যান্য প্রচলিত মানসিক কৌশলের সঙ্গে এ পদ্ধতির তুলনা করা হবে।