Published : 09 Feb 2026, 09:50 AM
আমি জাতীয়তাবাদী নই। জাতীয়তাবাদ মানুষকে অনেক সময় জেনোফোবিক বা অন্য দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষী করে তোলে, যা অপরাধ থেকে শুরু করে জেনোসাইড পর্যন্ত সংঘটন করতে পারে। তাই নিজ জাতি বা দেশের প্রতীক ও জাতীয় সংগীতসহ নানা বিষয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা থাকলেও কোনো উগ্র অহংবোধ নেই। বরং এর বিপরীতে, অন্য যেকোনো দেশের জাতীয় সংগীত, প্রতীক, সংস্কৃতি বা অর্জনের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল।
পাকিস্তান এর ব্যতিক্রম নয়। হ্যাঁ, ১৯৭১ সালে বাংলার মাটিতে পাকিস্তানের নৃশংস গণহত্যার জন্য দেশটির রাষ্ট্রীয় আচরণের প্রতি আমার অশ্রদ্ধা আছে, আছে ক্ষোভও। চাই তারা ক্ষমা প্রার্থনা করুক। তাই বলে প্রতিটি পাকিস্তানি নাগরিককে ঘৃণা করার পক্ষে নই। একইসঙ্গে, ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য দেশটিকে চিরবৈরী করে রাখাকেও যৌক্তিক বলে মনে করি না। আধুনিক বিশ্বে মানুষ চিরবৈরিতা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে না; এটা সভ্য আচরণ নয়।
অন্য দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি আমি যেমন শ্রদ্ধা অনুভব করি, ঠিক তেমনি আমার দেশ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের প্রতিও আমার বিশেষ অনুরাগ রয়েছে। স্পষ্ট মনে আছে, স্কুলে অ্যাসেম্বলিতে সুর করে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়ার চেষ্টা করতাম। সিনেমা হলে গিয়ে পর্দায় পতাকা ভেসে উঠলে সম্মান জানিয়ে দাঁড়াতাম। এমনকি চুরি করে অপরাধী মন নিয়ে সিনেমা হলে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি সিনেমা দেখতে গিয়েও জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়াতে ভুলে যেতাম না। কলেজেও মাঝে মাঝে অ্যাসেম্বলি হতো, সেখানেও জাতীয় সংগীত গাইতাম; যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে আর জাতীয় সংগীত গাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকেনি।
বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশ খুবই নগণ্য ও অগুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। সারাবিশ্বে আমরা পানির দরে শ্রম বিক্রি করি। আমরা অভাবী, অসৎ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভীষণ প্রতিক্রিয়াশীল। বিশ্বদরবারে আমাদের অহংকার করার উপলক্ষ খুবই কম; ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্য তো খুবই সামান্য। যদিও জনসংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম। প্রায় অর্ধেক পৃথিবীজুড়ে বিস্তার করা রাশিয়ার চাইতেও বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি। যাই হোক—এমন বাস্তবতায় আমাকে সামান্য হলেও স্বস্তি দিত বিশ্ব পর্যায়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে একমাত্র ক্রিকেটে আমাদের বিচরণ আছে। আছে একটি বয়সভিত্তিক বিশ্বকাপ ও নারীদের আঞ্চলিক শিরোপা। এই সাফল্য নিশ্চিতভাবেই নগণ্য; তারপরও ক্রীড়াঙ্গনের শ্রেষ্ঠ সাফল্য হিসেবে বাংলাদেশ নিয়মিত বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে আসছে সেই ১৯৯৯ সাল থেকে। প্রতিটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচে জাতীয় সংগীত বাজত। সেই সঙ্গে এক শিহরণ খেলে যেত স্নায়ুতে। গর্ব ও ভালোবাসায় বুক ভরে উঠত। কিছুটা হলেও হৃদয়ে শান্তির পরশ বুলিয়ে যেত। ম্যাচের সময় যেখানেই থাকতাম—মনে মনে ঠোঁট মেলাতাম ‘আমার সোনার বাংলা’য়। নিজেকে মনে হতো বাংলাদেশ দলের অবিচ্ছেদ্য একজন। কিন্তু রাজনীতির মারপ্যাঁচ ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলার জাতীয় সংগীত গাওয়ার এবং সামান্য শিহরিত হওয়ার সুযোগ ছিনিয়ে নিল। এটা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার জন্য চরম আক্ষেপ ও বেদনার।
