Published : 03 Jun 2026, 12:23 PM
ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে গত এক দশকের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি-এনসিপির ভাঙন। একসময় যে দলগুলো নিজেদের আদর্শ, মজবুত সংগঠন ও দৃঢ় নেতৃত্বের জন্য পরিচিত ছিল, ওই দলগুলোর ভেতরেই একদিন ক্ষমতা ও উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর ফলে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে শিবসেনার একটি বড় অংশ আলাদা হয়ে যায় এবং অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বে এনসিপিও দু-ভাগে ভাগ হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এই বিভাজন কেবল কয়েকজন নেতার দলত্যাগ ছিল না; বরং ‘আসল দল কারা?’—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সেখানে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।
আজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত মহারাষ্ট্র মডেলের ছায়া। প্রশ্ন উঠছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বর্তমান তৃণমূল কি একই ধরনের সাংগঠনিক সংকটের মুখোমুখি? দলটির ভেতরে কি সত্যিই ‘আমরা’ ও ‘ওরা’ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে? আর যদি তাই হয়, তবে এর রাজনৈতিক পরিণতি কী হতে পারে?
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল সাধারণ কোনো মতপার্থক্য নয়। এটি দলের ভেতরের ক্ষমতার লড়াই এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষকে সামনে এনেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিধায়কদের সই করা প্রস্তাবে জালিয়াতি করা হয়েছে। এই ঘটনা তদন্তে সিআইডির তৎপরতা এবং বেশ কয়েকজন নেতার প্রকাশ্য ক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাজনীতিতে কোনো সংকটই হঠাৎ করে আসে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অবিশ্বাস আর নেতৃত্বের প্রশ্ন। তৃণমূলের ক্ষেত্রেও গত কয়েক বছর ধরে ‘কালীঘাট বনাম ক্যামাক স্ট্রিট’, ‘প্রবীণ বনাম নবীন’ কিংবা ‘সংগঠন বনাম পরিবারতন্ত্র’—এমন নানা আলোচনা বারবার শোনা গেছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এত দিন এসব আলোচনাকে পাত্তা না দিলেও, সাম্প্রতিক নির্বাচনি ধাক্কার পর ওই অসন্তোষ যেন নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
ভারতের আঞ্চলিক দলগুলোর ইতিহাস ঘাঁটলে একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা যায়—প্রতিষ্ঠাতা নেতার জনপ্রিয়তার জোরে দল দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকে ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী নেতা কে হবেন তা পরিষ্কার না থাকলে সংকট তৈরি হয়। মহারাষ্ট্রে শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের পর উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বকে সবাই মেনে নেয়নি। এনসিপিতে শরদ পাওয়ারের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অজিত পাওয়ারের ক্ষমতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আটকে রাখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলেও আজ একই প্রশ্ন সামনে এসেছে। দল কি শুধুই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে চলবে, নাকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে তৃণমূলের সবচেয়ে প্রভাবশালী দ্বিতীয় নেতা। সাংগঠনিক দক্ষতা, নির্বাচনি কৌশল আর যুবসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা—সব মিলিয়ে তাকে দলের ভবিষ্যৎ মনে করা হয়। কিন্তু রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা আর অধিকার এক জিনিস নয়। দলের প্রবীণ নেতাদের একাংশ মনে করেন, তাড়াহুড়ো করে ক্ষমতা হাতবদল করার চেষ্টা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে অভিষেককে নিয়ে দলে যেমন সমর্থন আছে, তেমনি সংশয়ও কম নেই। সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনের পর তা বিরোধে রূপান্তরিত হয়েছে। ৫৯ জন বিধায়কের সমর্থনের চিঠি নিয়ে বিধানসভায় এসেছেন তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এককালের বামপন্থা অনুসারী ঋতব্রতের এমন কাণ্ড নতুন নয়, তখন সিপিআইএম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তৃণমূলে এসেছিলেন। তৃণমূলে অভিষেক অনুসারী বলে পরিচিত ঋতব্রতের নেতৃত্বে একে একে হাজির হচ্ছেন দলের অন্য বিধায়কেরাও। তাদের মধ্যে রয়েছেন অরূপ রায়, শিউলি সাহা এবং আখরুজ্জামান।
