Published : 09 Jul 2026, 01:53 AM
বাসায় নিঃসঙ্গ এক মায়ের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের ‘অবহেলা’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও মামলা হয়েছে অপমৃত্যুর। খোদ এক সন্তানের করা ওই মামলার তদন্ত বলতে পুলিশ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
অভিযোগ নিয়ে সন্তানরা ‘মুখ খুলতে চান না’ এখনো, সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর স্বপ্রণোদিত হয়ে পাঠানো উকিল নোটিসের জবাবও এড়িয়ে গেছেন ‘কৌশলে’।
এমনকি শুরু থেকে সন্তানরা তরফে তদন্তে ‘সহযোগিতা করা হচ্ছে না’ বলেও দাবি পুলিশের। তবে পারিপার্শ্বিক বিবেচনায় পুলিশ শুরুতে বলেছিল, সন্তানদের ‘স্পষ্ট অবহেলা’ ছিল।
যাদের বিরুদ্ধে মায়ের প্রতি ‘দায়িত্ব পালনে অবহেলার’ অভিযোগ, এখন প্রশ্ন তাদেরই একজনের করা অপমৃত্যুর মামলার তদন্তে অভিযোগ যাচাই হবে কীভাবে?
ঢাকার পল্লবী থানার পরিদর্শক এমদাদুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। আমরা এখনো ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাইনি।
“রিপোর্ট পাওয়ার পর সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তখন সিদ্ধান্ত হবে, এই ঘটনায় নিয়মিত মামলা হবে কি না।”
এখন পর্যন্ত তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ময়নাতদন্তের রিপোর্টের পর আমরা সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে একটা ফাইনাল রিপোর্ট দিব। এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
“আর বিষয়টা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় অবগত আছেন, কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটা সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।”
গত ৩১ মে জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগম নামে সত্তরোর্ধ্ব এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘরভর্তি ময়লা-আবর্জনার স্তূপের মাঝখানে ছোট একটি খাটের ওপর থেকে ওই নারীর নিথর দেহ উদ্ধারের পর পুলিশ বলেছিল, তিনি কবে মারা গেছেন সন্তানরাও বলতে পারেন না। বহুতল ভবনের চতুর্থ তলায় মেয়ের বাসার একটি কক্ষে দীর্ঘদিন ধরে নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করে আসছিলেন তিনি।
প্রয়াত এই নারীর বড় ছেলে যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান, ছোট ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান এবং মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা মিরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক।
এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গেল ৩ জুন নূরজাহান বেগমের সন্তানদের উকিল নোটিস পাঠান সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। একই দিন সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করেন আরেক আইনজীবী।
অন্যদিকে প্রয়াতের ছেলে এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য এ কে এম আনিসুর রহমানকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে সরকার।
ঘটনার মাস পেরিয়ে ‘অবহেলার অভিযোগের’ বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার বৃদ্ধার ছোট ছেলে, বুয়েট শিক্ষক আশিকুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, বিষয়টা কিছুটা ‘আলোচনার বাইরে’ থাকায় এখন এ নিয়ে কথা বলে আবার আলোচনায় আনতে চান না।
তার ভাষ্য, “জিনিসটা তো একটু ইয়েতে আছে, হয়তো কিছু তথ্য দিলাম…আমার মনে হয় যে, আমরা আরেকটু কয়েকটা দিন অপেক্ষা করি।
“তারপরে আমরা আবার ডিটেইল আলাপ করব, অসুবিধা নাই। এখন কয়েকদিন একটু সময় দেন আমাদেরকে, আমরাও একটু গুছিয়ে উঠতেছি।”
যোগাযোগ করা হলে প্রয়াতের বড় ছেলে যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান রোববার সকালে বলেন, তিনি এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন।
এরপর দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।
যে কারণে অবহেলার অভিযোগ
পল্লবীর ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর।
ঘরজুড়ে আবর্জনার স্তূপের বিষয়টি জানিয়ে পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বলেছিলেন, বৃদ্ধার রুমের নোংরা পরিবেশের যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, পুরো ফ্ল্যাটটাই ওইরকম নোংরা। বাসাটিতে এতো দুর্গন্ধ ছিল, কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে ওইরকম জায়গায় বসবাস করা সম্ভব না।
