Published : 18 Sep 2025, 06:12 PM
আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকখাতকে কেবল লেনদেন ও মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবেই দেখে এসেছি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে। একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু অর্থনৈতিক লেনদেনের কাঠামো নয়, এটি সমাজের আত্মাকে ধারণ করতে পারে এবং জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ব্যাংকগুলো সমাজ থেকে লাভ সংগ্রহ করে, আর সেই লাভের একটি অংশ সমাজে ফিরিয়ে দেওয়াই তাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব হওয়া উচিত। এটি কেবল আইন বা নীতিমালার প্রশ্ন নয়—এটি মানবিকতার প্রশ্ন। এই দায়িত্ব উপেক্ষা করলে সমাজের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সম্পর্ক ভেঙেও যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৮ সালে একটি স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। প্রতিটি ব্যাংককে বার্ষিক নিট মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় করতে হবে। নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ৩০ শতাংশ করে ব্যয় করার কথা। পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ২০ শতাংশ। বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে।
কিন্তু ২০২৪ সালের হিসাব বলছে, ব্যাংক খাত সিএসআরে খরচ করেছে মাত্র ৬১৬ কোটি টাকা। এটি গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এরও অধিকাংশ খরচ হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। শিক্ষা ও পরিবেশ খাতে বরাদ্দ ছিল খুবই কম। ফলে সমাজ তার প্রাপ্য সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এই ব্যর্থতার পরিণাম কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানবিকতার গল্পকেও ম্লান করে দেয়। রাজশাহীর চর মাঝারদিয়ার ছোট্ট ছাত্র কায়েস উদ্দিন প্রতিদিন হাঁটু সমান পানির মধ্যে দিয়ে স্কুলে যায়। কয়েক বছর আগে একটি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে তার গ্রামে সোলার বাতি বসানো হয়েছিল। তখন রাতেও আলো জ্বালিয়ে পড়তে পারত সে। কিন্তু প্রকল্পটি মাত্র এক বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়। এখন তার ঘর ফের অন্ধকারে ডুবে আছে। ভাবুন তো যদি সেই ব্যাংকটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে চরাঞ্চলের শিক্ষার দায়িত্ব নিত হয়তো আজ কায়েসউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে যাত্রা শুরু করত। এককালীন অনুদান ক্ষণিকের সান্ত্বনা দিলেও, ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত সামাজিক বিনিয়োগই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
পৃথিবীর দিকে তাকালে বোঝা যায় আমরা কতটা পিছিয়ে আছি। ভারতে আইন করে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যে, কোম্পানিগুলোকে নিট মুনাফার কমপক্ষে ২ শতাংশ সিএসআরে ব্যয় করতে হবে। ফলে সেখানকার ব্যাংকগুলো গ্রামীণ উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা ও ডিজিটাল শিক্ষায় ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করছে। পাকিস্তানের ব্যাংকগুলোও তাদের বার্ষিক মুনাফার একটি অংশ সমাজকল্যাণে ব্যয় করে থাকে।
মাইক্রোসফট, গুগল ও মোটরোলার মতো কোম্পানিগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশে বিনিয়োগ করছে।
এই বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাবমূর্তি মানবিক করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ কর্মীও গড়ে তুলেছে। তাদের কাছে সিএসআর মানে সমাজকে দেওয়া। সেইসঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত করা। বিপরীতে আমাদের ব্যাংক খাত এখনো ‘কম্বল বিতরণ’ বা ‘ত্রাণ দেওয়া’র আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে সিএসআরের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক চাপ ছিল। ফলে ব্যাংকগুলোর সিএসআরের বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে গেছে। ব্যাংকগুলো জরুরি সহায়তা দিলেও নিজস্ব লক্ষ্য অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে পারেনি।
তারা সিএসআরকে কেবল আনুষ্ঠানিক দান হিসেবে সীমাবদ্ধ করেছে। দ্বিতীয়ত, ২০২০ সালের পর থেকে ব্যাংক খাত তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে। খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তারল্য ঘাটতি, সুশাসনের অভাব ও জনআস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত ছিল। তারা সিএসআরের বাজেটকে বাড়তি বোঝা ভেবে কমিয়ে ফেলেছে। তৃতীয়ত, দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি রয়েছে। বেশিরভাগ ব্যাংক এখনো সিএসআরকে বিনিয়োগ বা ব্র্যান্ড উন্নয়নের কৌশল হিসেবে দেখে না। তারা এটিকে দায়সারা অনুদান হিসেবে দেখে।
যদিও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, টেকসই সামাজিক দায়বদ্ধতা গ্রাহক আস্থা ও মুনাফা দুটিই বাড়ায়। এই তিনটি কারণ মিলেই ব্যাংক খাতকে আজও সিএসআরের প্রকৃত সম্ভাবনা থেকে দূরে ঠেলে রেখেছে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে সময় এসেছে সিএসআরকে কেবল খরচ নয় বরং ভবিষ্যতমুখী বিনিয়োগ হিসেবে দেখার। আজকের বিশ্বে সমাজ ও ব্যবসা আর দুটি আলাদা সত্তা নয়—একটি আরেকটিকে টিকিয়ে রাখে। সিএসআরের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক স্থায়িত্ব একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। প্রতিটি ব্যাংকের উচিত নিজেদের সক্ষমতা ও লক্ষ্যের সঙ্গে মানিয়ে একটি বড় সামাজিক সমস্যা বেছে নেওয়া—যেমন চরাঞ্চলের শিক্ষা, শহরের বস্তির স্বাস্থ্যসেবা বা জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো। এরপর অন্তত পাঁচ বছর ধরে সেই খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে হবে। স্বল্পমেয়াদি অনুদান দিয়ে ক্ষণিকের সান্ত্বনা দেওয়া সম্ভব হলেও টেকসই পরিবর্তন আনা যায় না।
‘এক ব্যাংক, এক কারণ’ হতে পারে এই রূপান্তরের স্লোগান। শিক্ষা বলতে কেবল বৃত্তি নয়—ডিজিটাল দক্ষতা শেখানো, চাকরির সুযোগ তৈরি এবং ড্রপআউট রোধে কাজ করা জরুরি। স্বাস্থ্য বলতে কেবল হাসপাতাল অনুদান নয়—প্রতিরোধমূলক সেবা, মাতৃ ও শিশুকল্যাণ এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ঘটানো দরকার। পরিবেশ বলতে কেবল গাছ লাগানো নয়—বন্যা-রোধী অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোগে ব্রত হয়ে ব্যাংকগুলো কাজ করবে। আমি বিশ্বাস করি, এইভাবে লক্ষ্যভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমেই সিএসআর সমাজে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে। তখন ব্যাংকগুলো কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয় বরং মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জন করবে এবং বাংলাদেশকে সত্যিকারের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেবে।
বাংলাদেশে সামাজিক দায়বদ্ধতা কেবল একটি নীতির বিষয় নয়। এটি মানবতার মৌলিক দায়। সমাজ থেকে যে লাভ নেওয়া হয়, সেই সমাজকে ফেরত না দিলে সেই লাভ টেকসই হয় না। আজ যে কায়েস উদ্দিন অন্ধকারে বসে পড়ছে। তার ভবিষ্যৎ যদি কোনো ব্যাংকের উদ্যোগে আলোকিত হয় তবে সেই ব্যাংকের প্রতি আস্থা চিরস্থায়ী হবে। কম্বল বিতরণের আনুষ্ঠানিকতা যথেষ্ট নয়। ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণেও ভূমিকা বাড়াতে হবে। তবেই সিএসআর প্রকৃত সামাজিক বিনিয়োগে পরিণত হবে। তখন ব্যাংক কেবল মুনাফার প্রতিষ্ঠান থাকবে না। তারা হবে মানবিক, উন্নত ও টেকসই বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম নির্মাতা। আমি বিশ্বাস করি, এই মানবিক দায়ই তাদের স্থায়ীভাবে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেবে।