Published : 02 Feb 2026, 01:05 PM
গণিতের সবচেয়ে সহজ ও অকাট্য সত্য হিসেবে মানুষ জানেন, ২ আর ২ যোগ করলে ৪ হয়। তবে এ ধ্রুব সত্যটি নিয়েই কৌতুহলী এক প্রশ্ন তুলছেন বর্তমান সময়ের একজন গণিতবিদ ও গবেষক। তার প্রশ্ন, বাস্তব পৃথিবীর সব ক্ষেত্রে কি এই নিয়ম খাটে?
‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’র গবেষক করিম কার-এর বিতর্কিত এক পোস্ট থেকে শুরু হওয়া এ আলোচনা কেবল গণিতের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; ছড়িয়ে গেছে সমাজবিজ্ঞান ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন আর গভীর সব দর্শনে। কখনো রাউন্ড ফিগারের মারপ্যাঁচে, কখনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায়, আবার কখনো ডেটা মডেলের সীমাবদ্ধতায় ২+২ কেন ৫ হতে পারে তা নিয়ে শুরু হয়েছে রোমাঞ্চকর এক বিতর্ক।
আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স প্রতিবেদনে লিখেছে, হার্ডওয়্যারের দোকানে স্ক্রু বা এ জাতীয় কিছু গণনা করলে ২ আর ২ চার হওয়া খুব সহজ। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে এ হিসাবের সীমারেখাটা বেশ ঝাপসা। ২ কাপ ভিনেগারের সঙ্গে ২ কাপ বেকিং সোডা মেশালে সেই রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ৫ কাপ বুদ্বুদ তৈরি হবে। তবে এর মানে কি ২ আর ২ সমান ৫?
গণিতের জগতে কিছু অনুমান, যেমন পূর্ণ সংখ্যা ১, ২, ৩ ইত্যাদি দিয়ে গণনা করলে তা গণিতের বিমূর্ত তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি করে। ২ আর ২ সমান চার হলে এ সহজ ধারণাটিকে চিন্তার খোরাক হিসেবে ব্যবহার করে গণিতবিদরা এখন এমন সব পরিস্থিতি খুঁজছেন যেখানে ২ আর ২ আসলে ৪-এর সমান হয় না, অন্তত সরাসরি তো নয়ই। এসব ব্যাখ্যাকে ‘এপিস্টেমোলজি’ বা জ্ঞানতত্ত্বের বড় বড় প্রশ্নে প্রয়োগ করা যায়, অথার্ৎ যা মানুষ জানেন তা আসলে ঠিক কীভাবে জানেন।
২০২০ সালের ৩০ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার (বর্তমানে এক্স) পোস্টে করিম কার লিখেছিলেন, “আমি জানি না কার বিষয়টি শোনা দরকার। তবে কেউ যদি বলে ২ আর ২ সমান ৫ তবে সঠিক প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত, ‘আপনার সংজ্ঞা ও স্বতঃসিদ্ধগুলো আসলে কী কী?’। আর এ নিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার পতন হচ্ছে বলে চিৎকার করা কোনো সমাধান নয়।”
কার বলেছেন, গণনার বিভিন্ন সংখ্যা হল “মহাবিশ্বের বাস্তব জিনিসের কিছু বিমূর্ত রূপ।” ফলে বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিতে এসব বিমূর্ত ধারণা প্রয়োগের সময় আমাদের সতর্ক থাকা উচিত, এগুলো সত্যকে কতটা বিকৃত করছে। পাটিগণিত পাঠ্যবইয়ে খুব ভালো কাজ করে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে তা প্রায়ই এমন সব পরিস্থিতির মুখে পড়ে যেখানে খণ্ডিত অংশ, আনুমানিক মান বা প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় হিসাবে ধরা হয় না।”
যেমন মানুষ যদি একটি কোণের সঙ্গে ডিগ্রি যোগ করতে থাকেন তবে এক সময় ৩৬০ ডিগ্রিতে পৌঁছানো যাবে। তবে ৩৬০ ডিগ্রি কোণের অবস্থান আর ০ ডিগ্রি কোণের অবস্থান একই। ফলে কোণটি ০ ডিগ্রি নাকি ৩৬০ ডিগ্রি, তা নির্ভর করবে মানুষ কোন প্রেক্ষাপটে তা দেখছেন তার ওপর।
