Published : 08 Feb 2026, 10:38 AM
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশ্বে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছে, যেখানে কে কার চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে পারে, যেন সেই লড়াই চলছে। এ লড়াইয়ে বর্তমানে সবাইকে টেক্কা দিয়ে শীর্ষে রয়েছে মার্কিন ইকমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন ও সার্চ জায়ান্ট গুগল।
২০২৬ সাল শেস হওয়ার আগেই এ দুই মার্কিন কোম্পানির বিনিয়োগের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য আগামী বছরগুলোতে নিজেদের জয় নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশ্ন হল, বিনিয়োগের এ পাহাড়সমান খরচে শেষ পর্যন্ত লাভ হবে কার?
প্রযুক্তি সাইট টেকক্রাঞ্চ লিখেছে, একদিকে প্রযুক্তি জায়ান্টরা যখন ভবিষ্যতের ‘কম্পিউট’ শক্তি দখলে মরিয়া, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা এ বিশাল খরচের বহর দেখে শেয়ার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। প্রযুক্তি বনাম মুনাফার এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে তা নিয়েই এখন মূল জল্পনা।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এ ধারণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, ব্যবসা তখনই সফল হয় যখন খরচ কমিয়ে আয় বাড়ানো যায়। তবে বড় বড় টেক কোম্পানির কাছে এ ‘বেশি খরচের’ যুক্তিটিই এখন পর্যন্ত বেশ গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। একে জেতার মূল মন্ত্র ভাবলে বলতেই হবে এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে অ্যামাজন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নিজেদের আয়ের প্রতিবেদনে অ্যামাজন বলেছে, ২০২৬ সাল জুড়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার মূলধন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা। এ মোটা অংকের খরচ হবে এআই, চিপ, রোবোটিক্স ও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে, যা ২০২৫ সালে কোম্পানিটির ১৩ হাজার ১৮০ কোটি ডলার ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি।
পুরো বাজেটটিকেই এআইয়ের জন্য মনে হলেও অন্যান্য প্রতিযোগীদের তুলনায় অ্যামাজনের বড় আকারের কারখানা রয়েছে, যার একটি বড় অংশ ব্যয়বহুল রোবট ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলে এআই বাদে অন্যান্য খরচকে এখানে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তবে পিছিয়ে নেই গুগলও। বুধবার নিজেদের আয়ের প্রতিবেদনে কোম্পানিটি বলেছে, ২০২৬ সালে তাদের মূলধন ব্যয়ের পরিমাণ হতে পারে সাড়ে ১৭ হাজার থেকে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি ডলার, যা আগের বছরের ৯ হাজার ১৪০ কোটি ডলারের তুলনায় অনেক বেশি।
গেল বছর কোম্পানিটি স্থায়ী সম্পদের পেছনে যা খরচ করেছে এবারের বাজেট তার চেয়ে অনেক বেশি এবং গুগলের অধিকাংশ প্রতিযোগী কোম্পানির ব্যয়ের তুলনায়ও বেশি।
গত সপ্তাহে মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা বলেছে, ২০২৬ সালে তারা সাড়ে ১১ হাজার থেকে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, মার্কিন ‘ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ ও এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার কোম্পানি ওরাকল কেবল ৫ হাজার কোটি ডলার খরচের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে।
মাইক্রোসফট এখনও ২০২৬ সালের জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো হিসাব দেয়নি। তবে তাদের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক খরচ ছিল ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। খরচের এ গতি বজায় থাকলে বছর শেষে তা দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারে।
এ ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী সাত্যিয়া নাদেলার ওপর বিনিয়োগকারীদের চাপ বাড়ছে। তবে খরচের দৌড়ে কোম্পানিটি এখনও তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্বের ভেতরের যুক্তিটা খুব সাধারণ। এআইয়ের বৈপ্লবিক সম্ভাবনার কারণে ভবিষ্যতে ‘হাই-এন্ড কম্পিউট’ বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসিং পাওয়ার হবে সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ। তখন কেবল সেসব কোম্পানিই টিকে থাকবে যাদের নিয়ন্ত্রণে নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা থাকবে।
তবে গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা ও ওরাকল যখন ভবিষ্যতের সেই ‘কম্পিউট সংকট’ ঠেকাতে মরিয়া হয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন বিনিয়োগকারীরা কিন্তু তাতে খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
শত শত কোটি ডলারের এই বিশাল বিনিয়োগের ধাক্কায় প্রতিটি কোম্পানির শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। যে কোম্পানি যত বেশি খরচের ঘোষণা দিয়েছে তাদের শেয়ারের দাম তত কমেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এ সমস্যাটি কেবল মেটার মতো কোম্পানির জন্য নয় যারা এখনও তাদের এআই পণ্যের সঠিক কৌশল ঠিক করতে পারেনি, বরং সবার জন্যই প্রযোজ্য, বিশেষ করে মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো কোম্পানির বেলাতেও, যাদের শক্তিশালী ক্লাউড ব্যবসা রয়েছে এবং এআই যুগে কীভাবে অর্থ আয় করতে হবে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। আসলে বিনিয়োগকারীদের স্বস্তির জন্য এসব খরচের অংক মাত্রাতিরিক্তরকম বড়।
তবে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবই সব নয়। এক্ষেত্রে তারা এই শিল্পের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারবে না। এআই সবকিছু বদলে দিতে যাচ্ছে এবং বর্তমানে এ যুক্তিটি বেশ জোরালো তবে কেবল শেয়ার বাজারের অস্থিরতার কারণে কারো পথ পরিবর্তন করা বোকামি হবে।
তবে সামনের দিনগুলোতে নিজেদের এআই উচ্চাকাঙ্ক্ষা মেটাতে ঠিক কতটা খরচ হচ্ছে তা কমিয়ে দেখানোর জন্য প্রচণ্ড চাপের মুখে থাকবে বড় টেক কোম্পানিগুলো।