তার ছেলে আশিকুর রহমানও নোংরা পরিবেশের কারণেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার বিষয়টি ‘স্বীকার করেছেন’। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি এখনই।
ঘটনার পর পুলিশ বলেছিল, লাশ উদ্ধারের সময় তারা নূরজাহান বেগমের ডান চোখে ‘সাদা ফাঙ্গাসের মতো’ দেখেছেন। এমনকি লাশে পোকার উপস্থিতিও পেয়েছেন। এ থেকে তারা ধারণা করেছেন, ওই বৃদ্ধা ‘সন্তানদের অজ্ঞাতসারে’ মরে পড়েছিলেন।
পুলিশ বলেছে, ভবনটির মালিক নূর জাহানের মেয়ে ফাতিমা নাসরীনের। ফাতিমার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ২০১৭ সালে মারা যান। স্বামীর মালিকানা সূত্রে পাওয়া ওই ফ্ল্যাটেই মাকে নিয়ে থাকতেন তিনি।

স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান ফাতিমার জীবন আরো অগোছালো হয়ে পড়ে বলে ধারণা প্রতিবেশীদের। তাদের ধারণা, ‘নিঃসঙ্গতা কাটাতে’ ভাই আশিকুরের বাসা থেকে ২০২৪ সালে মাকে নিজ বাসায় নিয়ে আসেন ফাতিমা। এরপর মা-মেয়ের জীবন ‘আরো অগোছালো ও বিচ্ছিন্ন’ হয়ে পড়ে।
৩১ মে তার মেয়ে মাকে ডাকতে গেলে সাড়া না পেয়ে পার্শ্ববর্তী ক্লিনিক থেকে নার্স ডেকে নেন। তিনি ভেবেছিলেন, তার মা অসুস্থ। পরে নার্স বাসায় এসে দেখতে পান—তিনি মারা গেছেন। এরপর ওই নার্স বের হয়ে লোকজনকে বিষয়টি জানান; তখন জাতীয় জরুরি সেবায় ফোন পেয়ে পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে।
পরদিন ১ জুন ময়নাতদন্তের পর নূরজাহানের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।
সেদিনই মেয়ে ফাতিমা পল্লবী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। মামলার এজাহারে তিনি লেখেন, তার মা ‘বার্ধক্য জনিত কারণে অগোচরে অসুস্থ হয়ে’ মারা গেছেন। মায়ের মৃত্যুর বিষয়ে তার ও তার পরিবারের কারো প্রতি কোনো ‘অভিযোগ বা সন্দেহ নাই’ বলেও লেখেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার পল্লবীর ওই বাসার সামনে গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় ফাতিমার সঙ্গে। ফোন করে দেখা করতে চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। কথা বলতে চাইলে ‘কোনো কথা নেই’ বলে ফোন কেটে দেন।
তবে বাড়ির ভাড়াটিয়া এক নারী বলেন, তারা তিন বছর ধরে এই বাসায় থাকলেও কখনোই ফাতিমা বা তার মা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে তার কথা হয়নি। মাঝেমধ্যে ফাতিমাকে বাসায় নামতে-উঠতে দেখেছেন, অন্য ভাড়াটিয়ারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করলেও ফাতিমাকে কখনোই কারো সঙ্গে কথা বলতে দেখেননি। লাশ উদ্ধারের আগে ওই বৃদ্ধার অসুস্থতা বা অস্বাভাবিকতার বিষয়েও কিছু জানতেন না তারা।
“আগে তো কথাবার্তা হইতো না, মেয়ে উঠতো আর নামতো। ঘটনার পর এখন সামনে পড়লে মুখটাও ঘুরায়ে ফেলে। দেখে নাই ভাব নিয়া দৌড়াইয়া চলে যায়।”
বাজার-সদাই করতেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মাঝেমধ্যে হাতে করে কিছু নিয়ে যেতেন। কিন্তু যা নিত, সব ময়লা বাসাতেই থাকতো। বাসার যা অবস্থা পরে দেখলাম, কোনোদিন বোধ হয় ময়লা ফেলে নাই।”
লাশ উদ্ধারের দিন চারেক আগে কোরবানি ঈদের দিন বৃদ্ধার এক নাতিকে খাবার নিয়ে আসতে দেখেছেন দাবি করে ওই নারী বলেন, “মনে হয় দোষ কাটানোর জন্য ঈদের দিন খাবার নিয়া আসছে। নাতিতো বড় মানুষ, সে দেখে নাই তার দাদুর বাসার কী অবস্থা! সে তো বাসায় গিয়া বাবারে বলতে পারতো।”
সন্তানদের গাফিলতি বা অবহেলার প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি আরো বলেন, “অবশ্যই গাফিলতি আছিল, নইলে মা-রে কেউ এমন জায়গায় রাখে? তারা লেখাপড়া শিখে বড়ই হইছে, মানুষ হয় নাই। মাটাও বোধ হয় কম কষ্ট থেইকা এইখানে আইসা থাকে নাই।
“কষ্ট পাইয়া হয়তো ওই বয়স্ক মহিলা মনে করছে, মরলে আমার মাইয়ার কাছে গিয়াই মরি! এগোর বিচার কে করবে? এহন আল্লায় যদি বিচার করে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃদ্ধার সন্তান আশিকুর রহমানকে ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রায় সপ্তাহব্যাপী চেষ্টা করা হয়। একাধিকবার কল করে ও বার্তা পাঠানোর পর অবশেষে শুক্রবার সাড়া দেন।
তিনি বলেন, “আমরা ওই রিকভার করতেছি ধীরে ধীরে, মানে একটা পর্যায়ে…আপনার সাথে আবার আমরা আলাপ করব অসুবিধা নাই।”
অভিযোগের কথা তুলতেই তিনি বলেন, “আপনার যে রকম কনফিউশন এখানে, কোনো কিন্তু নাই। নিজের মার প্রতি এমন থাকার কোনো প্রশ্নই উঠে না।
“মানুষের মা তো মারা যায়, এটা একটু নোংরা ছিল, জিনিসটা ইয়ে হয়ে গেছে। আর কিছু নাই। সমস্ত কিছু আপনাদের সাথে আলাপ করা যাবে, সময় দেন আমরা গুছিয়ে ফেলব।”
বাসার এমন পরিস্থিতিতে বোনের মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। এ বিষয়ে ভাই আশিকুর বলেছেন, তিনি চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করেছেন, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
“ওর সাথে তো কথা বলতাম, মোটামুটি সবই তো ঠিক ছিল। তো এরকম যে হইতে পারে আমি কিছুই জানতাম না। আমি একটু আপনাদের কাছ থেকে সময় নিচ্ছি, আপনার সাথে আবার পরে আলাপ করব।”
পল্লবী থানার এক কর্মকর্তা বলেছেন, সন্তানরা পুলিশের কাছেও মুখ খুলছেন না। প্রথম দিন থেকে কোনো তথ্য দিয়ে সহায়তা করেননি।
“এমনই ওরা, আমাদের সাথেও এমনই করে, হেল্প করে না। আমরা তো ভাবছি শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু মিল নাই, তারা মুখ খোলে না। প্রথমদিন মেয়ের কাছ থেকে তার ভাইয়ের নম্বর পাইতে আমাদের অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হইছে। অনেকবার বলার পর সিটিসেল নম্বর দিছে, তার মানে কি ভাইদের সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ হয় না?”
ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “অবশ্যই সন্তানদের অবহেলা ছিল, নইলে এমন বাসায় কেউ মাকে রাখে নাকি। বৃদ্ধাশ্রমে দিলেওতো তাদের মা এরচেয়ে ভালো থাকতো। এদের বিচার হওয়া উচিৎ। কিন্তু সেটা কীভাবে হবে, সিদ্ধান্তটা সরকারের।”
জবাব আসেনি উকিল নোটিসের
নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, ভরণ-পোষণ ও আইনগত কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়ে তার সন্তানদেরকে উকিল নোটিস পাঠানো হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি ৩ জুন এই নোটিস পাঠান। সেদিন এই আইনজীবী বলেছিলেন, নোটিস পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
এর ব্যতয় হলে জনস্বার্থে এবং প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং উচ্চ আদালতের নজরে আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি ২৬ জুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তার সন্তানেরা আরেক আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত জবাব পাঠিয়েছেন।

“যে লিখিত জবাবে লিখছে, একই বিষয়ে হাই কোর্টে একটা রিট করা হয়েছে এবং তারা ওইটা মোকাবেলা করতেছে। তারা সেখানেই সকল ধরনের বক্তব্য পেশ করবে, যেহেতু একই বিষয়। আমরা একটা রিট করতে চেয়েছিলাম, ইতোমধ্যে তো আরেকজন রিট করছেন। যেহেতু অলরেডি রিট চলমান, ডাবল রিট করার প্রয়োজন হয় না।”
৩ জুনই তার সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে আইনজীবী শরীফ সরকারের পক্ষে ‘জনস্বার্থে’ রিট আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।
৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ‘কেয়ারগিভার’ নিয়োগের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে সেই আবেদনে।
আবেদনে তিনি বলেন, নূরজাহান বেগমের মরদেহ নিজ ফ্ল্যাটে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ৭ দিনেরও বেশি সময় পড়ে থাকার পর পচন ধরা অবস্থায় উদ্ধার হয়। এটি সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
আবেদনে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে নূরজাহানের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান, মানবাধিকার কমিশনকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার ও বৃদ্ধ ও অক্ষম নাগরিকদের জন্য কেয়ারগিভার নিয়োগে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না, জানতে চেয়ে রুল জারির আরজি জানানো হয়।
একইসঙ্গে অবহেলার কারণে মৃত্যুর অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশ মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও পল্লবী থানার ওসিকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েও রুল জারির প্রার্থনা করা হয় আবেদনে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ৯ জুন শুনানি শেষে আদালত একটা রুল জারি করেছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি বৃদ্ধ ও অক্ষম নাগরিকদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে কেয়ারগিভার বা নার্স প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও নিয়োগের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা রুলে জানতে চেয়েছে হাই কোর্ট।
