Published : 04 Jun 2026, 10:50 AM
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রক্ষমতার অধ্যায় চুকিয়ে বিদায় নিয়েছে বেশি দিন হয়নি, এরই মধ্যে ইতিহাসের মহাফেজখানায় তাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গিয়েছে। আগামী দিনে ইতিহাসবিদরা যখন এই সরকারের শাসনকাল নিয়ে আলোচনা করবেন, তখন অবধারিতভাবেই কিছু কঠিন প্রশ্ন সামনে আসবে। ঠিক কোন কোন স্পর্শকাতর বিষয়ে শক্ত অবস্থান না নেওয়ায় ওই সরকারকে ‘দুর্বল সরকার’ হিসেবে তকমা পেতে হলো, তার কারণগুলো একদিন সুনির্দিষ্টভাবেই উন্মোচিত হবে।
তবে খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে ভবিষ্যৎ ইতিহাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; এখনই বলা যায় বিদায়বেলায় এই সরকারের সবচেয়ে বড় খতিয়ান হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গভীর বিভাজন রেখা টেনে দেওয়া। যে সরকার এসেছিল জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে, তারা যখন ক্ষমতা ছাড়ল, তখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা আর সাংস্কৃতিক বিভেদ প্রকট রূপ নিয়েছে। ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ নামক ধারণাটিকে অগ্রাহ্য করে সুবিধা গ্রহণ করেছেন খোদ প্রধান উপদেষ্টাও। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কালিমালিপ্ত করা হয়েছে, নারীকে সহিংসতার আতঙ্কে ঠেলে দিয়েছে। সংস্কারের বড় বড় প্রতিশ্রুতির আড়ালে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিগত ব্যর্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক খামখেয়ালি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তহীনতা ছিল—যা এই সরকারের বেশ কিছু ভালো ও ইতিবাচক অর্জনকে ম্লান করে দিয়ে ব্যর্থতা ও বিভাজনের পাল্লাকেই ভারী করেছে।
স্বার্থের সংঘাত, নাকি ক্ষমতার ‘স্বভাবজাত সুবিধা’?
আমাদের সমাজে ‘স্বার্থের সংঘাত’ বা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ শব্দবন্ধটি এখনো খুব পরিচিত ধারণা নয়। সাধারণ মানুষ তো বটেই, খোদ ক্ষমতাসীনরাও মনে করেন—ক্ষমতায় থাকলে সরকারি গাড়িতে করে সন্তানকে স্কুলে পাঠানো কিংবা গাড়িতে করে স্ত্রীকে বাজার করতে বের হতে দেওয়াটা তাদের অধিকার। আরও বড় পরিসরে, ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে বসে নিজের বা নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের জন্য বিশেষ কোনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বা প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেওয়াকেও স্বাভাবিক বলে মনে করেন। অথচ ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে রাষ্ট্রের সম্পদকে নিজের পকেটে পোড়ার এই সচেতন চেষ্টা নৈতিকতার সমস্ত মানদণ্ডে চরম ও অমার্জনীয় অপরাধ।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে অনেকের বিরুদ্ধেই হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। খোদ মুহাম্মদ ইউনূসকেও বছরের পর বছর এমন সব হয়রানিমূলক মামলার বেড়াজালে আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়েছে। তবে ক্ষমতার পালাবদলে তিনি যখন নিজেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন, তখন মাত্র তিন দিনের মাথায়, প্রধান উপদেষ্টাসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে করা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সেই বহুল আলোচিত মামলাটি তড়িঘড়ি করে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। (প্রথম আলো, ১১ অগাস্ট ২০২৪)।
এই বিষয়টি সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ পর্যায়ে পড়ে। রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি যখন নিজেই কোনো মামলার আসামি, তখন সেই মামলার রায় নিয়ে বিচারকদের মনে অদৃশ্য চাপ ও দ্বিধা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। মানলাম, মামলাটি সম্পূর্ণ হয়রানিমূলক ছিল; কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষ পদে বসে এমন তড়িঘড়ি ‘মামলা প্রত্যাহার’ জনমনে গভীর সংশয় ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। কয়েকশো ছাত্র-জনতার প্রাণের বিনিময়ে যে সরকার ক্ষমতায় এলো—সেই সরকারের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস যদি এভাবে পর্দার আড়ালে মামলা প্রত্যাহার না করে, আইনি লড়াই চালিয়ে আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতেন, তবে তা নিঃসন্দেহে সেটি তার নৈতিক অবস্থানে একটি শক্ত ভিত্তি এনে দিতে পারত। কিন্তু সেই প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করতে পারেননি।
