Published : 25 Nov 2025, 01:12 PM
যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার খরচ অনেক বেশি। এ সূচকে আমাদের অবস্থান প্রায় তলানিতে। এই খরচ বাড়ার পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঘুষ-দুর্নীতি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারকেও দায়ী করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সুদহার বৃদ্ধির ফলে ব্যবসার খরচ কীভাবে বেড়েছে, তা কয়েক মাস আগে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) তুলে ধরেছিল। তাদের হিসেব মতে, সুদহার ৯% থেকে ১৪%-এ উঠে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত সুদ বাবদ খরচ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে গেলে অধিকাংশ উদ্যোক্তাই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করেন। পুঁজিবাজার থাকলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও নানা জটিলতায় সেখানে আসতে চান না নতুন-পুরোনো উদ্যোক্তারা। ফলে ব্যাংকের ওপরই চাপটা বেশি পড়ে।
এখানেই আমাদের অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে, যা বছরের পর বছর আলোচনায় উঠে আসছে। ব্যাংক সাধারণত স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেয়, কিন্তু ওই টাকায় যে বিনিয়োগ হয় তার রিটার্ন আসে দীর্ঘমেয়াদে। এই মেয়াদের অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানও ব্যাংক ঋণ নিয়ে শেষে খেলাপির খাতায় নাম লেখাতে বাধ্য হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করলে স্বল্প সময়ে টাকা ফেরত দিতে হয় না, খেলাপির ঝুঁকিও থাকে না। নির্দিষ্ট সময়ে শেয়ার হোল্ডারদের লভ্যাংশ দিলেই চলে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও জনসমক্ষে আসে, যা তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির ক্ষেত্রে অবশ্য বাধ্যতামূলক নয়।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, এই ঋণের সুদের হার আসলে কত হওয়া উচিত? সুদহার নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি, সঞ্চয়ের মাত্রা, বিনিয়োগের চাহিদা, ঝুঁকি, সময় এসব বিবেচ্য। সঞ্চয় বেশি ও বিনিয়োগের চাহিদা কম হলে সুদহার কমে; বিনিয়োগের চাহিদা বাড়লে বাড়ে। কারণ, তখন আগের তুলনায় বেশি ঋণ নেয়া হয়। আবার যখন ঋণের সুদহার বাড়ে তখন আমানতের সুদহারও বাড়ে। যদিও এখন আমানতের সুদহারের চেয়ে ঋণের সুদহার বেশি বাড়ছে।
অর্থনীতিতে ঝুঁকি বেশি থাকলে (রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ ইত্যাদি) যারা ঋণ নেবেন তাদেরকেই বেশি সুদ দিতে হয়। মুদ্রাবাজারে ঋণের চাহিদা বেশি হলেও সুদহার বাড়ে। কারণ, ঝুঁকির ফলে ব্যাংক হয়তো সময় মতো ঋণের টাকা ফেরত নাও পেতে পারে। এজন্য বাড়তি চার্জ দিতেই হবে। আবার, যদি মনে করা হয় ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়বে তাহলেও সুদহার বাড়ে।
আধুনিক অর্থনীতিতে সুদের হার বাজারের ওপরও নির্ভর করে। যদি মুদ্রাবাজারে ঋণ নেয়ার চাহিদা বেশি থাকে তাহলে অবশ্যই সুদের হার বাড়বে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগ কম থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে (৬ শতাংশের ঘরে) অবস্থান করছে। তারপরও সুদের হার বাড়ছে কেন?
কারণ সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। মানুষের হাতে বেশি টাকা গেলে খরচ বাড়ে, দ্রব্যমূল্য বাড়ে। আবার নতুন বেতন কাঠামো হলে ১৪ লাখ সরকারি কর্মীর হাতে অতিরিক্ত টাকা আসবে, সেটাও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে। সুদহার কম থাকলে টাকা সস্তা হয়, ঋণ নেওয়া বাড়ে, অনেকে পুরোনো ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নেন, এতেও টাকার প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এই প্রবাহ কমাতেই সুদহার বাড়ানো হচ্ছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গড় ঋণের সুদহার ছিল সাড়ে ৯%-এর কিছু বেশি; এখন তা সাড়ে ১২%-এর কাছাকাছি, কোথাও কোথাও ১৫% ছাড়িয়েছে। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই এসে পড়ছে। তাই ব্যবসায়ীরা সুদহার কমানোর দাবি জোরালো করছেন।
তবে সুদহার বাড়ানোর পেছনে কেবল মূল্যস্ফীতি নয়, রাজনৈতিক কারণও আছে। আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদহারের অভিযোগ তুলে চাপ দিয়েছিলেন। ওই চাপে সরকার ঋণের সুদ ৯% এবং আমানতের সুদ ৬% বেঁধে দিয়েছিল, যা ‘নয়-ছয়’ নীতি নামে পরিচিত এবং ব্যাপক তছরুপের সুযোগ করে দিয়েছিল। ওই সুযোগে সরকার-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী চক্র বিপুল ঋণ নেন, যার বেশিরভাগই খেলাপি হয়। বর্তমানে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এখন বাংলাদেশেই মোট বিতরণ করা ঋণের তুলনায় খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি। কীভাবে ঋণ জালিয়াতি হয়েছে তা আমাদের কাছে এখন বহুল চর্চিত বিষয়। এই ঋণের অর্থ বিনিয়োগের কথা বলে নিলেও শেষপর্যন্ত তা অনেকেই ভিন্ন খাতে ব্যবহার করেছেন। এর বিপুল অংশ বিদেশে পাচারও হয়েছে।
যে কারণে বিগত সরকারের সময় অর্থনীতি ছিল কর্মসংস্থান বিহীন উচ্চ প্রবৃদ্ধির। ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে তৎকালীন সরকার নয়-ছয় সুদহার চালু করে। ওই অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি দেখানো হয়েছিল সাড়ে ৫ শতাংশ। এই তথ্য যে জালিয়াতিপূর্ণ ছিল তা অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র কমিটিই বলেছে।
২০২২, ২০২৩ কিংবা ২০২৪ সালের দিকে দেখা যায় সুদের হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম ছিল। অর্থাৎ প্রকৃত সুদহার ছিল ঋণাত্মক। এর মানে দাঁড়ায় মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ব্যবসায়ীরা তাদের নেয়া ঋণের বিপরীতে আসলে কোনো সুদই পরিশোধ করেননি। ৫ অগাস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নতুন সরকার ওই সুযোগ সংকুচিত করার জন্যও সুদের হার বাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক তত্ত্ব বলে, সুদহার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বড় কারণ সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, সরবরাহে সমস্যা। এগুলোর সমাধান না করে কেবল সুদহার বাড়ালে বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় সুশাসন। রাজনীতি ও প্রশাসনে সুশাসন না থাকলে বাজার কখনোই সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সুদহার নির্ধারণ করতে পারবে না।
আগামী নির্বাচিত সরকার যখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর কথা বলবে, তখন সুদহারের বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে হবে। আগের মতো ‘নয়-ছয়’ ধরনের কৃত্রিম সুদহার বেঁধে দেওয়া যাবে না। বরং সুশাসন বাড়িয়ে, স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে বাজারকেই সুদহার নির্ধারণ করতে দিতে হবে। এর জন্য দরকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে গভীর সংস্কার, যা দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য অপরিহার্য। না হলে পুরোনো সমস্যাগুলো আবার ফিরে আসতে বাধ্য।