Published : 30 Apr 2026, 04:16 PM
মুনিরা মাহজাবিন মিমোর মর্মান্তিক মৃত্যু এবং সুদীপ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ওঠা প্ররোচনার অভিযোগটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল সামাজিক বিষয়। একটি সম্ভাবনাময় প্রাণের এভাবে ঝরে যাওয়া নিঃসন্দেহে হৃদয়বিদারক। একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের পরিণতি যখন এমন বিষাদময় হয়, তখন জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়া এবং শিক্ষককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। গত কয়েক দিনের জনরোষ ও লেখালেখি হয়তো তার আইনি শাস্তির চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। আমাদের মনে রাখা দরকার অপরাধ প্রমাণের আগে এমন ‘সোশাল ট্রায়াল’ একজন নির্দোষকেও মৃত্যুর স্বাদ দিতে পারে।
সুদীপ চক্রবর্তীর বিচার যেমন আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া জরুরি, তেমনি এই পুরো ঘটনাটিকে কেবল 'দোষারোপের' ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে বিচার করা প্রয়োজন। আত্মহত্যা সাধারণত কোনো একটি তাৎক্ষণিক ঘটনার ফল হয় না; বরং এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা মানসিক অস্থিরতা বা ট্রমার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আমাদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, মিমো আগে থেকেই কোনো মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন কি না। কেবল বেঁচে থাকা মানুষটিকে এককভাবে দায়ী করার আগে এই মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটটি বোঝা জরুরি।
পাশাপাশি আমাদের সামাজিক কাঠামো কি এমন যে, একজন নারী তার সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারেন? মিমো কি তার বিপদের মুহূর্তে বিশ্বস্ত কোনো জায়গা বা সাহায্যের হাত পেয়েছিলেন? যখন সমাজ এই ধরনের সম্পর্ককে বাঁকা চোখে দেখে, তখন ভুক্তভোগী ব্যক্তি আরও বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়েন। আমাদের সমাজব্যবস্থায় অনেক সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অসম সম্পর্কের জটিলতাগুলো নিয়ে পরিবার বা বন্ধুদের কাছে মুখ খোলা সম্ভব হয় না। এই তীব্র একাকীত্ব বা ‘Isolation’ কি তাকে তিলে তিলে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে? লোকলজ্জার ভয় আর কথা বলার জায়গার অভাব অনেক সময় মানুষকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।
‘প্ররোচনার’ অপরাধ প্রমাণিত হলে সুদীপ চক্রবর্তী অবশ্যই সর্বোচ্চ শাস্তি পাবেন। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের ভাবা উচিত, সমাজ হিসেবে আমরা কতটা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি। কেবল একজনকে ‘ভিলেন’ বানিয়ে দায় না সেরে, এই ধরনের ট্র্যাজেডি রুখতে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এবং সামাজিক সহমর্মিতার জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করা এখন সময়ের দাবি।
আমরা যদি শুধু একজনকে দোষ না দিয়ে ভাবি যে আমাদের সমাজ কেন এমন পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে যেখানে একজন মানুষ ভুলের মাসুল হিসেবে মৃত্যুকে বেছে নিতে বাধ্য হয়, কেবল তাহলেই আমরা মিমোর মৃত্যুটাকে ভিন্ন একটি আঙ্গিকে ভাবতে পারব।
জীবিত সঙ্গী বা শিক্ষকটির দোষ কতটুকু, সেটা আইনি তদন্তে প্রমাণিত হবে। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তিনিও কিন্তু এক বড় ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, এটা আমরা ভুলে যাচ্ছি। তীব্র ঘৃণা ও জাজমেন্টের আবহে তার মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণের সুযোগ কেউ নিচ্ছেও না, দিচ্ছেও না। দোষারোপের বাইরে গিয়ে যদি আমরা তার মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করি, তবে হয়তো জানা যাবে তার পক্ষ থেকেও কোনো অসহায়ত্ব বা ভুল বোঝাবুঝি ছিল। সুদীপের চাওয়া সত্ত্বেও হয়তো সম্পর্কটা টেকেনি। হয়তো তাদের সম্পর্কের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা নিছকই ভুল বোঝাবুঝি।
মিমোর এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা যেন সবাই ‘বিচারকের’ আসনে বসে গিয়েছি। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আমরা সমস্ত দায় একজনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলেছি এবং তাকে একটি ‘বলির পাঁঠা’য় পরিণত করেছি। কিন্তু সত্য এই যে, আমাদের সমাজ যদি শুরু থেকেই শাস্তির বদলে ‘সহমর্মিতার’ জায়গায় থাকতো, তবে হয়তো এমন ট্র্যাজেডি ঘটার আগেই তা ঠেকানো সম্ভব হতো।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলেই হয়তো মিমো তার কষ্টের কথাগুলো কারও কাছে পৌঁছাতে পারেননি। কেবল একজনকে দোষারোপ করে পার না পেয়ে আমাদের ভাবা উচিত—আমরা কি আসলেই তাকে বেঁচে থাকার মতো কোনো নিরাপদ আশ্রয় বা মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট দিতে পেরেছিলাম? এই সম্মিলিত ব্যর্থতার দায় কি আমাদের সমাজের ওপরও বর্তায় না?