এই মামলা প্রত্যাহারের ঠিক দুই মাসের মাথায় শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকার কর প্রদানের রায়টি প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটে (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ৩ অক্টোবর ২০২৪)। যে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন পরিচিত, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হওয়ার পরপরই তার সেই প্রতিষ্ঠানের এই বিপুল পরিমাণ কর মওকুফের রায়ে সরকারের অদৃশ্য প্রভাব বিস্তারের যে অভিযোগ উঠেছে—তা কেউই উড়িয়ে দিতে পারবেন না।
ক্ষমতায় থাকাকালীন মুহাম্মদ ইউনূস তার নিজের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ট্রাস্টের অধীনে ২০২৫ সালের মার্চে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি অনুমোদন, এপ্রিলে গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, ডিজিটাল ওয়ালেট সেবার লাইসেন্সসহ—একই বছরের জুনে গ্রামীণ ব্যাংককে টানা পাঁচ বছরের জন্য সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয় (নিউ এজ, ৯ মে ২০২৫; প্রথম আলো, ৩ জুন ২০২৫)। স্বার্থের সংঘাতের এমন নগ্ন রূপ ছাড়াও এসব নীতিগত অনুমোদনের চরম অস্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু তার সরকার তাতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে ড. ইউনূস যেভাবে নিজের স্বার্থ আর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে একাকার করে ফেলেছিলেন, সেই প্রাতিষ্ঠানিক অনৈতিকতার কারণেই সমস্ত শ্রেণির মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা লোপ পেতে শুরু করে।
একদিকে গায়েবি মামলা প্রত্যাহার, অন্যদিকে গ্রহণ
মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর বিগত আমলের হাজার হাজার মামলা কয়েক দফায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। সর্বশেষ খবর বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ২৩ হাজার ৮৬৫টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করেছে আইন মন্ত্রণালয় (ইত্তেফাক, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। এইসব হয়রানিমূলক মামলা ছাড়াও বিগত সরকারের আমলে ঘটিত যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডিত রায়, একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলাসহ অসংখ্য আলোচিত মামলায় ‘রাজনৈতিক হয়রানি’ বিবেচনায় আসামিদের খালাস দেওয়া হয়েছে। এমনকি দণ্ডিত অনেক উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদের জামিনসহ মামলা প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটেছে।
‘গায়েবি মামলা’ বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এইসব মামলা একদিকে প্রত্যাহার করলেও, অন্যদিকে ঠিক সেই পুরাতন কাঠামোতেই অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে নতুন করে গায়েবি মামলার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমগুলোতে এসেছে। নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পরও এই দলটির সমর্থকদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি শেষ পর্যন্ত চলেছে। আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য হরেদরে দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যেমন হাজার হাজার মামলা হয়েছে, তেমনি অভিনেতা, খেলোয়াড়, সংস্কৃতমনা ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ মামলা করা হয়েছে। ফলে একদিকে মামলা প্রত্যাহার ও অন্যদিকে নতুন মামলার সূতিকাগার করার পরিপ্রেক্ষিতে ইউনূস সরকারের ‘বিচার ব্যবস্থার’ নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, যার সমাধানে তারা এগিয়ে আসেননি।
শিক্ষার উন্নয়নে উদাসীনতা
