Published : 09 Jul 2026, 12:33 AM
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মান সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস (১৯২৭-২০১৫)। তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার ও ভাস্কর। ‘টিন ড্রাম’ বা ‘দ্য ফ্লাউন্ডার’-এর মতো সব উপন্যাসের এই রূপকারকে আমরা সাধারণত চিনি বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়ানো এক গম্ভীর, চশমাপরা বুদ্ধিজীবী হিসেবে। কিন্তু এই চেনা অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল নিখাদ, ছটফটে ফুটবলপাগল এক মানুষ।
তিনি ছিলেন টেলিভিশনের স্পোর্টস শো ‘স্পোর্টসশাউ’-এর সামনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকা দর্শক, কিংবা ফ্রাইবুর্গের গ্যালারিতে নাতনিকে নিয়ে চিৎকার করা সাধারণ কোনো ভক্ত। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি নিজের জীবন, রাজনীতি আর সাহিত্য দর্শনের সঙ্গে ফুটবলকে বুনে দিয়েছিলেন অমোঘ শিল্পে।
তার এই ফুটবল-প্রেমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই ২০২০ সালে জার্মানির ফুটবল মিউজিয়াম ও গুন্টার গ্রাস হাউজ যৌথভাবে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মাই ফুটবল সেঞ্চুরি’ বা ‘আমার ফুটবল শতাব্দী’।
সেই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল ১৯৫৪ সালের জার্মানির প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সেই কিংবদন্তিতুল্য ‘মিরাকল অফ বার্ন’-এর আসল ফুটবলটি, এমনকি ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করার সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের জার্মানির গোলপোস্টটিও! একজন লেখকের জীবনকে যে ফুটবল কতটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখতে পারে, গুন্টার গ্রাস তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
সবচেয়ে রূপকথার মতো শোনায় গুন্টার গ্রাসের ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পটা। সাধারণত ৫০ বছর বয়সে মানুষ যখন মাঠের ধার ঘেঁষে এসে আয়েশ করার কথা ভাবে, গ্রাস তখন নতুন করে বুট জোড়া পায়ে গলিয়ে নেমে পড়েছিলেন মাঠের ঠিক মাঝখানে! এর পেছনে অবশ্য হাত ছিল তার ৬ বছর বয়সি ছোট ছেলে ব্রুনোর।
গ্রাস তখন সপরিবারে জার্মানির প্রত্যন্ত এক মফস্বল গ্রাম, এলবে নদীর তীরের ওয়েভেলসফ্লেথে গিয়ে আস্তানা গেড়েছেন। সেখানে গিয়ে ছোট ব্রুনো স্থানীয় এক ছোট ফুটবল ক্লাবে ভর্তি হয়ে যায়। ছেলেকে মাঠে নিয়ে যেতে যেতেই বুড়ো বাপের মনের ভেতরেও ঘুমিয়ে থাকা ফুটবলার সত্তা আচমকা জেগে ওঠে। ব্যস, পঞ্চাশের কোঠায় পা দেওয়া গুন্টার গ্রাস নাম লিখিয়ে ফেললেন ওই ক্লাবেরই ‘প্রবীণ’ বা ওল্ড-বয়েজদের দলে।

তা মাঠে কোন পজিশনে খেলতেন এই বিশ্বখ্যাত লেখক? নিজেই এক সাক্ষাৎকারে রসিকতা করে বলেছিলেন, “আমি তো আজীবন বামপন্থী চিন্তাধারার মানুষ, তাই ফুটবল মাঠেও আমার পজিশনটা ছিল অবধারিতভাবে বাঁ-দিকের উইং বা লেফট উইঙ্গার!” প্রথম ম্যাচেই অবশ্য বুড়ো হাড়ের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় মাঠে দাপিয়ে বেড়ানোর পর টানা চার দিন ফোলা হাঁটু নিয়ে বিছানায় কাটাতে হয়েছিল নোবেলজয়ী এই লেখককে।
কিন্তু তাতে কী! গ্রাসের গর্বের শেষ ছিল না। কারণ তার ছেলে ব্রুনো বন্ধুদের কাছে বুক ফুলিয়ে বলত, “আমার বাবার বাঁ পায়ের ক্রসগুলো কিন্তু একদম জার্মানির বিশ্বসেরা রাইট-ব্যাক ফিলিপ লামের মতোই নিখুঁত!”
গুন্টার গ্রাস ফুটবলকে কেবল দু-দণ্ডের বিনোদন বা বল আর পায়ের কসরত মনে করতেন না। তিনি এই খেলার পেছনের সমাজনীতি ও রাজনীতিও খেয়াল করতেন। ফুটবলের আধুনিক বাণিজ্যিকীকরণ আর টাকার অহংকারকে তিনি অপছন্দ করতেন। ২০০৬ সালের জার্মান বিশ্বকাপের ঠিক আগে এক সাক্ষাৎকারে ফিফা ও ফুটবল ক্লাবগুলোর অতি-মুনাফালোভী আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখিয়েছিলেন তিনি।
গ্রাস বলেছিলেন, “ফুটবলের এই অতি-বাণিজ্যিকীকরণ আমার কাছে ভীষণ ভয়ানক মনে হয়। জার্মানির ফার্স্ট বা সেকেন্ড ডিভিশনে এখন আর কোনো সুস্থ ও ফেয়ার কম্পিটিশন অবশিষ্ট নেই। টাকার জোরে বড় বড় দলগুলো লিগগুলোকে একঘেয়ে বানিয়ে দিচ্ছে।”
ফিফাকে তিনি সরাসরি ‘কাপুরুষ’ আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, “তারা ফুটবলকে সাধারণ মেহনতি মানুষের খেলা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে করপোরেট পুঁজিপতিদের মস্ত বড় ব্যবসায় রূপান্তর করেছে।” এই পুঁজিবাদী ফুটবলের বিপরীতে গ্রাস আজীবন ভালোবেসে গেছেন ছোট, লড়াকু এবং ঐতিহাসিকভাবে এন্টি-ক্যাপিটালিস্ট বা পুঁজিবাদ-বিরোধী দলগুলোকে; যার মধ্যে অন্যতম ছিল এসসি ফ্রাইবুর্গ এবং হামবুর্গের সেন্ট পলি ক্লাব।
সেন্ট পলি ক্লাবের সমর্থকেরা যখনই কোনো আর্থিক সংকটে পড়ত, এই নোবেলজয়ী লেখক তাদের সাহায্য করতে ছুটে যেতেন। শোনা যায়, একবার ক্লাবের ফান্ড সংগ্রহের জন্য খোদ সেন্ট পলির ফুটবল মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের লেখা গল্প পড়ে শুনিয়েছিলেন এই লেখক, আর সেই টিকেট বিক্রির টাকা তুলে দিয়েছিলেন ক্লাবের হাতে!