এরকম পরিস্থিতি হলে মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট নেওয়া যে জরুরি এবং মিমোর মতো ভিক্টিমের হাত ছেড়ে না দিয়ে তাকে চিকিৎসার আওতায় নেওয়া উচিত—এসব নিয়ে যদি আমরা আলোচনা করি, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি কমাতে সাহায্য করতে পারব। কিন্তু আমরা সেটা করছি না।
আমরা সুদীপ চক্রবর্তীর চরিত্র হননে অতিব্যস্ত। কারো জীবন চলে যাওয়ার ক্ষতি অপূরণীয়। জীবিত সঙ্গীর দায়বদ্ধতা বা অপরাধ থাকলে তা আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো পরিস্থিতিটিকে কেবল ‘কে অপরাধী’ এই লেন্স দিয়ে না দেখে, কেন একজন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিল এবং আমাদের সমাজ ব্যবস্থাপনার কোথায় গলদ ছিল—সেটি গভীরভাবে দেখা।
আপনার বা আপনার পরিচিত কারো যদি আত্মহত্যা বা মানসিক অস্থিরতা সংক্রান্ত কোনো চিন্তা মনে আসে, তবে দয়া করে বিশেষজ্ঞ কাউন্সেলর বা কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্রের সাহায্য নিন। কথা বলা বা শেয়ার করাই অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে।
আত্মহত্যার প্ররোচনার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আইনি বিচার যেমন জরুরি, তেমনি এর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা বোঝাও প্রয়োজন। কেন পার্টনারকে এককভাবে দোষী করার আগে আমাদের আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা উচিত, তার জবাবে বলা যেতে পারে, যে কোনো দুজন মানুষের সম্পর্কের রসায়ন অত্যন্ত জটিল, স্পর্শকাতর এবং গভীর। বাইরের মানুষের পক্ষে একটি সম্পর্কের ভেতরের সবটুকু চড়াই-উতরাই বা মানসিক লেনদেন বোঝা প্রায় অসম্ভব। এক কথায়, কোনো সম্পর্কের বিচার করা বা শুধু একজনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো মোটেও সহজ কাজ নয়।
‘প্ররোচনা’ (Abetment) শব্দটি আমরা যখন ব্যবহার করি, তখন আইনত এবং নৈতিকভাবে সাংঘাতিক দায়বদ্ধতা চলে আসে। সেই বিচারে সুদীপ চক্রবর্তী কতটা দোষী, সেটা প্রমাণ হওয়ার আগে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা যেতেই পারে যে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে এককভাবে কাউকে দোষারোপ করা বাস্তবসম্মত নয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতা ও একক সিদ্ধান্ত—প্ররোচনা একটি ট্রিগার (Trigger) হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে সেই ট্রিগারকে গ্রহণ করবে, তা তার ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই কোনো একজনের কথা বা আচরণকে মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে আত্মহত্যার গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো আড়ালে পড়ে যায়।
এ ছাড়াও সামাজিক কাঠামোর দায়বদ্ধতাও এখানে অনেক। একজন মানুষ যখন তার পার্টনারের কাছে কষ্ট পায়, তখন সে নিশ্চিতভাবে সমাজ, পরিবার বা বন্ধুদের কাছে আশ্রয় খোঁজে। যদি আমাদের সামাজিক কাঠামো এমন হয় যে সে কোথাও গিয়ে নিজের কথা বলতে পারছে না বা বিচার পাচ্ছে না, তবে সেই ‘একাকীত্ব’ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
সমাজ কি তাকে সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ দিয়েছিল? পরিবার কি তার মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছিল? বন্ধুরা কি তাকে পর্যাপ্ত সময় দিয়েছিল? তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা কি কিছুই জানত না?
এই সব সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দায়বদ্ধতাগুলো এড়িয়ে কেবল একজন পার্টনারকে দোষ দিলে মূল সমস্যাটি চিরকালই অমীমাংসিত থেকে যায়। যে কোনো মানবিক সম্পর্কেই টানাপোড়েন, ঝগড়া বা চরম তিক্ততা থাকতে পারে। কখনো কখনো রাগের মাথায়, হীনম্মন্যতা কিংবা ইগো থেকে একজন মানুষ অন্যজনকে অত্যন্ত কঠোর বা নিষ্ঠুর কথা বলে ফেলতে পারেন। কিন্তু সেই সামান্য কথার প্রভাব যে অপর প্রান্তের মানুষটির মৃত্যু ঘটাতে পারে, তা অনেক সময় প্ররোচনাকারী নিজেও কল্পনা করতে পারেন না। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘Unintended Consequences’ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল।
একজনের ভুল আচরণ, দায়িত্বহীনতা বা নিষ্ঠুরতাকে নৈতিকভাবে অপরাধ বলা গেলেও, তাকে একটি প্রাণের বিনাশের জন্য ‘একক কারিগর’ হিসেবে দেখা অনেক সময় পরিস্থিতির অতি-সরলীকরণ হয়ে যায়। আমরা অনেক সময় ভিক্টিমের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে জীবিত মানুষটির ওপর সব ক্ষোভ উগরে দিই এবং তাকেই সর্বনাশের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করি। সমাজতত্ত্বে একে বলা হয় ‘Scapegoating’ বা বলির পাঁঠা বানানো।
আইন সবসময় তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধী সাব্যস্ত করে। যদি প্ররোচনার অকাট্য প্রমাণ থাকে, তবে আইন তার কাজ করবে। কিন্তু মানবিক দিক থেকে বিচার করলে অন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে, যা অবহেলা করার কোন সুযোগ নেই।