Published : 28 Apr 2026, 11:05 AM
সেশনজট নিরসনের লক্ষ্যে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার যে পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে, তা নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা থেকে রক্ষার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। তাই এই চিন্তাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। তবে যেকোনো বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের মানসিক প্রস্তুতির বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যারা আগামীতে এই পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছে, তাদের জন্য হুট করে সময়সূচি পরিবর্তনের এই পরিকল্পনা বড় ধরনের মানসিক ধাক্কা হিসেবে কাজ করতে পারে।
পরীক্ষা এগিয়ে আনার এই চলমান আলোচনাটি বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবল উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। আমাদের এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, যেকোনো অনিশ্চয়তা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অল্পবয়সীদের অনেক দ্রুত অস্থির ও বিচলিত করে তোলে। সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও সেই প্রক্রিয়ায় যেন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, সেশনজট কমানোর উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কৈশোরের এই সংবেদনশীল সময়ে শিক্ষার্থীরা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট রুটিন বা সুশৃঙ্খল পরিকল্পনায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যা মূলত তাদের ভেতরে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস ও নিয়ন্ত্রণের বোধ তৈরি করে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতা হলো, যেকোনো কাঠামোগত পরিবর্তন বা সংস্কারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবার আগে এই শিশু-কিশোরদের ওপরই প্রয়োগ করা হয়। তাদের অভিযোজন ক্ষমতাকে ধ্রুবক ধরে নিয়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, তাদেরও একটা মানসিক জগৎ আছে। হঠাৎ পরীক্ষা এগিয়ে এলে শিক্ষার্থীদের ওপর সম্ভাব্য যে যে ধরনের মানসিক চাপ পড়তে পারে, আসুন সেই দিকগুলো একটু খতিয়ে দেখি—
পরীক্ষার সময় এগিয়ে আসার অর্থ হলো প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত সময় সংকুচিত হয়ে যাওয়া। যখন একজন শিক্ষার্থী অনুভব করে যে তার সিলেবাস শেষ করার জন্য হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই, তখন সেই চিন্তা থেকেই তাদের মধ্যে ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা তীব্র অস্থিরতা দানা বাঁধতে পারে। এমনকি অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও সময়ের এই আকস্মিক সংকটে তীব্র হীনম্মন্যতায় ভোগা শুরু করতে পারে। পর্যাপ্ত রিভিশনের সুযোগ না পাওয়া তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত আত্মবিশ্বাসকে এক নিমেষেই টলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যখন একজন শিক্ষার্থী অনুভব করে যে হাতে থাকা সীমিত সময়ে কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব নয়, তখন তার মনে এই নেতিবাচক ধারণা গেঁথে যায় যে সে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। এই জাতীয় বিমর্ষতা আর আত্মবিশ্বাসের অভাব খুব দ্রুতই পড়াশোনার প্রতি এক ধরনের গভীর অনীহা ও দীর্ঘস্থায়ী ভীতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে বড় সিলেবাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরীক্ষা শুরু করলে শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ক ‘তথ্য প্রক্রিয়াজাত’ (Information Processing) করার সময় পাবে না। এর ফলে টানা পড়াশোনার চাপে যখন নতুন তথ্যগুলো দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে (Long-term memory) জমা হতে পারে না, তখন পরীক্ষার হলে জানা উত্তরও মনে পড়ে না বা গুলিয়ে যায়। এই পরিস্থিতিকে বলা হয় স্মৃতিবিভ্রাট বা ‘ব্ল্যাঙ্ক আউট’। অল্প সময়ে বেশি পড়তে গিয়ে পরীক্ষার্থীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্ল্যাঙ্ক আউটের শিকার হবে।
সেই সঙ্গে পরীক্ষার সময় এগিয়ে আসার খবর পাওয়ামাত্রই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার’ বা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে। পরিকল্পিত একটি রুটিন যখন হঠাৎ তছনছ হয়ে যায়, তখন সেই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এর অবধারিত পরিণতি হিসেবে পরীক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ বা ‘ক্রনিক অ্যাংজাইটি’র শিকার হতে পারে; যা কেবল তাদের পরীক্ষার ফলাফলকেই নয়, সামগ্রিক মানসিক বিকাশকেও দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