একই রুলে ওই বৃদ্ধার মৃত্যুর ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত না করাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার নেতৃত্বে ৩ সদস্যের কমিটি গঠনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, আইন সচিবের কাছে এর ব্যাখ্যাও চেয়েছে হাই কোর্ট।
আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী ২৬ জুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই বিষয়টাই কোর্টকে আমি বলেছি যে দেখেন, এই বিষয়টাকে অ্যাড্রেস করার মত কেউ নাই। কারণ অভিযোগটা হচ্ছে উনার সন্তানদের বিরুদ্ধে। আর যিনি ভিক্টিম, উনি মারা গেছেন।
“এখন এটা আমরা যদি না আনি, অন্য কেউ আর আনবে না। যদি কোনো অর্ডার না দেন, এটা আগামী সাত দিনের মধ্যে কিছু একটা ঘটনা ঘটে যাবে, আর এই আলোচনাটা ফেইড হয়ে যাবে।
“এখন একটা অপমৃত্যুর মামলা চলতেছে, অপমৃত্যুর মামলায় ওখানে যদি তদন্তে কোনো অবহেলাই পেয়ে যায়; তাহলে অপমৃত্যু থাকবে না, তখন তো পুলিশ আদালতে জানাবে। মৃত্যুটা হত্যাজনিত বা অবহেলাজনিত হলে পুলিশই মামলা করবে।”
আর তেমন কিছু না হলে আবারো শুনানি করে বিষয়টি আদালতের নজরে আনার কথা বলেছেন এই আইনজীবী।
অভিযোগের বিষয়গুলো আইনিভাবে মোকাবিলা করছেন কি না, জানতে চাইলের বৃদ্ধার সন্তান আশিকুর একইভাবে পরে আলাপ করার কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, “কাজ জমে গেছে অনেকগুলো, এই কাজগুলো মিলিয়ে সব মিলিয়ে আমাদেরকে একটু সময় দেন।”
আইন কী বলে
বাংলাদেশের সামাজিক রীতি অনুযায়ী, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে সাধারণত ছেলে-মেয়েরাই দেখাশোনা করেন।
তবে এ নিয়ে নানান অভিযোগের কারণে ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ করে সরকার। প্রায় ১০ বছর পর ২০২৩ সালে আইনে অনুসারে একটি বিধিমালা করা হয়েছে।
ওই আইনে প্রত্যেক সন্তানকে তার বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণ তথা- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও সেবা প্রদানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
কোনো বাবা-মায়ের একাধিক সন্তান থাকলে সেক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে মা-বাবার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে।
আইন অনুযায়ী, বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে বাবা-মায়ের সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না।
চাকরি বা অন্য কোনো কারণে সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে অবস্থান করলে নিয়মিত খোঁজ-খবর নেওয়া এবং দেখা-সাক্ষাৎ করার কথা বলা হয়েছে।
কোনো বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করলে ‘যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ’ অর্থ নিয়মিত প্রদান করবে।
আইন অনুযায়ী, ছেলে-মেয়ের অনুপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা তাদের বৃদ্ধ দাদা-দাদি বা নানা-নানির দেখাশোনা করবেন।
কেউ এই আইন না মানলে তাকে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা জরিমানা বা অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
কোনো সন্তানের স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের কেউ যদি এই আইন বাস্তবায়নে বাধা দেন, তাহলে তিনি একই শাস্তি ভোগ করবেন বলে আইনে বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি বলেছেন, “বাবা-মা অসুস্থ থাকলে প্রতিনিয়ত সন্তানদের দেখা-শোনা করার কথা। সেটা সন্তান করছে কি না বা প্রত্যেকটা ব্যক্তির যতটুকু করণীয় সেটা করেছে কি না; যদি সে না করে থাকে, তাহলে এখানে অবহেলাজনিত বিষয় থাকতে পারে।
“অবহেলা থাকলে স্পষ্টভাবে সেটা পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনের লঙ্ঘন। এখানে আইনের বিষয়গুলো ভালো প্রচার করা প্রয়োজন। ধরেন অনেকে জানেও না যে, এমন একটা আইন আছে। কিন্তু আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন না করলে সন্তানকে বাধ্য করা যাবে।”
মা-বাবার ভরণ-পোষণ আইনে সারাদেশে অল্পকিছু অভিযোগ পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগই আপস হয়ে যায় বলে জানান এই আইনজীবী।
রাখি বলেন, “আইনেই আপসের বিধান রয়েছে। বাবা-মা আর সন্তানের মধ্যে এটা তো আপসেই যাবে বেশিরভাগ, এটা স্বাভাবিক। এক্সট্রিম লেভেলে না গেলে তো আর এটা ওই পর্যায়ে পৌঁছে না।”