খেলোয়াড়দের মধ্যে তার পছন্দও ছিল সাধারণের চেয়ে আলাদা। তিনি জিনেদিন জিদান কিংবা রোনালদোর মতো মহা-তারকাদের চেয়ে বেশি মুগ্ধ হতেন জর্জিয়ার ফরোয়ার্ড আলেকজান্ডার ইয়াশভিলির খেলায়। ইয়াশভিলি যখন বুন্দেসলিগায় খেলতেন, গ্রাস তার খেলা মন দিয়ে দেখতেন। কেন প্রিয় ছিলেন তিনি? গ্রাসের ভাষায়, “ইয়াশভিলি যখন গোল করে, গোল করার ঠিক পরের মুহূর্তটাতেও তার মুখের অবয়বে মায়াবী বিষণ্নতা খেলা করে। একজন খেলোয়াড়ের এই ম্যালানকোলিক রূপ আমার ভেতরের শিল্পীমনকে নাড়া দেয়।”
বড় বড় ক্লাবগুলোর দেদারসে টাকা উড়িয়ে দামি খেলোয়াড় কেনার প্রবণতাকেও তিনি ছাড়তেন না। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড যখন টাকা খরচ করে তখনকার তরুণ তারকা ভ্লাদিমির বুটকে দলে ভেড়ায়, গ্রাস তখন ডর্টমুন্ডের খেলা দেখে মনঃক্ষুণ্ন হলেন। রসিকতা করে নিজের লেখা উপন্যাস ‘ডের বুট’-এর নাম টেনে এনে তিনি বলেছিলেন, “ওরা এত দামি খেলোয়াড় ‘বুট’ কিনেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারছে না, কারণ দলটায় কোনো ছন্দ নেই। তার চেয়ে তো আমার নিজের ‘বুট’ (উপন্যাস) অনেক ভালো!”
গুন্টার গ্রাস ফুটবলকে ব্যবহার করেছিলেন যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির ক্ষতবিক্ষত জাতীয় পরিচয় ও মনস্তত্ত্বের এক অমোঘ রূপক হিসেবে। ১৯৫৪ সালের সেই বিখ্যাত বিশ্বকাপ ফাইনাল, যেখানে হাঙ্গেরিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে পশ্চিম জার্মানি প্রথমবার বিশ্বজয়ী হয়েছিল, তাকে গ্রাস তার সাহিত্যে তুলে এনেছিলেন মহাকাব্যিক মোড় হিসেবে।
নাৎসিবাদের অন্ধকার আর বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরো অপরাধবোধে জর্জরিত জাতি কীভাবে একটা ফুটবল ম্যাচের হাত ধরে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল- তাকে গ্রাস ফুটিয়ে তুলেছিলেন পরম মমতায়। তার ‘মাই সেঞ্চুরি’ উপন্যাসের চরিত্ররা প্রশ্ন তোলে- যদি সেদিন হাঙ্গেরির সেই শেষ মুহূর্তের গোলটা রেফারি বাতিল না করতেন, আর জার্মানি হেরে মাঠ ছাড়ত, তবে কি আজকের এই আধুনিক জার্মানি কোনোদিন গড়ে উঠতে পারত?
আবার ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে যখন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিকভাবে দুই টুকরো হওয়া পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানি মুখোমুখি হয়েছিল, সেই ম্যাচটিকেও গ্রাস তার গল্পে রাজনৈতিক চশমায় দেখেছিলেন। এক কারাবন্দি চরের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে গ্রাস দেখিয়েছিলেন, কীভাবে সেই চর জেলের ভেতর বসে উরুগুইয়ান রেফারির প্রতিটি সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে আর ভাবছে- সে আসলে নিজের কোন টুকরো জার্মানিকে মনে মনে সমর্থন করবে!
ফুটবল আসলে কেবল একটা চামড়ার বলের পেছনে ২২ জন মানুষের ছুটে চলা নয়; ফুটবল হলো সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস আর মানুষের ভেতরের আদিম আবেগ-অনুভূতির জীবন্ত কোলাজ। সবুজ মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে ফুটবলের এই মানবিক ও দার্শনিক রূপটিই গুন্টার গ্রাসকে ফুটবল বিশ্বের এক চিরকালীন ‘লেফট উইঙ্গার’ বানিয়ে রেখেছে।
সূত্র: সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য ওয়েল্ট।