Published : 23 Apr 2026, 04:50 PM
জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বর্তমানে ৫০। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর ১৯৭২ সালে যখন সংবিধান রচনা করা হয়, তখন নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসন রাখা হয়েছিল ১৫টি। পরে ধাপে ধাপে এই সংখ্যা পঞ্চাশে উত্তীর্ণ হয়। সবশেষ ২০১৮ সালে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে আরও ২৫ বছর তথা ২০৪৩ সাল পর্যন্ত সংসদে নারীদের জন্য এই ৫০টি আসনে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
এরশাদের শাসনামলে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ছিল ৩০। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে ৩০ জন নারীকে সংসদের সংরক্ষিত আসনে মনোনীত করার পরে ওই সময়ের সাপ্তাহিক যায়যায়দিন শিরোনাম করেছিল: ‘সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার!’ এই সময়ের বাংলাদেশে কোনো সংবাদমাধ্যম সংসদের সংরক্ষিত ৫০ জন নারীকে ৫০ সেট অলঙ্কার বলে উল্লেখ করতে পারবে কি না, সেটি অন্য তর্ক। তবে সংসদের এই সংরক্ষিত আসনগুলো আসলেই আলঙ্করিক কি না বা এই সংরক্ষিত আসনগুলোয় ‘কোটা পদ্ধতিতে’ নারীদের নির্বাচিত (মনোনীত) হওয়াটা আদৌ তাদের জন্য সম্মানজনক কি না, সেই প্রশ্ন বেশ পুরোনো। তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, সংরক্ষিত আসনে যারা সংসদ সদস্য হন, তাদের অনেকেই এই চেয়ারে বসার সুযোগ পান তাদের বাবা ও স্বামীর পরিচয় তথা পারিবারিক কারণে। ফলে নারীর নিজের যোগ্যতা সেখানে ঢাকা পড়ে যায়। এমনকি রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাবা কিংবা স্বামীর পরিচয়কেই অনেক সময় বড় করে দেখানো হয়। এসবের মধ্য দিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরাও যে সাধারণ আসনের ৩০০ সংসদ সদস্যর মতোই মর্যাদা ও দায়িত্ববান, সেই বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। এই ৫০টি আসনকে ৫০ সেট অলঙ্কারের সঙ্গে তুলনা করার জনমনস্তত্ত্ব শক্তিশালী হয়।
এ বছর তথা ত্রয়োদশ সংসদের ৫০টি আসনের মধ্যে ৩৬টি পাচ্ছে বিএনপি জোট। এরই মধ্যে তাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও দলীয় মনোনয়ন পেতে ফরম সংগ্রহ করেছিলেন দুই হাজারের বেশি নারী। সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষে ৩৬ জনের নাম ঘোষণা করে সরকারি দল। বিএনপির তরফে বলা হচ্ছে, মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীর শিক্ষা, বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা এবং আইন-কানুন সম্পর্কে তাদের ধারণাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসবের বাইরে পারিবারিক পরিচয়ও যে অনেকের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনা হিসেবে কাজ করেছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এবার বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া কয়েকটি নাম নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। যেমন চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’র উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ফাহমিদা হকের বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা অনেককেই বিস্মিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ মনোনয়ন নিয়ে নানামাত্রিক আলোচনা হচ্ছে। অনেকের মনে প্রশ্ন, ফাহমিদা হকের মনোনয়ন পাওয়ার পেছনে কি তার স্বামীর প্রভাব কাজ করেছে নাকি তিনি নিজেই এটি অর্জন করেছেন? বলা হচ্ছে, ফাহমিদা হক অনেক দিন ধরেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং নানারকম সামাজিক কাজের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সুতরাং তিনি নিজের যোগ্যতাতেই বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু জনপরিসরে এই বিশ্বাসের চেয়ে তিনি যে তার স্বামীর পরিচয় বা স্বামীর প্রভাবের কারণে মনোনীত হয়েছেন—এই ধারণাটি প্রবল।
এ বছর আরও যেসব নারী বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদের মধ্যে আছেন বিএনপির সহপ্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক নেওয়াজ হালিমা আরলী। তিনি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের বোন। প্রশ্ন হলো, আরলী মনোনীত হয়েছেন তার নিজের যোগ্যতায় নাকি ভাইয়ের পরিচয়ে? তার মনোনীত হওয়ার পেছনে ভাইয়ের কোনো প্রভাব কি কাজ করেনি?
ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে এবং বিএনপির সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ। প্রথমত রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে, উপরন্তু নিপুণ নিজেও দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়। কিন্তু যখন বলা হয় তিনি নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে কিংবা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ—তখন নিপুণের নিজের পরিচয়টি আড়ালে পড়তে শুরু করে। আবার মুদ্রার অন্যপিঠ হলো, এই পরিবারের মেয়ে কিংবা পুত্রবধূ বলেই হয়তো নিপুণ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন কিংবা বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তার নিজের যোগ্যতার পাশাপাশি হয়তো এই পারিবারিক পরিচয় ও প্রভাব ভূমিকা রেখেছে।
প্রয়াত বিএনপি নেতা শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইনও এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। অনেকেই তাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বা সংবাদমাধ্যমেও তার পরিচয় বলা হচ্ছে তিনি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী। যদিও বীথিকা নিজেও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। সেইসঙ্গে ‘অর্পণ আলোক সংঘ’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে দেশজুড়ে নির্যাতিত ও আর্থিক সংকটে থাকা নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সুতরাং দল হয়তো বীথিকার ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও ভূমিকার মূল্যায়ন করেই তাকে মনোনীত করেছে। কিন্তু জনমনে ধারণা হলো তাকে মনোনীত করা হয়েছে তার প্রয়াত স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
ঢকার সাবেক কাউন্সিলর সাইদুর রহমান নিউটনের স্ত্রী ও বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিও এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। যদিও তিনি ঢাকা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। প্রশ্ন হলো, মিষ্টি মনোনীত হয়েছেন কি নিজের পরিচয় ও যোগ্যতায় নাকি তার স্বামী ও ভাইয়ের পরিচয়ে?
এর বাইরে সাবেক হুইপ প্রয়াত সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাকিলা ফারজানা, সাবেক হুইপ এবাদুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরীও বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। তারা প্রত্যেকেরই সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু জনপরিসরে আলোচনা হয় মূলত তাদের বাবা, স্বামী তথা পারিবারিক পরিচয় নিয়ে। যার পেছনে কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন পর্যন্ত পরিবারতান্ত্রিক। অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিরাট অংশের নেতাকর্মী এখনও হয়তো এটা বিশ্বাস করেন না যে, শেখ হাসিনা বা শেখ পরিবারের বাইরের কেউ দলের হাল ধরবেন। শেখ হাসিনা দেশে থাকা পর্যন্ত কেউ এটা কল্পনাও করেননি যে তিনি বা তার পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কেউ আওয়ামী লীগের সভাপতি হবেন। একইভাবে বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী এমনকি সাধারণ সমর্থকরাও হয়তো তারেক রহমান বা জিয়া পরিবারের বাইরে অন্য কেউ দলের চেয়ারম্যান হবেন, সেটি কল্পনাও করেন না। যেমন খালেদা জিয়া জীবিত থাকা অবস্থায়, বিশেষ করে যখন তিনি গুরুতর অসুস্থ এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত, তখনও দলের কেউ এটা হয়তো চিন্তা করারও সাহস করেননি যে জিয়া পরিবারের বাইরে থেকে কেউ একজন বিএনপির চেয়ারম্যান হবেন। একই অবস্থা জাতীয় পার্টিরও। এই দলটি ভাঙতে ভাঙতে এখন পাঁচ খণ্ড। কিন্তু দলের মূল অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় দলের প্রতিষ্ঠাতা এরশাদের ভাই জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশকে। এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি অংশ থাকলেও সেটি হালে পানি পায়নি সম্ভবত দুই কারণে; ১. তিনি নারী এবং ২. তিনি এরশাদের একমাত্র স্ত্রী নন। এখানে পরিবারতন্ত্রের বাইরে পুরুষন্ত্রের ভূমিকাকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের চেহারাটা এতই কদাকার যে, অনেক সময়ই দেখা গেছে, সংসদ সদস্য বাবা বা স্বামীর মৃত্যুর পরে তাদের যে সন্তান বা স্ত্রী ‘বাইডিফল্ট’ সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেটি হোক জনগণের ভোটে কিংবা কারচুপির মাধ্যমে—তারা এই পদে বসারই যোগ নন। কিন্তু ফ্যামিলি লিগ্যাসির কারণে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। আবার পারিবারিক পরিচয়ের কারণে সংসদ সদস্য হলেও তিনি নিজেই এই পদে যাওয়ার যোগ্য, এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব এতটাই প্রবল যে, নিজের সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকলেও কোনো নারী সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হলে প্রথমেই তার পারিবারিক পরিচয়টিই সামনে আসে বা সামনে আনা হয়—যা প্রকৃত অর্থে যোগ্য নারীদের জন্য অসম্মান ও অবমাননার কারণ হয়।
তবে আমাদের এই বাস্তবতাও ভুলে গেলে চলবে না যে, ফ্যামিলি লিগ্যাসি বা পারিবারিক পরিচয় থাকা অনেক নারী দীর্ঘদিন ধরে দলের ভেতরে কাজ করেছেন—সংগঠন, সামাজিক কার্যক্রম বা স্থানীয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন—কিন্তু নানা কারণেই হয়তো নিজের দৃশ্যমানতা তৈরি করতে পারেননি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেক সময়ই নারী তার কাজের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় না। ফলে যখন তারা সংসদে আসেন, তখন তাদেরকে অমুকের মেয়ে কিংবা তমুকের স্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু অমুকের মেয়ে কিংবা তমুকের স্ত্রী হলেও তিনি যদি সত্যিই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে পারেন, তাহলে আর তাকে ‘পারিবারিক পরিচয়ের যন্ত্রণা’ তাকে ভোগ করতে হবে না।
সংরক্ষিত নারী আসনে পারিবারিক পরিচয়ের প্রভাব আছে—এটা হয়তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে এই আসনে আসা সব নারীই অযোগ্য বা তাদের ব্যক্তিগত সক্ষমতা নেই। বরং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সামাজিক মানসিকতা এবং দলীয় রাজনীতির ধরন—এই তিনটির সম্মিলিত প্রভাবে অনেক সময় তাদের যোগ্যতা আড়াল হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনে মনোনীতদের দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়া। পারিবারিক পরিচয় ছাপিয়ে যাতে তাদের নিজের যোগ্যতাই মুখ্য হয়ে ওঠে, সেদিকে খেয়াল রাখা।
বাস্তবতা হলো, সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন পদ্ধতিটিই ত্রুটিপূর্ণ তথা প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, বরং সংসদের দলীয় আসন অনুপাতে দলগুলোই এই সংসদ সদস্যদের মনোনয়ন দেয়। এই প্রক্রিয়ায় গণভিত্তিক জনপ্রিয়তার চেয়ে দলীয় আনুগত্য ও অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে যোগ্যতা মূল্যায়নের মানদণ্ডও ভিন্ন হয়ে যায়।
পরিশেষে, যখন দেশের রাজনীতি-প্রশাসনসহ সর্বত্রই নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনে নারীরা পুরুষের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়ে আসছেন—সেখানে এখনও ৫০টি আসন শুধু নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা এবং জনগণের অংশগ্রহণের বাইরে দলীয় প্রধানের পছন্দ-অপছন্দের ওপরে বিষয়টি নির্ভরশীল রাখা কতটা যৌক্তিক—এখন সম্ভবত এই প্রশ্নের মীমাংসা করারও সময় এসেছে।