Published : 17 Jun 2026, 11:28 AM
আমাদের বাসার সবচেয়ে ছোট সদস্যটির গায়ে এই মুহূর্তে ব্রাজিলের জার্সি শোভা পাচ্ছে। সাম্বার পুরোনো ছন্দ কিংবা বর্তমানে হারিয়ে ফেলা ব্রাজিলসুলভ জৌলুশ নিয়ে ফ্যানদের মধ্যে যে হাহাকার আর অস্বস্তি, তা বোঝার বয়স তার হয়নি। অথচ, তার গায়ে ব্রাজিলের জার্সিটি উঠেছে একটাই কারণে—তার বাবা একজন পাঁড় ব্রাজিলভক্ত।
এই দৃশ্যটি নিছক পারিবারিক মজার ঘটনা নয়। বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপে দল সমর্থনের সংস্কৃতি বোঝার জন্য এটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উন্মাদনার কেন্দ্রে রয়েছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। বাংলাদেশ জাতীয় দল বিশ্বকাপে না খেললেও বিশ্বকাপ এলেই সেই আবেগের স্রোতে বাংলাদেশ ভাসে। গ্রামের রাস্তা, শহরের ছাদ, চায়ের দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, ফেসবুক টাইমলাইন—সবকিছু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা আর রঙে ছেয়ে যায়। জার্সির দোকানে ভিড় জমে, রাত জেগে খেলা দেখা হয়, আর প্রিয় দলের অর্জনের উদ্যাপন কিংবা হারের আবেগের প্রকাশে মনে হয়, এ যেন খুব আপন কারও জয়-পরাজয়।
কিন্তু এমন আবেগঘন সমর্থন, যার সঙ্গে জুড়ে যায় হাসি-কান্না কিংবা সম্মানের প্রশ্নও, সেখানে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি পরিবার, বন্ধুমহল ও চারপাশের মানুষের প্রভাব ঠিক করে দেয় কে কোন দলকে সমর্থন করবে। আর এই সমর্থন এতটাই শক্ত হয়ে সমর্থকের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে যায় যে, এই সমাজে চাইলেই তা বদলে ফেলা যায় না। ফলে ম্যারাডোনার খেলা দেখে আর্জেন্টিনার প্রেমে পড়া সমর্থককে যেমন ৩৬ বছর আরেকটি বিশ্বকাপের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, নিন্দুকের নানা কথা সহ্য করতে হয়; তেমনি সেই সমর্থকের উত্তরাধিকারী সন্তানকেও একই আবেগ, একই অপেক্ষা বহন করতে হয়। চাইলেই সে অন্য দলের সমর্থক হয়ে যেতে পারে না।
তবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থনের যে ঐতিহাসিক দ্বৈরথ এতদিন চলে এসেছে, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে একটি পরিবর্তন চোখে পড়ছে। নতুন প্রজন্মের একটা অংশের মধ্যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বাইরেও সমর্থক তৈরি হচ্ছে। কেউ ফ্রান্সকে সমর্থন করছে এমবাপ্পের জন্য, কেউ পর্তুগালকে রোনালদোর লিগ্যাসির জন্য, কেউ আবার ব্রাজিলের কাছাকাছি চার বিশ্বকাপ জেতা জার্মানি নিয়েও উদ্বেলিত হচ্ছে; যেখানে কোনো বিশেষ তারকার প্রতি আবেগের চেয়ে বেশি কাজ করছে দলীয় পারফরম্যান্সের প্রতি মুগ্ধতা।
এই পরিবর্তনকে কি কেবল ‘নতুন প্রজন্ম একটু আলাদা’—এই সরল ব্যাখ্যায় আটকে ফেলা যায়? নাকি এই অঞ্চলের সামগ্রিক ফুটবল খেলা দেখা, বোঝা ও সমর্থনের সংস্কৃতিতেই একটা পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে?
