Published : 01 Jun 2026, 10:07 AM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইচালিত ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে রুশ বাহিনীর রসদ সরবরাহ লাইন ধ্বংসের অভিযান জোরদার করেছে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকৃত ইউক্রেইনের প্রধান সড়কগুলোতে রুশ বাহিনীর রসদ সরবরাহ বন্ধ করতে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী তাদের অভিযান জোরদার করেছে। আর এ কাজে তারা ব্যবহার করছে এআইচালিত ড্রোন প্রযুক্তি।
গেল সপ্তাহে প্রকাশিত অন্তত ১৪টি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে এর সত্যতা পেয়েছে বিবিসি ভেরিফাই, যেখানে দেখা গেছে, রাশিয়া থেকে ক্রিমিয়া ও দক্ষিণ ইউক্রেইনের অন্যান্য অধিকৃত অঞ্চলের সংযোগকারী প্রধান সড়কগুলোতে খাবার, জ্বালানি ও গোলাবারুদবাহী রুশ গাড়িগুলোকে নিখুঁতভাবে নিশানা করা হচ্ছে।
‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার’ বা আইএসডব্লিউ-এর এক বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৩ সালের পর এই প্রথম ইউক্রেনীয় বাহিনী ভূখণ্ড হারানোর চেয়ে নতুন করে জায়গা উদ্ধার করছে বেশি।
দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ এবং পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেইনে রাশিয়ার ব্যাপক দখলদারিত্বের পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কোনো পক্ষই অবশ্য বড় ধরনের কোনো জয় পায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রোন প্রযুক্তির এ অভাবনীয় উন্নতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ‘হরনেট’ নামের এক এআইচালিত ড্রোন সিস্টেম। এ প্রযুক্তির কল্যাণে ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন অনেক দূর থেকে এবং নিখুঁতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া রুশ সামরিক বহরগুলোর ওপর সফলভাবে আঘাত হানতে পারছে।
বুধবার ইউক্রেইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ বলেছেন, তাদের এ ‘লজিস্টিকস লকডাউন’ বা রসদ সরবরাহ অবরুদ্ধ করার কৌশলের মূল লক্ষ্য “পেছনের সারিতে থাকা রুশ সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ানো এবং শত্রুপক্ষ যাতে দীর্ঘমেয়াদী আক্রমণাত্মক অভিযান চালিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।”
বিবিসি ভেরিফাই ও অনলাইন ওপেনসোর্স বিশ্লেষক দল ‘জিওকনফার্মড’-এর যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে দক্ষিণ ইউক্রেইনের এক প্রধান সড়কের বিভিন্ন স্থানে কনটেইনারবাহী পুড়ে যাওয়া লরি ও অন্যান্য সামরিক যান দেখা গেছে।
রাশিয়া সীমান্ত থেকে শুরু করে অধিকৃত মারিওপোল শহর পর্যন্ত এমন অন্তত ১০টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি হামলা হয়েছে মেলিতোপোল শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে।
এ গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি রুশ সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ও ক্রিমিয়ায় তাদের সৈন্যদের রসদ জোগাতে ব্যবহার করে থাকে।
‘আটুম মুন্ডি’ থিংক ট্যাংকের বিশ্লেষক ক্লেমেন্ট মোলিন বলেছেন, তিনি সম্মুখ সমর থেকে ২০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে প্রায় ১৫০টি গাড়ি ধ্বংসের তথ্য নিশ্চিত করছেন। এমনটা সম্ভবত মোট হামলার ঘটনার অর্ধেক।
যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ সংগঠন ‘অ্যাকলেড’-এর ক্রিস্টিয়ান ভ্লাস বলেছেন, এ হামলার কারণে রাশিয়া বাধ্য হয়ে রসদ সরবরাহের গাড়ির বহর ছোট করে ফেলছে, যাতে ‘সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো যায়’।
তিনি বলেছেন, ইউক্রেইনের মূল লক্ষ্য কেবল রাশিয়ার ‘মহাশক্তিধর দেশের ভাবমূর্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ’ সম্পদগুলোতে আঘাত করা নয়, বরং তাদের মূল উদ্দেশ্য প্রধান রসদ সরবরাহকারী বহর, কমান্ড পোস্ট ও বিভিন্ন যোগাযোগ টাওয়ারকে ধ্বংস করে দেওয়া।
