এসএসসি পরীক্ষার সূচি ও নীতির অস্থিরতায় দিশেহারা শিক্ষাব্যবস্থা
সেশন জট কমানোর নামে হঠাৎ এসএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত কি যৌক্তিক? যখন শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর অভিভাবক—কেউই প্রস্তুত নন, তখন কার স্বার্থে এই তাড়াহুড়ো?
মে মাসের ১৪ তারিখ সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আগামী বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে ৭ জানুয়ারি এবং শেষ হবে ৬ ফেব্রুয়ারি। একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ৬ জুন হবে বলে তারিখ ঘোষণা করেছিলেন। এ বছরের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২১ এপ্রিল। সেই হিসেবে, আগামী বছরের পরীক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্যালেন্ডার থেকে হঠাৎ করে প্রায় চার মাস কমে গেল।
তবে গতকাল ২ জুন আরেক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আগের অবস্থা থেকে সরে এসেছেন বলে মনে হচ্ছে। জানিয়েছেন, ”অংশীজনরা চাইলে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে। পাবলিক অপিনিয়ন যদি হয়, আবারও আমরা বসতে পারি।”
অংশীজনেরা যে এসএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার এই সিদ্ধান্ত মানতে পারছেন না, তা অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়াগুলোতে চোখ-কান খোলা রাখলেই মন্ত্রী মহোদয় দেখতে ও শুনতে পেতেন। তবে সবচেয়ে বড় অংশীজন তো পরীক্ষার্থীরা, এ সিদ্ধান্ত মানি না, মাঠে নেমে এমন ঘোষণা দেওয়ার বয়স যাদের হয়নি। হলে এই তারিখ পরিবর্তনই সরকারের বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত বলে অনুমান করা যায়। তবে ওই শিক্ষার্থীরা যে নানান রসিকতাপূর্ণ কাণ্ডকীর্তি করে তাদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাচ্ছে, তা কেন শিক্ষামন্ত্রীর চোখে পড়ছে না, বোঝা কঠিন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের জীবনে এসএসসি প্রথম বড় কোনো পরীক্ষা—যেটিকে শিক্ষার্থী থেকে অভিভাবক, সবাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। এই পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের এমন এক মাইলফলক, যেটি ভবিষ্যৎ পথচলায় গভীর প্রভাব ফেলে। শিক্ষামন্ত্রী হয়তো জানেন না যে, ইতোমধ্যে নানা মহলে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসএসসি পরীক্ষার তারিখ নিয়ে হঠাৎ করে কেন এই সিদ্ধান্ত? কেন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি থেকে চার মাস সময় কেটে নেওয়া হচ্ছে?
আগের সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য কারণ হিসেবে মন্ত্রী মহোদয় মোট শিক্ষাজীবনের ব্যাপ্তি কমে আসার দাবি করেছিলেন। তার মতে, স্বাভাবিক নিয়মে এসএসসি পাস করতে ১৬ বছর এবং এইচএসসি পাস করতে ১৮ বছর লাগার কথা থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় ২০ বছরে গিয়ে দাঁড়ায়। ধাপে ধাপে এই ব্যবধান কমিয়ে এনে পর্যায়ক্রমে দুই পরীক্ষাই ডিসেম্বর মাসে নিয়ে আসা তার সরকারের পরিকল্পনা।
চিন্তাটি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি আগামী বছর থেকেই কেন?
আগামী বছর যারা এসএসসি পরীক্ষায় বসবে, তাদের হাতে নবম ও দশম শ্রেণির শেষ বইটি পর্যন্ত বই পৌঁছাতে সময় লেগেছে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত। তার আগের বছরের অগাস্টে সরকার পরিবর্তনের পর পাঠ্যক্রম ছাপানোর নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয় এবং বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন করে নতুন বই ছাপানো হয়। সেই বই পেতে বহু শিক্ষার্থীকে বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। পত্রিকা ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থী জুলাইয়ের শেষ দিকে গিয়ে বই হাতে পেয়েছে। অর্থাৎ এর মধ্যেই শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাস হারিয়ে গেছে। মন্ত্রীর সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন এক অভিভাবক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন,”সে বছর (২০২৫) আমার মেয়ে ধর্ম, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান ও আইসিটির বই পেয়েছে ২৩ এপ্রিল।
আরেকটা সমস্যা হলো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি। ২০২৫ সালে যারা নবম শ্রেণিতে উঠেছে, তারা জানত তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে ২০২৭ সালের এপ্রিলে। এখন হঠাৎ করে পরীক্ষার ১১ মাস আগে তাদের জীবন থেকে চার মাস সময় কেটে নেওয়ার প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা কি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে? তাছাড়া, বই দিতে দেরি করার পরও যদি পরীক্ষার দিন-তারিখ তখনই ঘোষিত থাকত, ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে তাকে এসএসসি পরীক্ষা দিতে হবে, তাহলে শিক্ষার্থীরা সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারত। অভিভাবকরাও তাদের শিশুদের সেভাবে প্রস্তুত করতে পারতেন।”
চার মাস কমে যাওয়ার কারণে শিক্ষকরা দ্রুত সিলেবাস শেষ করার চাপে পড়বেন। এতে না শিক্ষকরা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবেন, না শিক্ষার্থীরা তা আত্মস্থ করতে পারবে। আমাদের দেশের স্কুলগুলোর শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকসংখ্যা, প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের পরিবেশ এতটা আধুনিক নয় যে, বছরের যে কোনো সময় বড় পরিবর্তন এনে দ্রুত সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
