Published : 27 Mar 2026, 02:07 PM
পারস্য উপসাগরে জিপিএস সিগনাল জ্যামিংয়ের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ ও প্লেন চলাচল চরম সংকটে পড়েছে। এ গোলযোগের মাঝেই চীনের ন্যাভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করে ইরানের নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্যামিং প্রতিরোধী প্রযুক্তির লড়াই আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘প্রতিরোধমূলক’ হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করে তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কপলার’।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, এসব জাহাজের লোকেশন ডেটা বা অবস্থানগত তথ্যে দেখা যায় সেগুলো মাটির ওপর দিয়ে চলাচল করছে এবং জ্যামিতিক নকশার মতো অদ্ভুতভাবে দিক পরিবর্তন করছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থান নির্ণয়কারী পরিষেবাগুলোতে এ ধরনের বিভ্রাট ব্যাপকহারে বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে নাবিক, প্লেন ও সাধারণ চালকদের ওপর। এসব ঘটনা জিপিএস-এর মতো মার্কিন প্রযুক্তির বড় ধরনের দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে।
কপলার-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্য করছে, পারস্য উপসাগরে হাজার হাজার তেলের ট্যাংকার তাদের অনবোর্ড ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ বা এআইএস সংকেত নিয়ে কারসাজি করছে। ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা এড়াতেই জাহাজগুলো এ পথ বেছে নিয়েছে।
বাণিজ্য ঝুঁকি বিশ্লেষক আনা সুবাসিক বলেছেন, লোকেশন সিগনাল বা অবস্থানের সংকেত জালিয়াতির এ প্রক্রিয়াটি ‘স্পুফিং’ নামে পরিচিত, যা দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন গোপন অভিযানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা শুরুর পর থেকে এ স্পুফিংয়ের মাত্রা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। সমুদ্র বিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ‘উইন্ডওয়ার্ড’-এর তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পারস্য উপসাগরের ১ হাজার ১০০টিরও বেশি জাহাজ এআইএস বিভ্রাটের শিকার হয়েছে এবং এর এক সপ্তাহ পর এই হার আরও ৫৫ শতাংশ বেড়েছে।
চরম সংকট
‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ বা সিএসআইএস-এর অ্যারোস্পেস সিকিউরিটি প্রজেক্টের উপ-পরিচালক ক্লেটন সোয়াপ বলেছেন, “এ অঞ্চলে জিপিএস বা অন্যান্য স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন সিগনাল জ্যামিংয়ের পেছনে অনেক পক্ষ কাজ করছে এবং তাদের প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে।”
সোয়াপের মতে, পুরো অঞ্চলজুড়ে এ অতিরিক্ত সিগনাল বিভ্রাটের মূল কারণ হতে পারে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর আত্মরক্ষা। তারা ড্রোন বা মিসাইল হামলা থেকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনাকে রক্ষা করতে চায়। প্রতিপক্ষের ড্রোন বা মিসাইলের ভেতরে থাকা ন্যাভিগেশন সিস্টেমকে ‘বিভ্রান্ত’ করে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
আধুনিক যুদ্ধে এ ধরনের ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপ বা বাধা দেওয়াকে এখন রক্ষণাত্মক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সিএসআইএস-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ সালে ইউক্রেইনে রাশিয়ার আক্রমণের পর সেখানেও একই ধরনের সিগনাল বিভ্রাট দেখা গিয়েছিল।
তবে এ সিগনাল জ্যামিংয়ের ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও ব্যাহত হচ্ছে। যেমন, বিভিন্ন প্লেনের যাতায়াত পথ আঁকাবাঁকা বা ঢেউয়ের মতো অসংলগ্ন দেখাচ্ছে। জিপিএস ত্রুটির কারণে দুবাইয়ের ফুড ডেলিভারি রাইডারদের অবস্থান মাঝেমধ্যে সমুদ্রের মাঝখানে দেখাচ্ছে।
‘জিপিএস ইনোভেশন অ্যালায়েন্স’-এর নির্বাহী পরিচালক লিসা ডায়ার বলেছেন, এ অঞ্চলে ক্রমাগত সিগনাল জ্যামিং ও স্পুফিং বা ভুল তথ্য দেওয়ার ঘটনা জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
কপলার-এর বিশ্লেষক সুবাসিক বলেছেন, হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে পারস্য উপসাগরে জাহাজের আনাগোনা অনেক কমে গেলেও চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর বিদেশি পতাকাবাহী বিভিন্ন জাহাজ এখনও যাতায়াতের অনুমতি পাচ্ছে।
তবে যারা এখনও এই উপসাগর দিয়ে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করছে তাদের জন্য সঠিক অবস্থান বা পজিশনিং ডেটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণ অংশটি কেবল ৩৩ কিলোমিটার চওড়া। ফলে এই সরু পথ দিয়ে যাওয়ার সময় সংঘর্ষ এড়াতে বা জাহাজ চরে আটকে যাওয়া ঠেকাতে নির্ভুল ন্যাভিগেশন গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ‘জিপিএস ইনোভেশন অ্যালায়েন্স’-এর লিসা ডায়ার বলেছেন, এ ন্যাভিগেশন সিস্টেমে বিভ্রাট কেবল জাহাজ বা প্লেনের জন্যই চ্যালেঞ্জ নয়, বরং জরুরি বিভিন্ন পরিষেবার জন্যও বড় বাধা।
কারণ উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত পৌঁছানোর জন্য পুরোপুরি এ ন্যাভিগেশন সহায়তার ওপর নির্ভর করে।

চীনের দিকে ঝুঁকছে কি ইরান?
অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক সিগনাল বিভ্রাট থাকার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে, যা দেশটির সামরিক সক্ষমতার উৎস নিয়ে নানা জল্পনা উসকে দিয়েছে।
ন্যাভিগেশন প্রযুক্তি স্টার্টআপ ‘স্যান্ডবক্সএকিউ’-এর সিইও জ্যাক হিডারি বলেছেন, “বর্তমানে এমন প্রমাণ মিলেছে যে, ইরানকে চীনের গ্লোবাল স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন সিস্টেম বেইডৌ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা ইরানকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে নির্ভুল তথ্য দিচ্ছে।”
আল জাজিরাসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষকরাও ইরানের সাম্প্রতিক নির্ভুল হামলার পেছনে চীনের এ সিস্টেম ব্যবহারের কথা বলেছেন।
সাধারণত মিসাইল ও ড্রোনগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশনের পাশাপাশি ‘ইনার্শিয়াল ন্যাভিগেশন’-এর মতো প্রযুক্তিও ব্যবহার করে, যা কোনো বাইরের সিগনাল ছাড়াই কাজ করতে পারে।
আমেরিকার জিপিএসের মতো বেইডৌ সিস্টেমটিও সামরিক উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিল বেইজিং। ১৯৯৫ সালের তাইওয়ান প্রণালী সংকটের সময় জিপিএস বিভ্রাটের কারণে চীন তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।
ওই ঘটনার পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চীন নিজস্ব এ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
২০০০ সালে যাত্রা শুরু করা চীনের বেইডৌ সিস্টেমটি এখন এর তৃতীয় সংস্করণে রয়েছে। বর্তমানে কেবল সামরিক নয়, বরং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হচ্ছে।
‘স্যান্ডবক্সএকিউ’-এর ন্যাভিগেশন পণ্য ‘একিউনভ’-এর জেনারেল ম্যানেজার লুকা ফেরারার মতে, আমেরিকার জিপিএস, ইউরোপের গ্যালেলেও বা রাশিয়ার গ্লোনাস-এর তুলনায় বেইডৌ’র নেটওয়ার্ক এখন বিশ্বের অন্যতম বড়।
ইরান বেইডৌ ব্যবহারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া’র প্রতিবেদন অনুসারে, গেল বছরের জুনে ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইরানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপমন্ত্রী এহসান চিতসাজ বেইডৌ’র নির্ভুলতা ও এর কাঠামোর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
এ বিষয়ে সিএনবিসি’র মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি ইরান ও চীন কর্তৃপক্ষ।
নতুন কিছু নয়
তবে অনেক বিশ্লেষকই এ তথ্যে খুব একটা অবাক নন। সিএসআইএস-এর বিশেষজ্ঞ সোয়াপের মতে, ইরান যদি বেইডৌ ব্যবহার করেও থাকে এর মানে এই নয় যে, এর পেছনে চীনের সরাসরি কোনো সমর্থন বা সমন্বয় প্রয়োজন।
“আধুনিক স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন চিপগুলো বিশ্বের প্রধান চারটি ন্যাভিগেশন সিস্টেম, যেমন জিপিএস, বেইডৌ, গ্লোনাস, গ্যালেলেও থেকেই সিগনাল গ্রহণ করতে পারে। ফলে ইরান বেইডৌ’র পাশাপাশি রাশিয়ার গ্লোনাস বা ইউরোপের গ্যালেলেও’ও ব্যবহার করতে পারে।”
জিপিএস ইনোভেশন অ্যালায়েন্সের লিসা ডায়ার বলেছেন, বর্তমানে বেশিরভাগ বাণিজ্যিক রিসিভার একাধিক স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহার করে কাজ করে, যা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে।
ইরান বেইডৌ ব্যবহার করলেও তা জিপিএসের মতোই স্যাটেলাইটনির্ভর প্রযুক্তি। ফলে জিপিএস যেভাবে জ্যামিং বা স্পুফিংয়ে শিকার হতে পারে বেইডৌ’র ক্ষেত্রেও সেই একই ঝুঁকি থেকে যায়।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ স্যাটেলাইটনির্ভর বিভিন্ন ন্যাভিগেশন সিস্টেমের দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।
স্যাটেলাইটনির্ভর ন্যাভিগেশন সিস্টেমের ওপর এ অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ‘স্যান্ডবক্সএকিউ’-এর লুকা ফেরারা।
তিনি বলেছেন, “এতদিন মনে করা হত পজিশনিং বা ন্যাভিগেশনের জন্য স্যাটেলাইটই একমাত্র ভিত্তি। তবে এখন সেই ধারণাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।”
তার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যা স্যাটেলাইট সিগনালের বদলে পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে কাজ করবে।
ফেরারা আরও বলেছেন, চীনের বেইডৌ বা রাশিয়ার গ্লোনাসের মতো সিস্টেমের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত কৌশলগত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এসব বিকল্প ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে ন্যাভিগেশনের ওপর আমেরিকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটনের হাতে এখনও কিছু তুরুপের তাস রয়েছে। আমেরিকার স্থল অভিযানের গুঞ্জনের মধ্যে জানা যাচ্ছে, পুরো অঞ্চলে ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপ বা সিগনাল বিভ্রাট চললেও মার্কিন বাহিনী হয়ত তাতে খুব একটা ক্ষতির মুখে পড়বে না।
বিশেষজ্ঞ সোয়াপের মতে, মার্কিন সেনারা বর্তমানে জিপিএসের নতুন ও জ্যামিং প্রতিরোধী সিগনাল ব্যবহার করছে, যা বিশেষভাবে এমন যুদ্ধের ময়দানের জন্য তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক পরিমাণে সিগনাল বিভ্রাট বা হস্তক্ষেপ থাকে।
“অনেক সিগনাল জ্যামিং থাকলেও মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।”