অন্যদিকে, বিশাল সিলেবাস শেষ করার যে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, তা কাটিয়ে ওঠার ন্যূনতম সুযোগ না দিয়েই পরীক্ষা শুরু করে দিলে শিক্ষার্থীরা চরম অবসাদ বা তীব্র ‘বার্নআউট’ (Burnout)-এর শিকার হতে পারে। মস্তিষ্ক যখন বিশ্রামের সুযোগ পায় না, তখন তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা লোপ পায়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা এবং কোনো জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা আগের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এসএসসি পরীক্ষা কেবল একটি একাডেমিক মূল্যায়ন নয়, রীতিমতো ‘সামাজিক মর্যাদার লড়াই’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর এমনিতেই সাফল্যের অস্বাভাবিক চাপ থাকে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একদিকে হাতে সময় কমে আসা এবং অন্যদিকে বিশাল সিলেবাসের বোঝা—এই দ্বিমুখী সংকট শিক্ষার্থীদের সাংঘাতিকভাবে বিষণ্নতার (Depression) দিকে ঠেলে দিতে পারে। যখন প্রত্যাশার পারদ থাকে আকাশচুম্বী অথচ প্রস্তুতির সময়টুকু কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সেই মানসিক চাপের ভার সইতে না পেরে কিশোর বয়সের এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সিলেবাস শেষ করার তাড়নায় শিক্ষার্থীরা রাত জাগা বাড়িয়ে দেবে। এতে তাদের মেজাজ খিটখিটে হওয়া, হজমের সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি মাথাব্যথা ও মনোযোগের সমস্যাসহ অন্য আরও শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও প্রস্তুতির অতৃপ্তি থেকে নানা ধরনের সমস্যা শুরু হতে পারে। অর্থাৎ রিভিশন দেওয়ার সময় না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি স্থায়ী ধারণা তৈরি হতে পারে যে, ‘আমার কিছুই পড়া হয়নি’। এই হীনম্মন্যতা থেকে ওরা অনেকেই হাল ছেড়ে দিতে পারে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে নিজের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এই বয়সে নানা ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে, যা আসলেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে।
সবশেষে আরও যে ভয়টি থেকে যায় তা হলো—অসাধু উপায় অবলম্বন বা নকল করার প্রবণতা আরও বেড়ে যেতে পারে। যখন কোনো শিক্ষার্থী মনে করবে যে স্বাভাবিক পথে তার পক্ষে সিলেবাস শেষ করা অসম্ভব, তখন চাপের মুখে সে প্রশ্নফাঁস বা নকলের মতো অনৈতিক পথের প্রতি প্রলুব্ধ হতে পারে। অথচ সরকার নকল রোধেও বদ্ধপরিকর।
সেশনজট কমানোর জন্য পরীক্ষা হঠাৎ এগিয়ে আনা একমাত্র সমাধান নয়। যদি সেশনজট রোধে ডিসেম্বরকেই লক্ষ্যমাত্রা করা হয়, তবে শুরুতেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা এগিয়ে আনার বিষয়টি ফলাওভাবে প্রচার না করে বিকল্প ও কার্যকরী কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা প্রয়োজন যাতে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা সেশনজট নিরসনের মতোই জরুরি। আর এজন্যই পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের ঘোষণার পূর্বেই শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করা বিশেষ প্রয়োজন।
সেশনজট নিরসনে সম্ভাব্য যা করা যেতে পারে—
সিলেবাসের যৌক্তিক পরিমার্জন করা। বড় সিলেবাসের পরিবর্তে শুধুমাত্র অত্যাবশ্যকীয় অংশগুলো (Core Subjects/Topics) রাখা অথবা বড় সিলেবাসকে সংক্ষিপ্ত করে শিক্ষার্থীদের ভেতর উদ্বেগ (Anxiety) কমানো সম্ভব।
তাছাড়া মডেল টেস্টের সংখ্যা কমানো অথবা প্রি-টেস্ট বা টেস্ট পরীক্ষার চাপ কমানো যেতে পারে।
স্কুলগুলোতে ঘনঘন কোচিং বা ক্লাস টেস্ট অথবা মডেল টেস্ট না নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজেদের পড়ার জন্য সময় (Self-study time) দেওয়াটা জরুরি।
মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে। শুধুমাত্র একটি বড় চূড়ান্ত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে আগামী ছয় মাস ছোট ছোট ‘ক্লাস টেস্ট’ বা অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে নম্বর বিভাজন করে এসএসসি পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে আনা যেতে পারে।
পরীক্ষার পর দ্রুত ফলাফল প্রকাশ এবং ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রশাসনিক গতিশীলতা বাড়ানো যেতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ সেশন নেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি স্কুলে কাউন্সিলর বা শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আগামী তিন মাস নিয়মিত সেশন নিয়ে তাদের অভয় দেওয়া এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব ও সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে আশ্বস্ত করা।
সেশনজট কমানো জরুরি, কিন্তু শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে এই পরিবর্তন আনা কতখানি উচিত বলে আপনি মনে করেন?