“কারণ এসবই ফ্রন্টলাইনে থাকা রুশ ইউনিটগুলোকে খাবার, জ্বালানি ও তথ্য জোগায় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করার পাশাপাশি অধিকৃত এলাকা থেকে দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মূল শক্তি হিসাবে কাজ করে।”
‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউট’-এর স্থল যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ রবার্ট টোলাস্ট বলেছেন, হিসাব অনুসারে কিছু রুশ ব্রিগেডকে প্রতিদিন শত শত টন জ্বালানি, খাদ্য, গোলাবারুদ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করতে হয়।
তিনি বলেছেন, ইউক্রেইন এর আগেও রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোর বিরুদ্ধে দূরপাল্লার আক্রমণ চালিয়েছিল। তবে এ নতুন ড্রোনের হামলার পরিসর ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ের’।
“আপনি যদি ছোট ড্রোন ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ১০০ কিলোমিটার বা তারও বেশি দূরে থাকা গোলাবারুদের ট্রাকের মতো রসদ সরবরাহ লাইন কেটে দিতে পারেন এবং এরপর আরও দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে বড় বড় লজিস্টিক ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করেন তবে তা রাশিয়ার জন্য বড় সমস্যা।”
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা কোম্পানি ‘জেনেস’-এর অস্ত্র বিশেষজ্ঞ নিক ব্রাউন বলেছেন, ইউক্রেইনের এসব ‘হরনেট’ ড্রোনে বিশেষ এআইটার্গেটিং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ব্যবস্থা রয়েছে।

গত চার বছর ধরে সংগ্রহ করা রুশ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর হাজার হাজার ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করে এ এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এগুলো স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারে। ফলে দূর থেকেও অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব। একইসঙ্গে ব্যবস্থাটি রুশ বাহিনীর জ্যামিং বা সিগনাল ব্লক করার প্রচেষ্টাকে রুখে দিতে বেশি কার্যকর।
ব্রাউন বলেছেন, “ইউক্রেইন ১০০ মাইলেরও বেশি দূরে থাকা কোনো সম্ভাব্য লক্ষ্য এলাকার দিকে শত শত ‘লয়টারিং মিউনিশন’ বা আত্মঘাতী ড্রোন ছুড়ে দিতে এবং এরপর এগুলো যখনই কোনো রুশ সামরিক লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায় তখন এআই ব্যবহার করে সেগুলোর ওপর সুনির্দিষ্টভাবে আঘাত হানতে পারে।”
‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার’ বা আইএসডব্লিউ-এর জর্জ বারোস বলেছেন, প্রযুক্তির এ উদ্ভাবনী ব্যবহারের অর্থ যুদ্ধটি কোনো অচল অবস্থায় আটকে নেই ও ইউক্রেনীয় বাহিনী এমন সব যুদ্ধকৌশলে যান্ত্রিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে যা ১২ মাস আগেও অসম্ভব ছিল।
“ইউক্রেইনের এ মাঝারি পাল্লার হামলা অভিযান রাশিয়ার রসদ সরবরাহ ও যুদ্ধের সামনের সারির ঘাঁটিগুলোকে ফ্রন্টলাইন থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে অনুপ্রবেশ অভিযানে নিয়োজিত পদাতিক বাহিনীকে টিকিয়ে রাখার রসদ কমে যাচ্ছে, যা রাশিয়ার অনুপ্রবেশের সক্ষমতাকে দিন দিন দুর্বল করে তুলবে।”
এ সপ্তাহে ইউক্রেইনের অন্যতম বিশেষ ড্রোন ইউনিট ‘৪১২তম নেমেসিস ব্রিগেড’ বলেছে, রুশ কমান্ডাররা দক্ষিণ ইউক্রেইনে ভারী যুদ্ধসরঞ্জামের চলাচল সীমিত করে দিয়েছে এবং ড্রোন থেকে বাঁচতে তারা এখন মূল সড়ক ছেড়ে ফসলি জমি ও কাঁচা রাস্তা ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
ইউক্রেইনের খেরসন অঞ্চলের রুশ-নিযুক্ত নেতা ভ্লাদিমির সালদো ওই রুটে বেসামরিক যান চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন তিনি।