Published : 04 Jun 2026, 09:20 AM
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রহসনের গণশুনানি শেষে বাজেটের আগেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাড়িয়ে দিল বিদ্যুতের দাম। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে। গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের দাম বেড়েছে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জ বাড়ানো হয়েছে ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
বিইআরসির ঘোষণামতে, বিভিন্ন ধাপের (স্লাব) গ্রাহকদের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম ১৫ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। নতুন এ দাম ১ জুন থেকেই কার্যকর হয়েছে বলে ধরা হচ্ছে।
বিইআরসির আদেশ মোতাবেক, পাইকারি বিদ্যুতের বর্তমান গড় দাম ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি বেড়েছে ১ টাকা ৩৯ পয়সা। আর খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের গড় দাম বেড়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সা। অন্যদিকে, সঞ্চালন খরচ (গড়) ইউনিট প্রতি ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে প্রায় ৩৯ পয়সা।

বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে অস্বচ্ছ চুক্তি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জ (সক্ষমতা মাশুল), দুর্বল জবাবদিহিতা এবং নীতিগত সুবিধাভোগীদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা থাকলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এই কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে, পুরনো ফ্যাসিবাদী পথেই বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। সরকার বিদ্যুৎ খাতের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো সমাধান না করে আবারও সেই লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পুরনো নীতিই অনুসরণ করেছে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এই তড়িঘড়ি উদ্যোগ প্রমাণ করে, সরকার বদলালেও বিদ্যুৎ খাত পরিচালনার মৌলিক দর্শন অপরিবর্তিত রয়ে গিয়েছে। এই খাতের জবাবদিহিতা, চুক্তি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, উৎপাদন ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা নিশ্চিত করা হলে এভাবে মূল্য সমন্বয়ের নামে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হতো না; বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অদক্ষতা ও সুবিধাভোগী কাঠামোর ব্যয় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টা চালাতে হতো না।
বলা হয়, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই মূল্য সমন্বয় ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বাড়তি খরচের কতটা বৈশ্বিক বাস্তবতার ফল, আর কতটা বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর জন্য গড়ে ওঠা কাঠামোর ফল? সেটা না দেখেই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি মূলত সেই ব্যর্থতার খরচ জনগণের ওপর স্থানান্তরের একটি প্রক্রিয়ামাত্র।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সমস্যার মূল শুধু জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি নয়; বরং অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্র, একপাক্ষিক বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, উচ্চ সক্ষমতা চার্জ, দুর্বল পরিকল্পনা এবং অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে খাতটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দায়মুক্তির আইনে করা সব অসম বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি করা হয়। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের এক কমিটি এই চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে এক প্রতিবেদন দেয়। ‘ব্যয়বহুল চুক্তির ফাঁদে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন: শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও মুনাফা লুটের প্রক্রিয়া’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়—
ক) দীর্ঘ দেড় দশক ধরে অতিরিক্ত দামে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং দুর্বল তদারকি এই খাতের সংকটের মূল কারণ। এর ফলে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ বা পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। এটা পুরো দেশের অর্থনীতির জন্য একটা বড় ফাঁদ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
খ) ২০০৯ সালের পর থেকে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেলেও এর ব্যবহার হার এখনো মাত্র ৪০–৫০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। ফলে ৭,৭০০–৯,৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা অলস পড়ে আছে।
