Published : 15 Sep 2025, 07:14 PM
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম বড় বিস্ময় হতে পারে মহাকাশের ছোট ও লাল আলো ছড়ানো বিভিন্ন বিন্দু। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তোলা ছবিতে দেখা গেছে এসব বিন্দু।
প্রথমে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, এসব বস্তু হচ্ছে এমন এক ধরনের ছায়াপথ, যা বিগ ব্যাংয়ের কয়েক কোটি বছর পরেই বড় ও পূর্ণাঙ্গ রূপে গঠিত হয়েছিল। এ ধারণাই গবেষকদের অবাক করেছে। কারণ আমাদের ছায়াপথ তৈরি হওয়ার যে বর্তমান ধারণা, তার সঙ্গে একেবারেই মেলে না এটি।
তবে এখন ‘পেন স্টেট ইউনিভার্সিটি’সহ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দলের অনুমান, সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের জ্যোতির্মণ্ডলীয় বস্তু হতে পারে এসব লাল বিন্দু, যা ‘ব্ল্যাক হোল তারা’ নামে পরিচিত নতুন ধরনের এক মহাজাগতিক বস্তু।
প্রাথমিক মহাবিশ্বের এক ধাঁধা
২০২২ সালের দিকে যখন নিজের তোলা প্রথম ছবি পাঠানো শুরু করে জেমস ওয়েব তখন প্রাথমিক মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা দুর্বল উজ্জ্বল লাল ছোট ছোট এসব বিন্দুর দেখা পেলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
কারণ লাল আলো সাধারণত পুরানো তারাদের থেকে আসে। ফলে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, এগুলো পূর্ণবয়স্ক ছায়াপথ, যা অত্যন্ত তাড়াতাড়ি তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি এতই তাড়াতাড়ি ঘটেছে যে, বিষয়টি অসম্ভব মনে হচ্ছিল তাদের কাছে।
মজার ছলে এদের ‘ইউনিভার্স ব্রেকার্স’ বা বিশ্ব ভাঙনকারী বলে ডাকতে শুরু করে গবেষণা দলটি। কারণ এমনটি সত্যি হলে এগুলো ছায়াপথের গঠন সম্পর্কে পুরানো বা প্রচলিত ধারণা, তত্ত্ব বা নিয়মকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করতে বা ভেঙে দিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
তবে আরও ভালো করে বিশ্লেষণের পর গবেষণা দলটি দেখতে পায়, যেগুলোকে ছায়াপথ মনে করা হচ্ছিল, সেগুলো বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বড় ও উজ্জ্বল, যা স্বাভাবিক নয়।
সত্যিই যদি এত ছোট জায়গায় এতগুলো তারা ঘন হয়ে থাকে তবে ওই জায়গার রাতের আকাশ অত্যন্ত ঝলমলে উজ্জ্বল হয়ে উঠত, যা প্রাকৃতিকভাবে স্বাভাবিক নয়।
‘ব্লাক হোলের তারা’ আসলে কী?
নতুন ব্যাখ্যাটি আরও অদ্ভুত। গবেষকরা বলছেন, এসব লাল বিন্দু ছায়াপথ নয়, বরং হতে পারে তরুণ সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের আশপাশে গ্যাসের বিশালাকার গোলক।
এ ব্ল্যাক হোলটি নিজের আশপাশের থাকা গ্যাসকে অনেক বেশি পরিমাণে টেনে নেয়। এসব গ্যাস সাধারণ তারা গঠনের বদলে বিশাল এক বায়ুমণ্ডল তৈরি করে।
গবেষকরা বলছেন, এ বায়ুমণ্ডল তারার মতো আলোকিত হলেও আমাদের সূর্যের মত নিউক্লিয়ার ফিউশনে চলে না। এর বদলে, এ আলো আসে কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোল থেকে, যা পতিত পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ফলে বস্তুটি বিশাল এক ঠাণ্ডা ও লাল রঙের তারার মতো দেখায়, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু ও দেখা আগে কখনো মেলেনি।
এ অনুমান পরীক্ষার জন্য ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জেমস ওয়েবের প্রায় ৬০ ঘণ্টা সময় পর্যবেক্ষণ করে এসব বস্তুর আলো বিশ্লেষণ করেছে গবেষণা দলটি, যেটিকে ‘স্পেকট্রা’ বা বর্ণালী বলে। এতে আলোকে বিস্তারিতভাবে ভাঙ্গা হয়। স্পেকট্রা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করে কোনো বস্তুতে কী ধরনের উপাদান ও কতটা ভর রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘দ্য ক্লিফ’ নামে পরিচিত সবচেয়ে চরম এক ঘটনা দেখতে পায় গবেষণা দলটি। এর বর্ণালী বিশ্লেষণ থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, এতে প্রচুর ভর ও শক্তি আছে, যা সাধারণ তারা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বদলে বিষয়টি যেন একটি ব্ল্যাক হোলের মতো দেখাচ্ছিল, যা দ্রুতগতিতে পদার্থকে গ্রাস করছে এবং হাইড্রোজেন গ্যাসের ঘন ও জ্বলন্ত খোলের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে।
এ গবেষণা থেকে উঠে এসেছে, প্রাথমিক মহাবিশ্বে ব্ল্যাক হোল তারার বিষয়টি সাধারণ হতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে আমরা যে কোনো ছায়াপথের কথা বলি না কেন তার কেন্দ্রে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল থাকে। তবে বিজ্ঞানীরা কখনো নিশ্চিত ছিলেন না যে, এসব ব্ল্যাক হোল আসলে কোথা থেকে শুরু হয়েছে। ব্ল্যাক হোলের তারারা হতে পারে সেই হারানো যোগসূত্র, যা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল জন্মের প্রথম ধাপ।
এমনটি হলে এসব বস্তু বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে কীভাবে এত বড় ব্ল্যাক হোল প্রাথমিক মহাবিশ্বেই এত দ্রুত তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়াও, এগুলো থেকে ইঙ্গিত মেলে, মহাবিশ্ব আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি অদ্ভুত হতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এ।