শওকত আলী নামের এক অভিভাবকের কথায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে: “আমার মেয়ে এখন বিজ্ঞান বিভাগের প্রস্তুতি নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। সে আশঙ্কা করছে, স্যাররা তাড়াহুড়া করে সিলেবাস শেষ করবেন, আমি প্র্যাকটিস করার সময় পাব না।” আরেক অভিভাবক রমাপ্রসাদ বাবু লিখেছেন, দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটিতে এখনো সিলেবাস দেওয়া হয়নি, ডায়েরি দেওয়া হয়নি; আইডি কার্ড পেতেও পাঁচ মাস লেগেছে। তার মন্তব্য, সময় কমাতে চাইলে তা যৌক্তিক সময় থেকেই করা উচিত; শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নয়।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে অভিভাবক; কেউই এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন তা তো স্পষ্ট। তাদের প্রস্তাব, এই সিদ্ধান্ত ২০২৮ সাল থেকে বাস্তবায়ন করা হোক, কিন্তু কোনোভাবেই আগামী বছর থেকে নয়।
শুধু এটি নয়; দীর্ঘদিন ধরেই আমরা দেখছি, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঘনঘন নীতিগত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পরীক্ষার কাঠামো, শ্রেণিকাঠামো, এমনকি পাঠ্যবইয়ের বিন্যাস, সবখানেই রদবদল হয়েছে। পরিবর্তন প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা হতে হবে দরকারি প্রস্তুতির সাপেক্ষে। পাইলটিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো প্রস্তুতি, এসব ছাড়া দ্রুত বাস্তবায়ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে।
মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে সেই রূপান্তর কার্যকর করার মতো প্রশিক্ষিত শিক্ষক, প্রয়োজনীয় উপকরণ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ কিংবা মূল্যায়ন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন বিভ্রান্ত, শিক্ষকও তেমনি অনিশ্চিত। সে সময় অধিকাংশ অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে।
দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা রূপান্তরের কারণে নকলের সুযোগ কমে গেছে, এটি একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু আমরা কি দেখলাম? নতুন সরকার এসে পরীক্ষায় নকল রোধকে বড় ইস্যু বানিয়েছে, যেটি দুই দশক আগে নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিষয়। নানা সমালোচনার পরও পরীক্ষার হলে গিয়ে নকল ধরার জন্য মন্ত্রীর উঁকিঝুঁকি শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ তৈরি করেছে। এসব কার্যক্রম শিক্ষাবান্ধব নয়।
লটারি পদ্ধতি বাতিল করে আবার ভর্তি পরীক্ষায় ফেরার সিদ্ধান্ত কোচিংনির্ভর সংস্কৃতিকে উসকে দেবে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী ‘ভর্তি যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়বে। মানসিক চাপে পিষ্ট হবে। দরিদ্র পরিবারের যে মেয়েটি লটারির মাধ্যমে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে পড়ার সুযোগ পেতে পারত, সে এবার উচ্চ ফি ও প্রতিযোগিতার কারণে পরীক্ষার ফরমই কিনতে পারবে না। একদিকে শিক্ষাজীবনের সময় কমানোর অজুহাত, অন্যদিকে কোচিং বাণিজ্যকে উৎসাহ দেওয়া, দরিদ্র শিক্ষার্থীকে আরও প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া—এ দুই প্রবণতা পরস্পরবিরোধী।
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক থেকে বহু অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু বাদ দেওয়া অধ্যায়গুলো এখনো জাতীয় শিক্ষাক্রমের কাঠামোতে রয়ে গেছে। শিক্ষকরা বলছেন, একটি কারিকুলামে দক্ষ হয়ে ওঠার আগেই আবার পরিবর্তন আসছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য কষ্টকর। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারিকুলাম বদল না করে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, দেশ ও বিশ্ববাজারের দক্ষতা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা বেশি জরুরি।
২০২৪ সালের পর, পাঠ্যবইয়ের কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। কোথাও ইতিহাসের চরিত্র বদলেছে, কোথাও যুক্ত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতি ও আলোচনা। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিবর্তনবাদের মত বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ে প্রতিটি শ্রেণিতে জুলাই আন্দোলন, ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। ইতিহাস ও বাংলা বইয়েও একই ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিস্থাপিত হয়েছে পরীক্ষামুখী মানসিকতা।
একদিকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, অন্যদিকে পুরোনো পরীক্ষামুখী মানসিকতা; বই এক রকম, বাস্তবায়ন আরেক রকম; বছরের অর্ধেক পেরিয়ে যাওয়ার পর বই পাওয়া; কোচিংনির্ভর সংস্কৃতিকে উৎসাহ, এসব নীতিগত পরীক্ষানিরীক্ষার ‘ল্যাবরেটরি’তে গিনিপিগ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীরা। তারা বুঝে উঠতে পারছে না কোনটি স্থায়ী, কোনটি অস্থায়ী। অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।
শিক্ষানীতি প্রণয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, যেখানে পাইলটিং, মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা থাকবে। কিন্তু যখন দ্রুত ফল দেখানোর তাড়না নীতিকে ত্বরান্বিত করে, তখন শিক্ষার্থীর শেখার প্রক্রিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিক্ষা কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে ঘনঘন পদ্ধতি বদলে ফলাফল দেখা যায়। এটি একটি প্রজন্ম গঠনের প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রয়োজন স্থিতি, ধারাবাহিকতা এবং আস্থা।
নীতির লক্ষ্য যদি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়া হয়, তবে নীতির অস্থিরতা নয়; স্থিতিই হতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি।
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: raju_norul@yahoo.com
