Published : 29 May 2026, 09:06 PM
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের পরিবর্তনের জন্য এক অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যখন প্রবল আকাঙ্ক্ষার ঐকতান চলছিল, নতুন সরকারপ্রধান কে হবেন তা নিয়ে যখন সেনাসদর ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই উচ্চারিত হতে থাকে শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নাম। দেশের গণ-অভ্যুত্থানকালীন সময়ে যিনি যিনি অলিম্পিক কমিটির বিশেষ আমন্ত্রণে ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন, তাকে ঘিরে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার আবহ তৈরি হয়। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের মুখে তার নাম সংবাদমাধ্যমে আসার পর এই নিয়ে কেউ তেমন দ্বিমত পোষণ করেননি। বলা হয়ে থাকে, তিনি একমাত্র সরকারপ্রধান যিনি ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসার সুযোগ লাভ করেছিলেন।
এরই ধারাবাহিকতায়, সুপ্রিম কোর্টের আইনি মতামত ও বিশেষ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনিসহ মোট ১৭ সদস্যের অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। তবে ৩ জন উপদেষ্টা ঢাকার বাইরে অবস্থান করায়, ওই বছরের ৮ অগাস্ট প্রধান উপদেষ্টাসহ প্রাথমিকভাবে ১৪ জন উপদেষ্টা শপথ গ্রহণ করেন এবং বাকি ৩ জন পরে শপথ নেন। এই সরকারে স্থান পায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ থেকে আসা দুই সমন্বয়ক। পরবর্তী সময়ে উপদেষ্টা পরিষদে ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে আরও একজন সমন্বয়ক যুক্ত হন। উপদেষ্টাদের সবাই দেশের সংবিধান মেনেই শপথ নিয়েছিলেন। তাদের কাঁধে যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব, তখন সবাই প্রত্যাশার ঝাঁপি খুলে বসেছিল দেশটার ইতিবাচক পরিবর্তন হবে মনে করে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদায়ের পর যে তিন দিন দেশে কোনো কার্যকর সরকার ছিল না, দেশের অধিকাংশ থানা যখন লণ্ডভণ্ড, তখন রাজধানীতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নানা কাজে শিক্ষার্থীদের দেখা যায়। তারা নিজ নিজ জায়গা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানের লুটপাট ও ধ্বংসস্তূপ সরাতে এগিয়ে আসেন। ছাত্র-জনতার সমর্থনে সরকার যখন একটি পরিবর্তনের আভায় দেশটাকে এগিয়ে নেওয়ার ব্রত ঠিক করল, ঠিক তখন সেই গতিকে স্লথ করে দেয় ‘মব’ নামক এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। একটা সময় (২০১৩-২০১৪) দেশে ‘ফ্ল্যাশ মব’ নামে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নাচ-গানের একটা ট্রেন্ড চলছিল, সেই ইতিবাচক দিকটিকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের মানুষ এ ‘মব জনতা’র ব্যাপকতা দেখতে পারল চব্বিশে এসে। যদিও এই দেশে গণপিটুনি দিয়ে বিশেষ করে পকেটমার কিংবা ছেলেধরা সন্দেহে প্রতিবছর অনেক মানুষকে মেরে ফেলার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের, তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী মব আর এমন ছোট পরিসরে নয়, তারা বিচারালয় থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মব সৃষ্টির ঘটনা প্রত্যক্ষ করল। এই সব মব দেশটাকে রীতিমতন মবের মুল্লুক বানিয়ে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারব্যবস্থাকে নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়।
বিচারালয় থেকে বিস্তার
৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর গণভবন ও সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এই সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা কার্যত কোনো বাধা প্রদানও করেনি। এটাকে আমরা জনমানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখলেও পরে ২০২৪ সালের ১০ অগাস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের পদত্যাগের দাবিতে সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করে বিক্ষোভের নামে মব করতে দেখি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আন্দোলনকারীদের একাংশকে; পরে ওই দিন প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচ বিচারপতি পদত্যাগে বাধ্য হন (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১০ অগাস্ট ২০২৪)।
রাষ্ট্রক্ষমতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহ পর, ১৪ অগাস্ট চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে আদালতে তোলা হলে সেখানে ডিম ও জুতা ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটে (সমকাল, ১৫ অগাস্ট ২০২৪)। একই মাসে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক বেধড়ক মারধর ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন সিলেটে আদালতে তোলার সময়। মারধরে তিনি গুরুতর আহত হন, এমনকি তার অস্ত্রোপচারও করতে হয়েছিল (প্রথম আলো, ২৪ অগাস্ট ২০২৪)। এর কিছুদিন আগে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিও মব আক্রমণের শিকার হন।