একইভাবে, কেউ যদি একটি স্ক্রুকে চারবার ঘোরানোর (১৪৪০ ডিগ্রি) বদলে পাঁচবার (১৮০০ ডিগ্রি) ঘোরান তবে স্ক্রুটির মাথার অবস্থান একই থাকবে। তবে তা কাঠের আরও গভীরে ঢুকে যাবে।
নিজের ওই পোস্টে বাস্তব জীবনে পাটিগণিতের সীমাবদ্ধতার আরও কিছু উদাহরণ দিয়েছেন কার। অনেকে বলেছেন, প্রজননের মাধ্যমে দুটি প্রাণী থেকে তিনটি হতে পারে, বিশেষ করে কারের অনুমান অনুসারে, ১ আর ১ সমান ৩ বা ১ আর ১ সমান ১ হতে পারে। আবার দুটি মেশিনের খুচরা যন্ত্রাংশ আর একটু পরিশ্রম দিয়ে তৃতীয় আরেকটি মেশিন তৈরি করাও সম্ভব।
অন্যরা বলছেন, দুই দশমিক তিনকে রাউন্ড ফিগার করলে ২ হয়। তবে দুই দশমিক তিন আর দুই দশমিক তিন সমান চার দশমিক ছয়, যাকে রাউন্ড ফিগার করলে ৫ হয়, অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ফিল্টারের মাধ্যমে দেখলে ২ আর ২ সমান ৫ হওয়া সম্ভব।
সহজভাবে বললে, গণিত বা মানব উন্নয়ন বিষয়ে অভিজ্ঞ নন এমন মানুষদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, জন্মগতভাবেই মানুষ গণনা বা পূর্ণ সংখ্যা (কোনো ভগ্নাংশ বা দশমিক ছাড়া) শিখি। আসলে ছোট শিশুরা এক এক করে সংখ্যা শেখে গণনার মাধ্যমে। তবে তারা বড় সংখ্যার গণনা তখনই শিখতে পারে যখন তারা একপলকে পরিমাণের পার্থক্য বুঝতে শেখেন, যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলে ‘সুবিটাইজিং’। যেমন, মানুষের জন্য ৭ পর্যন্ত গোনা তখন সহজ হয় যখন তারা এক নজরে ৪টি বস্তুর একটি দলকে চিনতে পারেন এবং তারপর ৫, ৬ ও ৭ নম্বর বস্তু গণনা করি।
গণনা করা আসলে কোনো সহজাত বিষয় নয়, বরং তা এক অর্জিত দক্ষতা। কুকুর বা শিম্পাঞ্জির মতো যেসব প্রাণী ৪ বা ৫ পর্যন্ত ‘গুনতে’ পারে। এদেরও অসামান্য প্রতিভাধর মনে করা হয়। ফলে বাস্তব পৃথিবীর ওপর গণনার এসব বিমূর্ত সংখ্যাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব বা উত্তেজনা তৈরি করে।
কাগজে-কলমে করা গণিতের এসব বিমূর্ত ধারার আরও অনেক সমস্যা রয়েছে। কার তার ২ আর ২ সমান ৫ ধারণাটিকে বাস্তব এক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কীভাবে পরিসংখ্যানগত বিভিন্ন মডেল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষতি করতে পারে।
“যখনই আপনি আইকিউ, আগ্রাসনের মাত্রা বা আবেগ মাপার স্কোরের মতো কোনো গাণিতিক কাঠামো তৈরি করেন তখন মনে রাখা জরুরি যে, এসব স্কোরের বৈশিষ্ট্য সবসময় বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক প্রতিফলন নাও ঘটাতে পারে।”
কার বলেছেন, গণিতের বিভিন্ন প্রয়োগের ভালো ও মন্দ দিক নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হলে মানুষের জীবনে গণিতের প্রভাব সম্পর্কে আরও গভীর ও সমালোচনামূলক চিন্তার সুযোগ তৈরি হবে।
“এ ধরনের চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ আমরা মূলত সবকিছুকেই এখন ডেটায় রূপান্তর করছি।” যেমন সিনেমার জন্য রয়েছে ‘টমেটো মিটার’, পডকাস্টের জন্য ‘স্টার রেটিং’ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছেয়ে আছে নানা ধরনের অনুপাত বা রেশিওতে।
“আমরা যদি এমন এক পৃথিবীতে বাস করতে চাই যা পুরোপুরি অ্যাপনির্ভর তবে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, এসব গাণিতিক হিসাব আসলে সেভাবেই কাজ করছে যেভাবে আমরা ভাবছি।”