বিশ্বকাপ ফুটবল বরাবরই আমাদের জনপদে হাজির হয়েছে মিডিয়ার মাধ্যমে। বিশ্ব কাঁপানো সব তারকাকে দেখা হয়েছে, জানা হয়েছে পত্রিকার পাতায়, ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যায়, পোস্টারে, টিভির স্ক্রিনে। ফলে বাংলাদেশের বড় একটি অংশের কাছে ফুটবল শুধু দেখা না; এর বাইরে ফুটবল একটি গল্প, স্মৃতি, বর্ণনা ও কল্পনারও বিষয়।
পেলেকে ফুটবল-শিল্পের প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, ম্যারাডোনাকে দেখা হয়েছে একা একটি জাতির স্বপ্ন কাঁধে নেওয়া নায়ক হিসেবে। এসব কালজয়ী বর্ণনা তাদের ঘিরে যে ফুটবলীয় আবেগ তৈরি করেছে, তা শুধু ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আসেনি। টিভি পর্দা, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, পোস্টার, ঘরের ভেতরের গল্প আর বাইরের আড্ডা—সব মিলেই তা নির্মিত হয়েছে। মিডিয়া ফুটবলের যে ছবি নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়েছে, তার অর্থ তৈরি হয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক ব্যাখ্যার ভেতর দিয়ে। ব্রাজিলের গোল হয়ে উঠেছে সাম্বার ছন্দ, আর্জেন্টিনার লড়াই হয়েছে আবেগ, সংগ্রাম আর দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। টিভি হয়তো শুধু খেলাটাই দেখিয়েছে, কিন্তু পরিবার, পাড়া ও বন্ধুমহল সেই খেলার সামাজিক ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে আজকের ফুটবল-পরিচয়ের বাস্তবতা তৈরি করেছে।
যোগাযোগবিদ্যার দ্বি-ধাপ প্রবাহ তত্ত্ব বা ‘টু-স্টেপ ফ্লো থিওরি’ দিয়ে দেখলে এই প্রক্রিয়াটি আরও স্পষ্ট বোঝা যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মিডিয়ার বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে সবসময় সরাসরি পৌঁছে প্রভাব তৈরি করে না; বরং মাঝখানে কিছু ‘মত-মোড়ল’ বা ‘অপিনিয়ন লিডার’ থাকেন, যারা সেই বার্তাকে নিজেদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পক্ষপাত অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের ফুটবল বাস্তবতায় এই অপিনিয়ন লিডার বা মত-মোড়ল একটা সময় ছিলেন বাবা, বড় ভাই, চাচা, মামা, পাড়ার ফুটবলপাগল দর্শক, চায়ের দোকানের বিশ্লেষক কিংবা স্কুলের সেই বন্ধু, যে অন্য সবার চেয়ে একটু বেশি ফুটবল জানে, কিংবা কথায় খানিকটা পটু।
কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই প্রবাহ আগের মতো আর সরল নেই। এখন ফুটবল দেখা শুধু বিশ্বকাপের সময় টিভির সামনে বসে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন তরুণ আজকাল সারা বছর ফুটবল দেখে। সে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ দেখে, প্রিমিয়ার লিগ দেখে, লা লিগা দেখে, ইউটিউবে হাইলাইট দেখে, টিকটকে স্কিল ভিডিও দেখে, ফেইসবুক মিম দেখে, ফ্যান পেজে তর্ক করে, ফিফা খেলে। ফলে তার ফুটবল-জ্ঞান শুধু পরিবার বা পাড়ার ওই অপিনিয়ন লিডারদের মাধ্যমে তৈরি হয় না; তৈরি হয় বৈশ্বিক ডিজিটাল ফুটবল সংস্কৃতির মধ্যে, যার সঙ্গে সে আজ নিজেই যুক্ত।
এখানে মার্শাল ম্যাকলুহানের বিখ্যাত ধারণা ‘মাধ্যমই বার্তা’ বা ‘মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ’ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ম্যাকলুহান বলছেন, একটা বার্তার পাশাপাশি বার্তাটি কোন মাধ্যমে আসছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাধ্যম শুধু তথ্য বহন করে না, তথ্যের অর্থ ও অভিজ্ঞতাকেও বদলে দেয়।
একসময় ফুটবল আমাদের কাছে এসেছে টিভির পর্দা, পত্রিকার পাতা, ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যা ও পোস্টারের মাধ্যমে। আর তা ব্যাখ্যা করেছে আমাদের আশপাশের মানুষেরা। তাই ফুটবল ছিল অপেক্ষার, গল্পের, স্মৃতির ও আড্ডার বিষয়। এখন ফুটবল আসে ইউটিউবের হাইলাইট, টিকটকের ১৫ সেকেন্ডের ক্লিপ, ফেইসবুকের মিম, ক্লাব ফুটবলের ফ্যান পেজ এবং গেমিং সংস্কৃতির মাধ্যমে। তাই ফুটবল হয়ে উঠছে আরও বেশি দৃশ্যনির্ভর, খেলোয়াড়কেন্দ্রিক এবং অনেক বেশি পার্সোনালাইজড।