ক্ষোভ ও হতাশা থেকে একদল মানুষ আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের সামনে যখন আসামিদের হেনস্তা করে এবং সেই সব খবর পত্র-পত্রিকায় চাউর হলেও সরকার ছিল নির্বিকার। যদিও পরে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আওয়ামী লীগের এইসব নেতাদের ভোরের দিকে আদালতে তোলার নির্দেশনা দেন, কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়জুড়ে আদালত প্রাঙ্গণে বিভিন্ন সময় এই রকম দৃশ্য মানুষ দেখেছে।
ফ্যাসিবাদের দোসর ট্যাগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
হাসিনার পতনের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নজিরবিহীন মবের শিকার হন। শেখ হাসিনার আমলে নিয়োগপ্রাপ্তদের ফ্যাসিবাদের দোসর ট্যাগ দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের ওপর আক্রমণ এবং তাদের পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনা অহরহ ঘটেছে। বলতে গেলে, শিক্ষার্থীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়া এই শিক্ষকরা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ‘অসহায়ত্ববোধ’ করেছেন তখন। পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের মারধরের ছবি বের হওয়ার পরও সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি বা করেনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছিল তখন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা ভয়ের মধ্যে ক্লাস নিতে বাধ্য হয়েছেন।
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ভয়াবহ মব অপরাধের শিকার হওয়া শিক্ষকদের পরিবারও ছিল চিন্তিত। চট্টগ্রামের বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেনকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয় (প্রথম আলো, ৬ ডিসেম্বর ২০২৪)। শিক্ষকদের ওপর আক্রমণের ঘটনায় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ছয় মাস বন্ধ ছিল (সমকাল, ১২ জুলাই ২০২৫)। পদত্যাগপত্রে সই করানোর জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় ডিনকে চাপ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র সংসদের এক নেতা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার শিক্ষককে পদত্যাগ ও চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য করা হয় বলে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে। ১৬ মাসে ১ হাজার ৭৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১ জানুয়ারি ২০২৬)।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্র-শিক্ষকদের সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হলেও, গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের ‘ক্ষমতার স্বাদ’ পাইয়ে দেওয়ার কারণে মব করে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষকদের মারধর, অপমান ও অপদস্ত করে চাকরিচ্যুত কিংবা পদচ্যুতির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকদের মনে এক ধরনের ভয়ের আবহ তৈরি হয়; যা আগামীতেও বিস্তৃত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষকদের মান-মর্যাদা রক্ষায় শিক্ষকরা যতটা দায়ী থাকেন, তার চেয়ে বেশি দায়ী থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু এই দেড় বছর কার্যত এই দুই প্রতিষ্ঠান মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
মাজার ও বাউলদের নিশানা করেছিল
আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়া মাজার ও বাউলদের প্রতি উন্মাদ আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। দেশের ৮০টি মাজারে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে বলে ‘বিশ্ব সুফি সংস্থা’ নামের একটি সংগঠন দাবি করলেও পরবর্তীকালে ইউনূস সরকারের প্রেস উইং এই সংখ্যাটিকে অর্ধেকে নামিয়ে আনে (প্রথম আলো, ২৩ জানুয়ারি ২০২৫)। সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ঘটনা ঘটে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। সেখানে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপস্থিতিতেই কবর থেকে এক পীরের লাশ তুলে এনে মহাসড়কের পদ্মার মোড় এলাকায় নিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো জঘন্য কাজটি করা হয় (বিবিসি বাংলা, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪)।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল, মরমি শিল্পী, লোকসংগীতশিল্পী, মঞ্চ ও যাত্রাশিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বাউল-ফকিরদের ওপর হামলা, চুল কেটে হেনস্তাসহ বাউলদের পিটিয়ে মেরে পুলিশে তুলে দেওয়ার ঘটনা ছিল অনেক। ফ্যাসিবাদের দোসর ট্যাগ দিয়ে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক মঞ্চায়ন বন্ধ করা হয় (প্রথম আলো, ৩ নভেম্বর ২০২৪)। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের খবর সংবাদমাধ্যমে ছিল। ট্যাগ দিয়ে বেশ কয়েকজন অভিনেতাকে রাস্তাঘাটে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৯ এপ্রিল ২০২৫)।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়ে লম্বা হাত
