Published : 08 Jul 2026, 11:39 PM
“জোহরের নামাজের পর একে একে মাদ্রাসায় এসেছিল ছোট ছোট শিশুরা। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করছিল, কেউ নতুন পাঠ মুখস্থ করছিল। মুহূর্তের মধ্যে একটা বিকট শব্দ। পাহাড়ের মাটি আর কংক্রিটের দেয়াল একসঙ্গে ধসে পড়ে মাদ্রাসার ওপর।”
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মঙ্গলবার দুপুরে পাহাড়ধসের ঘটনাটি এভাবেই বর্ণনা করছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষক বেগম জাহান। তখন তিনি ছিলেন কক্ষের পশ্চিম পাশে।
“আমি পশ্চিম পাশে ছিলাম। পূর্ব পাশটাই চাপা পড়ে গেল। দ্রুত বের হয়ে আসতে পেরেছি। তখন সাতজনের মত শিক্ষক আর প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী ছিল।”
তার কণ্ঠে এখনও আতঙ্কের ছাপ। বলেন, “চোখের সামনে বাচ্চাগুলো মারা গেছে।”
ঘটনার সময় মাদ্রাসা থেকে কয়েক গজ দূরে ছিলেন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক সৈয়দ মোহাম্মদ। খবর পেয়েই উদ্ধারকাজে নেমেছিলেন তিনি।
সৈয়দ মোহাম্মদ বলছিলেন, “মাদ্রাসার পাশে কংক্রিটের একটা প্রতিরক্ষা দেয়াল ছিল। পাহাড়ের মাটি সেই দেয়ালটাকেও ঠেলে মাদ্রাসার ওপর ফেলে দেয়। উদ্ধার করতে গিয়ে দেখি অনেকের শরীরের অর্ধেক চাপা, একজন পুরো মাটির নিচে।”
কথা বলতে বলতে থেমে যান তিনি।
“বাচ্চাগুলো চোখের সামনে মারা গেছে ভাই। আমাদের ক্যাম্পের জীবনই এমন। কখন মরে যাই, কোনো ঠিক নেই।”
চার শিক্ষার্থী, এক শিক্ষক নিহত
বুধবার দুপুরে উখিয়ার ক্যাম্প-৫-এর এ-৩ ব্লকের ‘খাদিজাতুল কোবরা মহিলা হেফজখানা’ মাদ্রাসায় পাহাড়ধসের এই ঘটনায় শিক্ষকসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন শিক্ষার্থী। আহত হয়েছেন আরও অন্তত আট শিক্ষার্থী।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান রাত সাড়ে ৯টায় বলেন, “ভারি বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পাশের প্রতিরক্ষা দেয়ালের ওপর পড়ে। দেয়ালটি ভেঙে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি মাদ্রাসা ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে।”
তিনি বলেন, ঘটনাস্থলেই এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন শিক্ষকসহ আরও চারজন মারা যান।

“ঘটনার সময় ঠিক কতজন শিক্ষার্থী ক্লাস করছিল, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ৩০ জনের বেশি ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। আহত আট শিক্ষার্থী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।”
দুর্ঘটনার পর সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সব লার্নিং সেন্টার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
নিহতদের পরিচয়
ক্যাম্প-৫-এর ক্যাম্প ইনচার্জ মোহাম্মদ আবদুর রউফ নিহতদের পরিচয় জানিয়েছেন।
তারা হলেন- ক্যাম্প-৫-এর এ-১১ ব্লকের হাশিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), ক্যাম্প-৩-এর এফ-১ ব্লকের আবদুস শুকুরের দুই মেয়ে উম্মে নেজাতুল (১৩) ও উম্মে সালমা (১২), ক্যাম্প-৫-এর এ-৮ ব্লকের মোহাম্মদ ইলিয়াসের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩) এবং ক্যাম্প-৩-এর শামসু আলমের মেয়ে শাহিদা।
ক্যাম্প ইনচার্জ আবদুর রউফ বলেন, “ক্লাস চলার সময়ই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। মাদ্রাসাটি রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উদ্যোগে পরিচালিত হতো।”
১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয় জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় জেলায় ৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, আগামী দুই থেকে তিন দিন, অর্থাৎ ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতি বর্ষায় একই আতঙ্ক
বর্ষা এলেই পাহাড়ধসের ঝুঁকি নতুন নয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঘনবসতির এসব ক্যাম্পে প্রতিবছরই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ক্যাম্পের মাঝি ছব্বির আহমদ বলেন, “এক বিভীষিকাময় জীবন পার করছি। এক মৃত্যু থেকে বাঁচতে এসে প্রতি বর্ষায় আরেক মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে থাকতে হয়।”

তিনি বলেন, বুধবারের এই দুর্ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই আবারও বাস্তবে রূপ দিল। কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের ওপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নেমে আসে পাহাড়। যে মাদ্রাসা থেকে বিকালে পাঠ শেষে ঘরে ফেরার কথা ছিল, সেখান থেকেই কয়েকজন শিশুর নিথর দেহ ফিরে গেছে পরিবারের কাছে।
এর আগে রোববার রাতে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। প্রবল বর্ষণে আলাদা পাহাড় ধসে আট রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্যও ছিলেন। আহত হন আরও বেশ কয়েকজন।
আরও পড়ুন:
উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ফের পাহাড় ধস, নিহত ৫
একরাতে নয়জনের প্রাণহানি: ‘মৃত্যু বুকে নিয়েই ঘুমায়’ সাড়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গা