এই মাধ্যমগত পরিবর্তন নতুন সমর্থনের বাস্তবতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। ঘরের বা পাড়ার ফুটবল বোদ্ধাদের জায়গায় চলে এসেছে ইউটিউব বিশ্লেষক, ফেইসবুক মিম পেজ, টিকটক কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ক্লাব ফুটবল ফ্যান গ্রুপ, নানা চ্যানেল যেখানে ফুটবলের কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা চলে, আছে গেমিং কমিউনিটিও। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যালগরিদমিক পরিবেশ, যা কোন খেলোয়াড় বা কোন দলের কনটেন্ট দর্শকের সামনে বেশি দৃশ্যমান হবে, তা প্রভাবিত করে। একজন তরুণ যদি নিয়মিত এমবাপ্পের ভিডিও দেখে, প্ল্যাটফর্ম তাকে আরও ফ্রান্স, পিএসজি বা রিয়াল মাদ্রিদ-কেন্দ্রিক গতিময় ফুটবল দেখাতে থাকে। ফলে সে শুধু এমবাপ্পের ভক্ত থাকে না, ধীরে ধীরে ফ্রান্স বা এমবাপ্পেকে ঘিরে তৈরি ফুটবল সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। এর বিপরীত ঘটতে পারে একজন বার্সেলোনা বা স্পেন ভক্ত হয়ে গড়ে ওঠা ব্যক্তির ক্ষেত্রে।
প্ল্যাটফর্ম-নির্ভর ডিজিটাল ফুটবল সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মকে নির্দিষ্ট খেলোয়াড়, ভাইরাল গোল, মিম, স্কিল ভিডিও ও ক্লাব ফুটবল কমিউনিটির মধ্য দিয়ে দল বেছে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। ফলে ব্রাজিল-আর্জেন্টনার উত্তরাধিকারভিত্তিক সমর্থন পুরোপুরি না ফুরিয়ে গেলেও তার একচেটিয়া সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বে কিছুটা ফাটল দেখা যাচ্ছে।
তবে প্রযুক্তিই সবকিছু ঘটাচ্ছে—এমনটা বললে সেটা দুর্বল ব্যাখ্যা হবে। কেননা প্রযুক্তি এখানে একক কারণ না, এর পেছনে আরও কিছু নিয়ামক রয়েছে। প্রজন্মগত ফুটবল সমর্থন থেকে বেরিয়ে নিজস্ব আত্মপরিচয় তৈরির ইচ্ছা তার একটি। আগের প্রজন্ম যেখানে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ভেতরেই নিজেদের ফুটবল পরিচয় খুঁজেছে, নতুন প্রজন্মের একটা অংশ সেই উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে নিজের পছন্দকে আলাদা করে দেখাতে চায়। এটা শুধু ফুটবলেই ঘটছে না, সমাজের আর দশটা ক্ষেত্র—পোশাক, ভাষা, মিউজিক, রাজনীতি, সম্পর্ক—সবখানেই ঘটছে। তাই ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, জাপান বা মরক্কো সমর্থন করাও এই নিজের পছন্দ বেছে নেওয়ার অংশ।
আবার বাংলাদেশের শহুরে তরুণদের বড় অংশ এখন গ্লোবাল ফুটবল কালচারের সঙ্গে যুক্ত। তারা শুধু বিশ্বকাপ দেখে না; ক্লাব ফুটবল দেখে, ইউরোপীয় ফুটবলারের জীবনযাপন দেখে, জার্সি পরে, ফ্যান পেজে থাকে, ফিফা খেলে। ফলে তাদের কল্পনার ভৌগোলিক মানচিত্রও বদলেছে। আগে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ছিল দূরের অথচ আবেগের দেশ; এখন ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগালও তাদের সাংস্কৃতিক কল্পনায় ঢুকে গেছে।
দেশকেন্দ্রিক সমর্থনের বাইরে খেলোয়াড়কেন্দ্রিক সমর্থনের ধারাও গড়ে উঠেছে। এমবাপ্পে, রোনালদো, লামিন ইয়ামালরা দেশের প্রতিনিধির পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডও। নতুন প্রজন্ম অনেক সময় দেশকে ভালোবাসার আগে খেলোয়াড়কে ভালোবাসে। খেলোয়াড়ের মাধ্যমে দেশকে পছন্দ করে। আধুনিক ‘সেলিব্রিটি কালচার’ও এখানে আছে।
বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থনকে বোঝার জন্য তাই কেবল মাঠের খেলা দেখা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে খেলা আমাদের কাছে কীভাবে আসে, কে সেই খেলার অর্থ তৈরি করে, কোন পরিবার কোন গল্প বলে, কোন পাড়ার আড্ডা কোন দলকে মহান বানায়, কোন অ্যালগরিদম কোন খেলোয়াড়কে সামনে আনে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বাইরেও নানা দলের সমর্থক গড়ে ওঠার গল্প তাই শুধু ফুটবলের গল্প নয়; এটি আমাদের মিডিয়া, সমাজ, পরিবার, প্রজন্ম এবং আত্মপরিচয়ের বদলে যাওয়ার গল্প।
শাহরিয়ার নোবেল যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডে জার্নালিজম স্টাডিজে পিএইচডি করছেন। ই-মেইল: [email protected]