গণ-অভ্যুত্থানে যে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছে, পরবর্তী সময়ে সেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত ভেঙে পড়েছে। পুরাতন নিয়মেই রাজনৈতিক পছন্দের ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য যেমন করা হয়েছিল, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি ঠেকানোর কোনো টেকসই ব্যবস্থাও তারা করতে পারেনি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে না হওয়া ছাত্র সংসদ নির্বাচন ওই সরকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে করতে পেরেছিল, তবে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশীল ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের উন্মেষ ঘটানোর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। শিক্ষার্থীরা দাবি করলেই দেওয়া হয়েছে অটোপাস। শিক্ষার্থীরা যেমন সময়মতো পাঠ্যপুস্তক পায়নি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়নি। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় কাটায়। শিক্ষা উপদেষ্টা পরিবর্তন করেও শিক্ষার মানের ছিটেফোঁটা উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। ইচ্ছেমতো পাঠ্যপুস্তকের কনটেন্ট মুছে ফেলা হয়েছে এবং নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে।
অথচ পাঠ্যপুস্তককে বলা হয় একটি রাষ্ট্রের অনুলিপি; যেখানে রাষ্ট্রের জন্ম ও তার মূলনীতির আলোকে সমাজ গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যে দেশের ইতিহাস যত বিকশিত, সেই দেশের মানুষের মধ্যে ঐক্যতান তত বেশি থাকে; মতভেদ থাকলেও রাষ্ট্রের কাঠামোয় নিজেদের অবস্থান দৃঢ় থাকে। কিন্তু আমরা পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক রাজনীতিকরণ অতীতের মতোই তার আমলেও দেখলাম। ইতিহাসে যা ছিল বা ঘটেছে, তা নির্মোহভাবে জাতির অভীষ্ট লক্ষ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অভিন্ন ও স্পর্শাতীত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক যেমন করা যায়নি, তেমনি বিভিন্ন মহল থেকে ওঠা স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের দাবিটিতেও কর্ণপাত করা হয়নি।
বিভাজনের পথে ছিল সরকার
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে আটকাতে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর জাতীয় সমঝোতা তৈরিতে ইউনূস সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের সাত সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করেছিল। দফায় দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে ডেকে ঐকমত্যের দীক্ষা দেওয়া হতো। কিন্তু নির্দিষ্ট কয়েকটি রাজনৈতিক দল ব্যতীত সমাজের অন্যান্য শ্রেণি কার্যত মুহাম্মদ ইউনূসের এই ঐকমত্য গড়ায় সাড়া দেয়নি। দেড় বছরের দায়িত্ব গ্রহণে তিনি ১২ বার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন; সেইসব ভাষণে বারবার জাতির ঐক্যের কথা বললেও দেশে বিভাজনের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। মাজার ভেঙে সুফিদের বিরাগভাজন হয়েছেন এবং বাউলদের ওপর আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে উদার সংগীতাঙ্গনে অজনপ্রিয় হয়েছেন। ভিন্নমতের মানুষকে শ্রদ্ধা দেখানোর রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারের বার্তা সবার কাছে পৌঁছানো যায়নি। যে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল, সেই কোটা ব্যবস্থা আবারও ফিরেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়, স্কুল ভর্তিসহ নানা চাকরিতে। এমনকি ‘জুলাই-যোদ্ধা’ কোটায় বিভিন্নজনকে চাকরির সুবিধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
নারীদের নিরাপত্তাহীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিতকরণ
গণ-অভ্যুত্থানের সময় সামনের সারিতে ছিল নারীরা। কিন্তু সেই নারীদের অবদানের কথা কয়েকমাস পরই অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো ভুলে গিয়েছে। এমন একটা সময় এসেছে যখন নারীরা রাস্তাঘাটে চলাফেরা নিয়ে শঙ্কিত বোধ করতে শুরু করে। নারীরা সিগারেট খেতে পারবে কিনা কিংবা নারীদের ওড়না ঠিক করানোর মতো সামাজিক পুলিশিংসহ বন্ধ করা, নারীদের জন্য গঠিত নারী কমিশনের সুপারিশও সরকার আলোচিত ‘জুলাই সনদে’ আনতে পারেনি। নারী খেলোয়াড়দের ওপর হামলাসহ নারী নেতৃত্ব ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা হলেও সরকার কার্যত নীরব ছিল। একইভাবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর হামলায়ও সরকারের ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙচুর এবং জাদুঘর তছনছ করার পরও সরকার সেগুলো সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আলোকিত করার কোনো চেষ্টা সরকারের ভেতর দেখা যায়নি।
শ্বেতপত্রের গর্জন, বিচারে বর্ষেণি
মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত শেখ হাসিনা সরকারের নানা দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করে দাবি করা হয়, ওই সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে ২৪০ বিলিয়ন বা দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। একই সঙ্গে দলটির শীর্ষ নেতাদের দুর্নীতি নিয়ে দুদকে মামলা হয়। কানাডা, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঠিক কারা কারা অর্থ পাচার করেছে—হাতে গোনা কয়েকজনের নাম ব্যতীত দৃশ্যত অন্যান্য চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচারের মুখোমুখি করতে তারা পারেনি। পুরো সময় রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতির তদন্তের কথা বলা হলেও, ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ব্যবস্থা যেমন নেওয়া যায়নি, তেমনি পাচার হওয়া অর্থও ফেরত আনা যায়নি। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে এক ব্যক্তি তার ছেলের টিউশন ফি বাবদ ৪০০ কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়েছেন; কিন্তু সেই ব্যক্তি কে ছিল, তাও জাতির সামনে জানানো হয়নি।
অর্থনৈতিক সফলতা ও ব্যর্থতা
দেশের অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক দাবি করেছেন, ইউনূস সরকার অর্থনীতিতে বেশ সফল হয়েছে। বিশেষ করে আগের সরকারের সময়ে যেখানে ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হতো, সেই জায়গায় তারা কিছুটা সফলতা পেয়েছে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের সময়ে রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সামলানোর কাজটি ইউনূস সরকার করবার চেষ্টা করেছে। দেশের বড় বড় প্রকল্প নতুন করে বাস্তবায়ন না হওয়ায় রিজার্ভও বেড়েছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক খাতকে পুনর্গঠন করা হয়েছে।
তবে এত কিছুর পরও দেশের ইতিহাসে ভয়াবহ বিনিয়োগ মন্দার কথা পত্রপত্রিকার খবর ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। জ্বালানিসংকট, আর্থিক খাতের দুরবস্থা, উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম হারে মজুরি বৃদ্ধি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ ওই সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে পারেনি। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণের খাতায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ (প্রথম আলো, ২৪ নভেম্বর ২০২৫)।
জুলাই সনদ ও জাতীয় নির্বাচন
সরকারের আলোচনায় শীর্ষে ছিল ‘জুলাই সনদ’। সরকার সেই সনদকে বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের আয়োজন করে। গণভোটের বিষয়বস্তু নিয়ে ধূম্রজাল থাকার পরও সরকার নিজেরাই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে কিছুটা বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে নির্বাচনে গণভোটে জয় পেলেও পরবর্তীতে সরকার রাজনৈতিকভাবে তার গ্রহণযোগ্যতা হারায়। প্রথমবারের মতো প্রবাসী নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মতো একটি বৃহৎ কাজ তারা করেছে, যা অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। নিরপেক্ষ ভোট ব্যবস্থা আয়োজনের জন্য তারা সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছিল। নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় দলটি এবারের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি; তবে সরকার সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলেও একটি নির্বাচনের আয়োজন করতে পেরেছে। বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতা ছাড়া কার্যত এই নির্বাচন ছিল রক্তপাতহীন। তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ফলে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন থেকে গেছে। সব মিলিয়ে ব্যর্থতা ও বিভাজনের পাল্লা ভারী করে বিদায় নিয়েছেন তারা; অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকারের শাসনকালের অনেক বিষয়বস্তু আগামীর ইতিহাসে জড়িয়ে থাকবে এবং তর্ক-বিতর্কেই কাটবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল্যায়ন।
নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]
আগের পর্ব
ইউনূস সরকারের অবদান কী প্রকারে অস্বীকার করিব-১: মব
ইউনূস সরকারের অবদান কী প্রকারে অস্বীকার করিব-২: বাকস্বাধীনতা