গ) এই অলস ক্ষমতার বিদ্যুতের জন্যও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। বিদ্যুৎ নেই, অথচ পুষতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। তরল জ্বালানি ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসমূহে এই ক্যাপাসিটি চার্জ হচ্ছে প্রতি মাসে প্রতি কিলোওয়াটে প্রায় ১২ মার্কিন ডলার (১৪৭৬ টাকা/কিলোওয়াট/মাস প্রায়)। আর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসমূহে ক্যাপাসিটি চার্জ হচ্ছে প্রতি মাসে প্রতি কিলোওয়াটে প্রায় ২৫ মার্কিন ডলার (৩০৭০ টাকা/কিলোওয়াট/মাস প্রায়)। শুধু ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদই বছরে আনুমানিক ৯৯–১৬৫ বিলিয়ন টাকা ব্যয় হচ্ছে।
ঘ) এই দুরাবস্থার কাফফারা হিসেবে পূর্ণ ব্যয় সমন্বয় করতে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হতে পারে, যা বাংলাদেশের শিল্পখাতের বিদ্যুৎকে এই অঞ্চলের অন্যতম ব্যয়বহুল করে তুলবে এবং শিল্প হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করবে।
ঙ) আদানি পাওয়ার লিমিটেড, এস এস পাওয়ার, সামিট গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে অপ্রয়োজনীয় ও অতিমূল্যের চুক্তির মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা তৈরির জন্য ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের মধ্যে পদ্ধতিগত যোগসাজশ ছিল। এটা একটা সমন্বিত দুষ্টচক্রের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হিসেবে সক্রিয় থেকেছে।
এসব সংকটকে আমলে না নিয়ে গ্রাহকের পকেট থেকে বাড়তি টাকা নিয়ে সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং সংকট বাড়বে বহুগুণে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে সাধারণ যুক্তি হলো, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন এই ব্যবধান তৈরি হলো? এটা তৈরি হলো কারণ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া চুক্তি, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়, অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্বল চাহিদা পূর্বাভাসের কারণে খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে আজ যে ভর্তুকির বোঝা তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় অংশ নীতিগত দুর্বৃত্তায়িত সিদ্ধান্তের ফল। এই অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মূল সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যার দায় জনগণের ওপর চাপানোর পুরনো প্রচেষ্টার পুনরাবৃত্তি মাত্র। শেখ হাসিনার শাসনামলে চালু হওয়া এই প্রক্রিয়াকেই জীবন্ত করে তুলল বর্তমান সরকার।
অযৌক্তিক চুক্তির পুনর্বিবেচনা, সক্ষমতা চার্জ কমানো, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা, উৎপাদন পরিকল্পনার দক্ষতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার না ঘটিয়ে নতুন সরকার হাঁটল পুরনো পথেই।
বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অদক্ষতা, ভুল পরিকল্পনা, অলস সক্ষমতার জন্য প্রদত্ত অর্থ, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে যে আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার বড় অংশের বোঝা আজ সাধারণ গ্রাহকের কাঁধে চাপানো হচ্ছে। যে সংকটের জন্ম নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা ও কাঠামোগত সমস্যায়, তার মূল্য কেন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ দেবে—এই প্রশ্নের সুরাহা না করে তার দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এই পুরনো প্রথা অনৈতিক ও অযৌক্তিক।
সাধারণ মানুষ এখন দেখছে যে তাদের আয় বাড়ছে না, কিন্তু বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও খাদ্যের খরচ বাড়ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা বুঝতে পারছে যে রাষ্ট্রীয় লুণ্ঠনের বিচার না করে সেই বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রমাণিত হচ্ছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় আর লুণ্ঠনমূলক মুনাফার ফলে লাভ হবে মুনাফাখোরদের, আর তার দায় মেটাতে হবে জনগণকে। সরকার এখানে লুণ্ঠনকারীদেরই সহযোগিতা করছে!
বিদ্যুতের দাম বাড়ার পরও সেবার মান প্রত্যাশিত হবে না, লোডশেডিং চলবেই, অদক্ষতা বহাল থাকবে, গ্রাম ও শহরে বিদ্যুৎ বিতরণে পাহাড়সম বৈষম্য সচল থাকবে—কিন্তু শুধু জনগণকে বিদ্যুতের অতিরিক্ত দাম বহন করতে হবে। সরকারের উচিত ছিল এই খাতে সংঘটিত দুর্নীতির তদন্ত করা, অস্বচ্ছ চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা, অপচয় কমানো এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা। সেসব না করে কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে সহজ পথ হিসেবে সরকার মূল্যবৃদ্ধির পথকেই বেছে নিয়েছে। এক্ষেত্রে সংসদে সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর জনবিবেচনার চাইতে শক্তিমান হয়ে দেখা দিয়েছে। এই ভাবনা রাজনৈতিকভাবে তো বটেই, জনসন্তুষ্টির নিরিখেও বিপজ্জনক।
শুভ কিবরিয়া লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। যোগাযোগ: [email protected]