Published : 08 Jul 2026, 11:04 PM
দেশের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নেওয়া হবে না।
বুধবার ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন, “সংস্কারের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। দেশের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
“জনগণের আকাক্ষার সঙ্গে কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নেওয়া হবে না এবং জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হবে।”
রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে তা বাস্তবায়নে জনমত নিতে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য থেকে নির্বাচিত সদস্যরা শপথ নিলেও বিএনপির বিজয়ীরা সেই শপথ নেননি। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে।

এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর জোট গণভোটের রায় বাস্তবায়নে দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে।
অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং সকল গণহত্যার বিচারের দাবিতে আযোজিত সেমিনারে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, “গত সাড়ে ১৭ বছরে দেশের মানুষ হত্যা, গুম, নির্যাতন, পঙ্গুত্ব ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছে। অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে জাতির জন্য একটি বড় সুযোগ।”
বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত, শহীদ ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দলের সে দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “দেশের জনগণের সঙ্গে বারবার প্রতারণা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছানোর পর জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়। এতে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।”
বিএনপি জুলাইয়ের আন্দোলন ও জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক ধারার বাইরে ঠেলে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ তুলেছে জোটের অন্যতম নেতা মামুনুল হক।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক। জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বরং সুপরিকল্পিতভাবে সেই চেতনাকে দুর্বল করার নানা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”
অতীতে বহু স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে থাকার কথা তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, “আন্দোলনের পর ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি অনেক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ফলে বারবার আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

“এবার আমরা শুধু কারও ওপর নির্ভর করে বসে নেই; আমরা আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলছি।”
সেমিনারে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা লক্ষ্য করছি, সরকার রাষ্ট্রপতির আদেশে নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ না করে সংসদে সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে শুধুমাত্র সংবিধান সংশোধনের নামে একটি বিল আনার চেষ্টা করছে।
“প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির আদেশে নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ আইনগতভাবে কতটা বৈধ?”
জামায়াত জোটের মূল দাবি একটাই, এক কথা তুলে ধরে দলের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, “গণভোটের গণরায় অবশ্যই মানতে হবে। জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা উপেক্ষা করার কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক অধিকার কারো নেই।”
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করে জনগণকে আশ্বস্ত করেছিল যে তারা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থারও মৌলিক সংস্কার চায়।
“অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বসার পর থেকেই রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি ধীরে ধীরে আপত্তি জানাতে শুরু করে। মুখে তারা সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিরোধিতা করেছে।”

সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি আগেও বলেছি, আজও বলছি- চারদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
“আমরা যদি আপনার সমালোচনা করি, তা প্রকাশ্যেই করি। কিন্তু আপনার আশেপাশে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা প্রকাশ্যে নয়, গোপনে আপনার এবং দেশের ক্ষতি করছেন। তাদের কেউ কেউ বিদেশি অর্থ ও পরামর্শে পরিচালিত হয়।”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে অলি আহমদ বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবেও আপনাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছি। আমি মনে করি, আপনার নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।”
সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম।
রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স-এর মাল্টিপারপাস হলে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে অন্যদের মধ্যে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার চৌধুরী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।