তবে মহারাষ্ট্রের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পার্থক্য অবশ্য কম নয়। শিবসেনা বা এনসিপির মতো তৃণমূলে এখনো এমন কোনো শক্তিশালী বিকল্প নেতা তৈরি হননি, যিনি একনাথ শিন্ডে বা অজিত পাওয়ারের মতো বিদ্রোহ করতে পারেন। তৃণমূলের প্রায় সব বড় নেতাই তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও জনপ্রিয়তার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই সরাসরি বিদ্রোহের ঝুঁকি নেওয়া তাদের জন্য মোটেও সহজ নয় বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু ঝুঁকিটা নিতে চলেছেন ঋতব্রত।
রাজনীতিতে অনেক সময় ব্যক্তির চেয়ে পরিস্থিতি বড় হয়ে দাঁড়ায়। কোনো দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ যদি মনে করেন যে বর্তমান নেতৃত্ব তাদেরকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, তবে তারা বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন। ওই পথ যে সব সময় অন্য দলে যোগ দেওয়া, তা নাও হতে পারে। মহারাষ্ট্রে যেমন ‘আসল শিবসেনা’ বা ‘আসল এনসিপি’র দাবি তুলে নতুন দল করা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গেও তাত্ত্বিকভাবে ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে একটি অংশ আলাদা হওয়ার চেষ্টা করতেই পারে।
এখানে বিজেপির ভূমিকা নিয়েও ভাবা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের প্রধান বিকল্প হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা হয়তো বুঝতে পেরেছে, সরাসরি দল ভাঙানোর রাজনীতি সব সময় লাভজনক হয় না। বরং প্রতিপক্ষের ঘরের ভেতর কোন্দল তৈরি করতে পারলে বেশি ফায়দা পাওয়া যায়। মহারাষ্ট্রে বিজেপি এই সুযোগটিই নিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গেও যদি তৃণমূলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাড়ে, তবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বিজেপিই।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী করবেন? পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তিনি শুধু একজন দলীয় নেত্রী নন, নিজেই একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলের উত্থান, লড়াই আর ক্ষমতায় আসা—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। তাই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সংকট সামলানোর ক্ষমতাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
মমতার সামনে এখন দুটি পথ খোলা। প্রথমত, কঠোর হাতে ভিন্নমত দমন করা। দ্বিতীয়ত, দলের ভেতরের ক্ষোভকে মেনে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা। ইতিহাস বলে, প্রথম পথটি সাময়িকভাবে কাজে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে দলের ভেতরের ফাটল আরও বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয় পথটি কঠিন হলেও দলকে বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
তৃণমূলের বর্তমান সংকট আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন। ভারতের প্রায় সব আঞ্চলিক দলই এখন প্রতিষ্ঠাতা-নির্ভর রাজনীতি থেকে উত্তরাধিকার-নির্ভর রাজনীতিতে পা রাখছে। আর এখানেই পরিবার, সংগঠন, আদর্শ ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে বড় সংকট। পশ্চিমবঙ্গও ওই বাস্তবতার বাইরে নয়।
মহারাষ্ট্রের ঘটনা হুবহু পশ্চিমবঙ্গেও ঘটবে, এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে যে লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বিরোধী দলনেতা নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, বিধায়কদের অনুপস্থিতি, প্রবীণ নেতাদের ক্ষোভ আর ‘আসল তৃণমূল’ প্রতিষ্ঠার গুঞ্জন—সব মিলিয়ে দলের ভেতরের অস্বস্তি এখন পরিষ্কার।
শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি মাত্র প্রশ্নের ওপর, দলটি কি শুধুই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপর টিকে থাকবে, নাকি সব ধরনের মতকে জায়গা দিয়ে একটি সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক দলে পরিণত হবে? যদি তারা দ্বিতীয় পথ বেছে নিতে না পারে, তবে মহারাষ্ট্রের উদাহরণ কেবল আশঙ্কাই থাকবে না, বাস্তবেও রূপ নিতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির আগামী অধ্যায় তাই শুধু বিজেপি বনাম তৃণমূলের লড়াই নয়, বরং তৃণমূলের ভেতরের লড়াইও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। আর এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাজ্যের আগামী দিনের রাজনীতির ভাগ্য।
প্রশান্ত কুমার শীল গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক