Published : 25 Jul 2025, 08:09 AM
বাংলাদেশ ব্যাংকের পোশাক-সংক্রান্ত নির্দেশনার খবরটি চোখে পড়তেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী অর্ণবের কথা মনে পড়ে গেল। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো সাধারণ ব্যাংক নয়, বরং ব্যাংকখাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। অথচ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি পোশাকবিধি তৈরির নামে নীতি-পুলিশের ভূমিকা নিতে চাইছিল, অর্ণবদের মতো করে। মন্দের ভালো, যে বিদেশ সফর থেকেই গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সময়মতো অতিউৎসাহী সহকর্মীদের রাশ টেনেছেন।
অর্ণবের পুরো নামটা মনে করার জন্য গুগল করতে হলো—মোস্তফা আসিফ অর্ণব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির কর্মচারী এই অর্ণব বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক নারী শিক্ষার্থীকে ওড়না ঠিক করে পরার কথা বলে রাস্তায় হেনস্তা করেছিলেন। পুলিশ তাকে আটক করলেও ‘তৌহিদি জনতা’র চাপের মুখে আদালত দ্রুত জামিন দিতে বাধ্য হয়। পরে অর্ণবের খোঁজ আর রাখেনি সংবাদমাধ্যম। আমার অবশ্য জানতে ইচ্ছে করছে, ওই হেনস্তাকারী এখন কেমন আছেন? চাকরি-বাকরি আছে কি তার?
আতঙ্কের বিষয় হলো, অর্ণবদের কাজটি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থার কতিপয় ব্যক্তি নিজেদের হাতে তুলে নেন, তা অশনি সংকেত হয়ে দেখা দিতে পারে। গত ২১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের একটি নির্দেশনায় বলা হয়, নারী-পুরুষ কে কী ধরনের পোশাক পরতে পারবেন। যদিও একদিনের মাথায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে সেটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে তারা। তবু ওই নির্দেশনার ছায়া যে কর্মীদের মনে, বিশেষ করে নারীদের মনে, গভীরভাবে থেকে যাবে—এ নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।
অর্ণব তো বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী। তবে তার মতো করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অন্য শিক্ষার্থীদের পোশাক–আশাক ‘শোধরানো’র কাজে নিয়োজিত হয়েছেন—এমন কথা এখন প্রায়শই শুনতে পাচ্ছি। আমাদের ছাত্রজীবনে এমনটা ঘটত মূলত চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসীন কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ ছিল তাদের আওতাধীন। এখন আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজই বাদ যাচ্ছে না; খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও চলছে তাদের দৌরাত্ম্য।
রাষ্ট্র তাদের মাধ্যমেই যেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। সাদাসিধেভাবে যাদের ক্ষমতাসীন মনে হচ্ছে, তাদের পেছনে আরও শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকরা রয়েছেন—এটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না আমাদের। রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান যখন ‘শালীনতা’র সংজ্ঞা চাপিয়ে দেয়, তখন প্রশ্ন জাগে—কার নৈতিকতা? কার ইচ্ছা? ব্যক্তির স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত?
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করেছে, যা পোশাক পরার স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “কোনো ব্যক্তিকে আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো বিচারিক কার্যধারা ব্যতিরেকে জীবন বা ব্যক্তি-স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।” পাশাপাশি ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশ ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। একজন নাগরিক কী পরবে, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবে, সেটি তার ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সাংবিধানিক অধিকার। রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেই স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করা হলে তা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তবে শালীনতা ও জনস্বার্থের প্রশ্নে সীমিত মাত্রায় আইনগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে—যা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত এবং সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
তাহলে কি ধরে নিতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংক শালীনতা বজায় রাখার জন্য এই নির্দেশনা জারি করেছিল, যা সাংবিধানিক ক্ষমতা? দৈনিক ‘প্রথম আলো’র পক্ষে নির্দেশনা জারির আগে বাংলাদেশ ব্যাংকে কেউ অশালীন পোশাক পরতেন কি না জানতে চাওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, “না, কেউ পরেননি।” তাহলে এ ধরনের নির্দেশনার প্রয়োজন হলো কেন? সে প্রশ্নে তিনি বলেন, “এখন একেক ব্যাচে ২০০–২৫০ জন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা তরুণেরা বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিতে প্রবেশ করছেন। তাদের মধ্যে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, এমন আচরণের প্রবণতা দেখা যায়। বেশ কিছুদিন এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পোশাক কী পরতে হবে, সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা শুধু অফিসের জন্য প্রযোজ্য। কেউ ব্যক্তিগত পরিসরে যে কোনো পোশাক পরতে পারবেন।”
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশির ভাগ দেশে, পূর্ব এশিয়ার চীন-জাপান-কোরিয়া ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সরকারি বা বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে পোশাকের লিখিত বিধান থাকে না। সেখানে রয়েছে অলিখিত একটি সৌজন্যবোধ—যা পেশাদারিত্বের চর্চা থেকে আসে, অনুশাসনের চাপে নয়। বাংলাদেশেও এতদিন তাই ছিল; গুটিকয়েক ইউরোপীয় ধাঁচের ক্লাব ছাড়া সর্বত্রই পোশাকের স্বাধীনতা উপভোগ করেছে মানুষ। নিশ্চয়ই ওই সব ক্লাবে ‘নেটিংপরা’ মহাত্মা গান্ধী, ‘লুঙ্গিপরা’ মওলানা ভাসানী যেতে চাইলে প্রবেশাধিকার পেতেন না।
ইউরোপীয় কেদাদুরস্ত গান্ধী একদিন শরীর থেকে ফেলে দিয়েছিলেন সেই সব পোশাক, যাকে বাংলাদেশ ব্যাংক ফরমাল পোশাক বলতে চেয়েছে। দক্ষিণ ভারত সফরকালে ট্রেনে করে যাচ্ছিলেন গান্ধী। ট্রেনের জানালা দিয়ে তিনি দেখেন, কিছু কৃষক একেবারে অর্ধনগ্ন অবস্থায়—শুধু নেংটি পরে মাঠে কাজ করছেন। গান্ধী খুব ব্যথিত হন এবং ভাবতে থাকেন, “আমি যদি দেশের নেতা হতে চাই, তবে তাদের মতো না থাকলে কীভাবে তাদের যন্ত্রণা বুঝব?”
এই উপলব্ধিই তাকে চিরাচরিত পশ্চিমা পোশাক, যা তিনি ওই ঘটনার আগেই অনেকখানি বর্জন করেছিলেন, পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে অনুপ্রাণিত করে। এরপর তিনি শুধু একটি সাদা খদ্দরের ধুতি ও ওপরে চাদর পরে জীবনযাপন শুরু করেন—যা তার আজীবনের প্রতীকী পোশাক হয়ে ওঠে।
শার্ট-প্যান্ট যেমন বাঙালি পুরুষের আদি পোশাক নয়, হাল-আমলে যেভাবে শাড়ি পরা হয় তাও বাঙালি নারীর আদি পোশাক নয়। শাড়ি আগেও পরা হতো। কিন্তু শাড়ির সঙ্গে পেটিকোট আর ব্লাউজ পরার চল হয়েছে ঠাকুরবাড়ির নারীদের মাধ্যমে। বাঙালি নারীর পোশাকচর্চায় এক গভীর পালাবদল আসে উনিশ শতকে, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার তথা ঠাকুরবাড়ির প্রভাবে। সেই সময় বাঙালি নারীরা সাধারণত শাড়ি পরলেও তার সঙ্গে ব্লাউজ বা পেটিকোটের প্রচলন ছিল না। শরীর ঢাকার প্রচলিত রীতি ছিল এক রকম, কিন্তু তা ছিল ঐতিহ্যনির্ভর, সুবিধার বা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয় নয়।
জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, যিনি রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী, তিনিই প্রথম এই পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক ছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রথম ভারতীয় আইসিএস কর্মকর্তা এবং স্বামীর সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনীকে থাকতে হয়েছিল মুম্বাইয়ের ইংরেজ সমাজের সঙ্গে, যেখানে ভারতীয় রীতিতে শাড়ি পরা নারীদের ঘাড়, বুক বা বাহু অনাবৃত থাকা ‘অশোভন’ বলে গণ্য করা হতো। এই সামাজিক বাস্তবতা থেকেই জ্ঞানদানন্দিনী শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ, পেটিকোট এবং আঁচল টানার রীতি প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি শুধু নিজের জন্যই এই রীতি আনেননি, ঠাকুরবাড়ির অন্য নারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেন। শাড়ির পরার এই রীতি নিয়ে শুরুতে কটাক্ষ করা হলেও পরে তা কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
শাড়ি আজকালকার নারীদের কাছে আকর্ষণ হারিয়েছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংক যে সব পোশাক পরিহার করতে বলেছিল নির্দেশনায়, সেগুলোতেই স্বচ্ছন্দ। নির্দেশনাটি প্রত্যাহার করা হলেও ব্যাংকটির নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কি আর আগের মতো স্বচ্ছন্দে এই সব পোশাক পরে অফিসে যেতে পারবেন? পুরুষদেরও অনেকেই টিশার্ট পরে অফিস করতে চান। তারা হয়তো এখন হাফহাতা শার্ট পরবেন। হাফহাতা শার্টের সঙ্গে টিশার্টের পার্থক্য কতখানি?
বাংলাদেশ ব্যাংক এমন এক সময়ে পোশাক নিয়ে একটি নির্দেশনা জারি করেছিল, যখন রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বিদেশ সফরে আছেন। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করলে তিনি তা জানতে পারেন এবং বিদেশ বিভুঁই থেকে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে নির্দেশনাটি স্থগিত করার আদেশ দেন।
কিন্তু কে বা কারা কেন–এই কাণ্ডটি করলেন? কেউ কি কোনো পক্ষকে খুশি করে ভবিষ্যৎ গভর্নরের তালিকায় নিজের নামটি যুক্ত করতে চাইছেন?
নারী কর্মীদের খাটো হাতার পোশাক, লেগিংস পরতে বারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের