Published : 09 Apr 2026, 01:29 PM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গেল মঙ্গলবার ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ রাতেই পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’ তবে পরে তিনি স্বয়ং সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হন এবং হুমকি বাস্তবায়নের পরিবর্তে দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।
এই যুদ্ধবিরতির ফাঁকে মার্কিন, ইসরায়েল এবং ইরান—বিবদমান এই পক্ষগুলো শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে। পরিহাসের বিষয় হলো, মার্কিন সামরিক শক্তি নিঃসন্দেহে অপ্রতিরোধ্য; কিন্তু ইরানই কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এই প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব পেট্রোল ও ডিজেলের আন্তর্জাতিক বাজারদর, এমনকি বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে, অতীতের যুদ্ধগুলোর মতো ইরান যুদ্ধেও আমেরিকার ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। অন্যভাবে বললে, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও সুস্পষ্ট সামরিক জয় বা কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনামে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকার পরাজয় ঘটেনি; সামরিক দিক থেকে মার্কিন বাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল। বরং পরাজয়ের বীজ বপন হয়েছিল মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এবং অসংখ্য পারিবারিক ডাইনিং টেবিলের আলোচনায়, যেখানে যুদ্ধ নিয়ে একের পর এক বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আটান্ন হাজার মার্কিন সৈন্যের মৃতদেহ সেই পরাজয়ের বাস্তবতাকে আরও বেগবান করে তুলেছিল।
আফগানিস্তান যুদ্ধেও মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় ছিল, কিন্তু তা চূড়ান্ত জয়ের জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি। দুই দশকের ব্যর্থ ‘জাতি গঠন’ প্রচেষ্টায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে কেবল দুর্বল মার্কিনপন্থী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তালেবানের ইস্পাতসম মনোবলের সামনে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো টেকেনি।
২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের পর সাদ্দাম হোসেনের রেজিম অপসারণে মার্কিনিরা সফল হলেও, সেই প্রক্রিয়া দেশটিকে গভীর বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত করে। এর পরিণতি পরবর্তী দুই দশক ধরে সমগ্র অঞ্চলে অস্থিতিশীলতাকে আরও উসকে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তা মার্কিন ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য বুমেরাং হয়ে ওঠে।
এই ব্যর্থতাগুলোর একটি প্রধান কারণ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ ও শান্তি সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলেন না। সামরিক শক্তি প্রয়োগের শর্ত ও পরিণতি সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান ও বোঝাপড়া সীমিত ছিল। যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে তাঁরা যেসব অনুমান করেছিলেন, সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন বা প্রশ্ন তোলা হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মার্কিন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে অকাট্য ধরে নেবার অহংকার। এছাড়া প্রভাবশালী ‘গোষ্ঠীচিন্তা’ এবং সম্ভাব্য সকল ফলাফল যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা ছিল। এই সবকিছুই কৌশলগত পর্যালোচনায় গুরুতর ভুলের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।
এখন স্পষ্ট যে, অতীতের ব্যর্থতাগুলো ইরানের যুদ্ধকেও কলুষিত করেছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিটি যুদ্ধ ও মহড়ার সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, কেউ কি ট্রাম্পকে এই সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছিল নাকি তিনি সেই পরামর্শ উপেক্ষা করেছিলেন? এবং কেন তিনি যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন বা তাঁর ভাষায় ইরানে একটি ‘অভিযান’ শুরু করলেন—যা ছিল রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সেই বাজে ধারণার পুনরাবৃত্তি যে, কয়েক দিনের মধ্যেই কিয়েভের পতন হবে?
সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা এসেছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছ থেকে। তিনিই সর্বপ্রথম স্বীকার করেছিলেন এবং পরে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন যে, ইসরায়েল ইরানে হামলার একেবারে কাছাকাছি ছিল এবং মার্কিন প্রতিরোধমূলক হামলার বাইরে ভিন্ন কোনো পথ তাদের জন্য খোলা ছিল না।
তবে যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্য প্রতিরোধমূলক হামলা অযৌক্তিক। মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলকে সোজাসাপ্টা বলতে পারত—হামলা শুরু করা হবে কি না, এটি সম্পূর্ণ ইসরায়েলের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের ছিল অহংকার এবং বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা। এমনকি ইসরায়েলিরা ট্রাম্পের কাছে সিদ্ধান্ত নিতে যাওয়ার পূর্ব থেকেই তাদের অবস্থান অনিশ্চিত ছিল। স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ছিলেন প্রধান সমঝোতাকারী, কিন্তু তাদের নিউক্লিয়ার সরঞ্জাম ও কৌশলগত প্রযুক্তি নিয়ে জ্ঞান ছিল অপ্রতুল; যা ইরানিদের সঙ্গে ফলপ্রসূ সমঝোতায় তাদের ব্যর্থ করে দিয়েছে।
হোয়াইট হাউজ ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ও উন্নত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুতি একেবারে অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করা হচ্ছিল। আরও বেশি ক্ষতিকর হলো, ভেনেজুয়েলার অপারেশনের সফলতা এবং মার্কিন সামরিক শক্তি নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা ট্রাম্পকে অন্ধ করেছিল। তিনি ইসরায়েলের ‘হাতি দর্শন’ বয়ান বিশ্বাস করছিলেন যে, তেহরানের পতন খুব সন্নিকটে।
বাস্তবতা এখন সব সমীকরণকে ভন্ডুল করে দিয়েছে। যুদ্ধের প্রতিটি ব্যাটেল (যুদ্ধাংশ) জেতার মানে পুরো যুদ্ধ জেতা নয়। উত্তর ভিয়েতনামিজ এবং তালেবানদের মতোই ইরানের যুদ্ধ জেতার কৌশল ছিল না, ছিল ‘হেরে জেতার’ মানসিকতা। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া প্রমাণ করে, ইরানিরা তাদের সবচেয়ে ভীতিকর অস্ত্র এমনভাবে ব্যবহার করেছিল যে, এর ফলে ২০ শতাংশ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, চিপ তৈরির জন্য হিলিয়াম এবং সার উৎপাদনের জরুরি ফসফেট রপ্তানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ইরানের দিক থেকে পরিষ্কারভাবে এর ফলাফল ছিল সংঘাত দীর্ঘায়িত করা। এই অবস্থাই ছিল বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য যথেষ্ট।
ইরানের সফলতার মানদণ্ড মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার সংখ্যা বা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাতের হিসাব ছিল না। বরং তাদের কৌশল ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যে পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা।
ইরান যুদ্ধ শুরু থেকেই মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে হালে পানি পায়নি; প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক এ যুদ্ধের বিপক্ষে ছিল। পেট্রোলের বাড়তি দাম এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সামাজিক অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।
এখন ট্রাম্প দুটি অসন্তোষজনক বিকল্পের মুখোমুখি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনের মতো ট্রাম্পকেও হয় ইরানের শর্ত মেনে যুদ্ধ শেষ করতে হবে অথবা উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয় পথটি গ্রহণ করলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হবে এবং তা আমেরিকাকে এক চিরস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।
আপাতত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ‘যুদ্ধের চেয়ে বাকযুদ্ধ ভালো’ নীতি অনুসরণ করার পথ বেছে নিয়েছেন। তবে তিনি যে সিদ্ধান্তই নেন না কেন, নিজেই ‘ভালো বিকল্প না থাকার’ জালে আটকে গেছেন। এই কারণেই ইরান যুদ্ধ প্রমাণ করবে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তটি তিনি নিয়েছিলেন।
লেখাটি আল-জাজিরা থেকে অনূদিত; লেখক হারলান উলম্যান ওয়াশিংটন ডিসির আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি কৌশলগত পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান কিলওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান। ফিল্ড মার্শাল লর্ড ডেভিড রিচার্ডসের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ‘Who Thinks Best Wins: How Decisive Strategic Thinking Will Prevent Global Chaos’ বইটি লিখেছেন।