মব সৃষ্টিকারী সবকিছু এমন নির্বিঘ্নে ঘটিয়েছে, যে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে মব সৃষ্টিকারীদের হাত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়েও লম্বা। ইউনূস সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পরই, চব্বিশের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়; যিনি মৃত্যুর তিন দিন আগেই কন্যা সন্তানের পিতা হন। খুন হওয়ার এক দশক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরের আক্রমণে পা হারানো মাসুদ কন্যা সন্তানের ওষুধ কিনতে গিয়ে মবক্রেসিতে আক্রান্ত হন (ইত্তেফাক, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪)।
একই ধরনের ঘটনা ঘটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ধরে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে (প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪)।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাইরে মবকারীরা থানায় গিয়ে অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনা, নারী হেনস্তাকারীকে ফুলের মালা পরিয়ে পুরস্কৃত করা, থানায় গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে ধমকানোসহ নানা ঘটনা ঘটিয়েছে। অধ্যাপক ইউনূস সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মবের কাছে রীতিমতন অসহায় হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িতে একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপস্থিতিতেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াসহ পরবর্তীতে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার ঘটনায় দেশবাসী কেবল হতাশাই প্রকাশ করেননি, সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
মবের কারণে পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় সাধারণদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউনূস সরকারের সময় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে খুলনা উপপুলিশ কমিশনারের (দক্ষিণ) কার্যালয়ে ঢুকে এক কিশোরকে পিটুনি দেওয়া হয় (প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪)। উৎসব মণ্ডল নামে ওই কিশোর ও তার পরিবার সেই থেকে নিখোঁজ রয়েছে। অন্তত সংবাদমাধ্যমে তাদের আর কোনো খবর নেই।
আওয়ামী লীগের দোসর লুকিয়ে আছে তকমা দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাসা-বাড়িতে মধ্যরাতে ঢুকে ভয়ভীতি দেখানো থেকে শুরু করে জিনিসপত্র লুটের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় এক প্রবাসীর বাসায় ঢুকে মব তৈরি করে চাঁদাবাজি যেমন ছিল, তেমনি রাজশাহী নগরীর ভদ্রা পারিজাত আবাসিক এলাকায় মব সৃষ্টি করে ফ্ল্যাটে ঢুকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট এবং নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে (কালের কণ্ঠ, ৫ জুলাই ২০২৫)।
মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’র (এইচআরএসএস) মতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪১৩টি মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে; যাতে প্রাণ হারান ২৫৯ জন (ডেইলি স্টার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)।
সরকারের 'প্রেসার গ্রুপ'
মব সন্ত্রাস নিয়ে দেশের মানুষ যখন উদ্বিগ্ন, বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন ভেঙে পড়ছে, তখন সরকার এই মবদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এটিকে 'প্রেসার গ্রুপ' অভিহিত করে সরকারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সমান্তরাল এ 'ক্ষমতাপুষ্ট' প্রেসার গ্রুপ সরকারকে অক্টোপাসের মতো চেপে ধরেছিল। সরকারের প্রেস উইং প্রধান নিজেই দাবি করে বসেন, ‘আপনি যেটাকে মব বলছেন সে তো তৈরি হচ্ছে। আমি ওটাকে মব বলছি না, বলছি প্রেশার গ্রুপ। সে তৈরি হচ্ছে আগের এই যে জার্নালিজমের ফেইলুরের (ব্যর্থতার) কারণে’ (আজকের পত্রিকা, ২৬ জুন ২০২৫)। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঠিক এই উৎসাহ দেওয়ার কারণে সরকার মবকে দমন করতে পারেনি। দিন শেষে মবক্রেসি অনেকটাই ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়’ হয়ে দাঁড়ায় এবং সরকারের স্বকীয়তাকে গিলে ফেলে। যদিও শেষ সময়ে সংবাদমাধ্যমে আক্রমণের পর তারা স্বীকার করেন যে, মব উগ্রতায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে; তবে তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্জিত সাফল্যকে ম্লান করে দেয়।