ক্রিকেট এখন ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের ময়দান। সেখানে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি বাংলাদেশ। এই সিদ্ধান্তকে নানাভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ আছে; তবে আমি একজন সামান্য নাগরিক হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বলে মনে করি, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিপন্ন করবে বলে আমার ধারণা। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা—অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বদরবারে আমার জাতীয় সংগীত গাওয়ার সুযোগ কেড়ে নিয়েছে।
পরিবর্তিত বাস্তবতায় বর্তমানে ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু ও সহায়ক হলো পাকিস্তান। অনেকেই বলে থাকেন—বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জনের পেছনে পাকিস্তানের হাত আছে। সেখান থেকেই হয়তো অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তান ইতিমধ্যে বিশ্বকাপে ভারতের ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও অনেকের আশা ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানও বিশ্বকাপ বর্জন করবে; কিন্তু না, পাকিস্তান তা করেনি। অনেকেই বলছেন, পাকিস্তান যতই ঘোষণা দিক না কেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি শিডিউল অনুযায়ী ভারতের সঙ্গে তারা কলম্বোতে ঠিকই ম্যাচ খেলতে নামবে। কারণ ওই ম্যাচ বয়কটের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। যাই হোক, এই বিষয়গুলো নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলবেই। হয়তো বিশ্বকাপ বর্জনকারী বাংলাদেশের জন্যও ভবিষ্যতে কিছু সুখবর আসতে পারে।
কিন্তু বিশ্ব আসরে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সুযোগ হেলায় হারানো ও ম্যাচ খেলার আনন্দ থেকে ১৮ কোটি বাঙালিকে বঞ্চিত করার হিসাব কে দেবে? ৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তি ইংল্যান্ডকে প্রায় লজ্জাজনক পরাজয় উপহার দিয়েছিল নেপাল—যারা মাত্র বিশ্বদরবারে ক্রিকেট খেলছে। ম্যাচের শেষ দিকে লোকেশ বোম যখন জোফ্রা আর্চারকে উড়িয়ে মারছিলেন, তখন নেপালের দর্শকদের উল্লাস দেখেছেন কি? আমার ধারণা, শুধু স্টেডিয়ামে থাকা নেপালিরা নয়, পুরো দেশই উল্লাসে মেতেছিল লোকেশের ব্যাটিংয়ে। যাই হোক—এই আনন্দ তো আপনার আমারও প্রাপ্য ছিল। আমরাও তো মোস্তাফিজের কাটারে স্টাম্প উড়ানোর পর ‘ইয়েসসস’ বলে চিৎকার করতে পারতাম। অথবা লিটন দাসের টাক করে হওয়া একটা টাইমিংয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে উল্লাস করতে পারতাম। এখন আমরা বসে বসে নেপালের খেলা দেখি!
বিশ্বকাপের শুরুর দিন কবিগুরুর কলকাতায় বিশ্বমঞ্চে ‘আমার সোনার বাংলা’ বাজার কথা ছিল। কিন্তু রাজনীতির মারপ্যাঁচে তা হয়নি। বাংলাদেশের জায়গায় বেজেছে স্কটল্যান্ডের জাতীয় সংগীত। টিভি পর্দায় ইডেনের খাঁ খাঁ মাঠে স্কটিশ জাতীয় সংগীত আমার আক্ষেপই বাড়িয়েছে; মনে হয়েছে, ফাঁকা স্টেডিয়ামে কোথায় যেন গুমরে কাঁদছে—‘আমার সোনার বাংলা’।
ওহ হ্যাঁ, এই ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে কলম্বোতে ঠিকই বেজেছে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’—পাকিস্তানি জাতীয় সংগীত। তারা কিন্তু বিশ্বকাপ বয়কট করেনি। রাজনীতির কূটচালে বাংলাদেশের ক্রিকেট সত্যিই কোনো বড় আত্মবিনাশী সিদ্ধান্ত নিল কি না, তা পরিষ্কার হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। আশা রইল—হয়তো শিগগিরই কোনো বিশ্বকাপে আবার বাজবে: ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। অপেক্ষা, বড় নির্মম ও নিদারুণ অপেক্ষা।