Published : 02 Feb 2026, 01:45 AM
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স আইডি থেকে প্রকাশিত ‘নারীবিদ্বেষী’ পোস্ট দেখে অনেকটাই যেন ‘ফেটে’ পড়ছেন সবাই। সেই পোস্টে তিনি যা লিখেছেন ইংরেজিতে, সেটির বাংলা করলে বোঝা যায়, “নারীরা যদি পেশাগত কাজে ঘরের বাইরে আসে, তাহলে সেটা বেশ্যাবৃত্তির মতো হয়।”
অনেকেই আন্দাজ করেছিলেন, একটু পর এই পোস্টটি তার একাউন্ট হ্যাক করে দেওয়া হয়েছে বলে জামায়াতে ইসলামী থেকে জানানো হবে। হয়েছেও তাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনরোষের শিকার হয়ে বলেছেন, এই পোস্ট তিনি দেননি। তার একাউন্ট হ্যাক করে ‘অন্য’ কেউ দিয়েছে। তবে এই কথাটা বলার জন্য নয় ঘণ্টার মতো সময় লেগেছে। এখন এই বক্তব্যকে ঘিরে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলনায় ঘোরানো হচ্ছে সবাইকে।
সমর্থন-অসমর্থনের বাইরে, এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, শফিকুর রহমান শুধু জামায়াতের আমির নন, তিনি এই প্রথম বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা’ হয়ে ওঠেছেন। তার এখন দেশ-বিদেশে গুরুত্ব অনেক। তার কথা, আলোচনা, পোস্ট—সবকিছুই লোকজন অনুসরণ করে। তাই তিনি কী বলছেন, কেন বলছেন, এগুলো যেমন বিশ্লেষণের দাবি রাখে, তেমনি দাবি রাখে জবাবদিহিতারও।
তবে জামায়াত এবং তার জোট সঙ্গীদের ‘বেশ্যাবৃত্তি-ভিত্তিক কথাবার্তা’ নতুন কিছু নয়। বরং নারী বিষয়ে এটিই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। কয়েকদিন আগেই বরগুনা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সুলতান আহমেদের নির্বাচনি জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদকে ‘মাদকের আড্ডাখানা ও বেশ্যাখানা’ বলে মন্তব্য করেছেন বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. শামীম আহসান। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে আমরা জানতে পারি যে, এ বিষয়ে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা দেখছি, ডাকসু নির্বাচনের পরে যে ডাকসু মাদকের আড্ডা ছিল, যে ডাকসু বেশ্যাখানা ছিল, সেটা ইসলামী ছাত্রশিবির পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে।’ চাপের মুখে জামায়াত তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
এটা মন্দের ভালো, শামীম আহসান কেবল ডাকসুকে ‘বেশ্যাখানা’ বলেছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই ‘বেশাবিদ্যালয়’ বলতেন।
গত বছর মে মাসে নারী সংস্কার কমিশনের সমালোচনা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে হেফাজতে ইসলামীর নেতারা নারী সংস্কার কমিশন এবং নারীদের ‘বেশ্যা’ বলে গালি দিয়েছিলেন। সেখানে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তখনও এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের জোট হয়নি। কিন্তু সেদিনের নিশ্চুপতা তখন থেকেই এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতাকে আরও স্পষ্ট করেছিল, কিংবা ‘বি’ টিমের গুঞ্জনে বাড়তি রসদ যোগ করেছিল।
এবার আসি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায়। আমরা প্রায় সকলেই জুলাইয়ের আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কথা বলি, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে মধ্যরাতে বের হয়ে যে মেয়েরা আন্দোলনে স্লোগান ধরেছিল, নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের কথা বলি। খুবই বিশ্লেষণের বিষয়, সেই সমাবেশ এবং সেই প্রতিবাদস্থল থেকেই রোকেয়ার ছবিতে ‘মাগী’, ‘বেশ্যা’, ‘খানকি’ লেখা হয় এবং কালি লেপে দেওয়া হয়।
যে সংবাদটি সে সময় কোনো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়নি, তা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রী আন্দোলনের পরপরই হলের ভেতরে থাকা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ভাস্কর্য ভাঙার জন্যও ‘আবদার’ করে এবং সেটিতে আঘাত করার চেষ্টা করে।
এখন প্রশ্ন আসে, আমরা যখন আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ এবং গৌরবগাথা নিয়ে গর্ব করছি, বারবার প্রশ্ন করছি সেই নারীরা কোথায় গেল? তাদের কেন মূল্যায়ন করা হলো না? কিংবা অভ্যুত্থানে এত নারী থাকলেও এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী কম কেন?
কিন্তু এর বিপরীতে কি আমরা একবারও প্রশ্ন করেছি, রোকেয়া হলের যে ছাত্রীদের মধ্যরাতে আন্দোলনে বের হয়ে আসতে দেখে গর্বে আমাদের বুক ভরে গিয়েছিল, চোখে জল এসেছিল, তারা কী করে রোকেয়াকে ‘বেশ্যা’ বলে গালি দিয়েছিল? তারা কেন রোকেয়ার ভাস্কর্য ভাঙতে চেয়েছিল? নারীর বিপরীতে এত গালিগালাজ এবং ‘বেশ্যাকরণের রাজনীতি’র বিষয়ে তারা চুপ থাকে কেন। তাহলে সেই নারীদের সেই আন্দোলনের মাহাত্ম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠবেই। তারা কি সত্যিই প্রতিবাদে এসেছিল, নাকি দলীয় নির্দেশ পালন করেছিল?
খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন, নারীর প্রতিশব্দ হিসেবে গত দেড় বছরে ‘বেশ্যা’ শব্দটি কেন বারবার সামনে আসছে। নারীর বিরুদ্ধে এই শব্দের ব্যবহার জনপরিসরে আগে তেমন শোনা যায়নি। এগুলো ইসলামবাদী দল থেকেই বারবার উচ্চারিত হয়েছে। এটি কি তাদের সবচেয়ে পছন্দের গালি, নাকি এমনটি তারা সব সময় ভাবছেন? বিষয়টি এমন যে, নারী এখন ‘মা’ আর ‘বেশ্যা’র বাইনারিতে অবস্থান করছে।
জামায়াতের চিত্রণে ‘আদর্শ মা’ চরিত্র থেকে যারাই বেরিয়ে যাবে, তারা সবাই ‘বেশ্যা’, মানে তাদের কাছে ‘খারাপ নারী’। আমাদের মনে আছে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর বেশ কিছু যৌনকর্মীকে জনপরিসরে পেটানো হয়েছিল এবং এর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হিজাব’ র্যালি করে ‘আদর্শ নারী’ প্রদর্শন করা হয়েছিল।
শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর পোশাক নিয়ে কটূক্তি করায় যখন কটূক্তিকারীকে শাহবাগ থানায় আটকে রাখা হয়, তখন এরাই গিয়ে থানা আটক ও ঘেরাও করে সেই ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে এনে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছিল।

গত কয়েকদিন আগে জামায়াতের আমির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তার দলের শীর্ষ নেতা কখনও নারীরা হতে পারবে না। কারণ আল্লাহ তাদের সেভাবে বানাননি। নারীদের তৈরি করা হয়েছে সন্তান জন্মদান এবং লালন-পালন করার জন্য। এসব দায়িত্ব পালন করে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়া নারীদের জন্য সম্ভব নয়।
এমন বক্তব্য দেওয়ার পরই তার পোস্টে নারী নিয়ে যা লেখা হয়েছে, সেই সব তার সাক্ষাৎকারের মর্মার্থের বাইরের কিছু নয়। আরও দেখুন, জামায়াত নেতারা তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় বারবার বলছেন তারা মায়েদের জন্য কী কী করবেন। এই মা আসলে তাদের মনের মত নারী, অন্যরা নয়।
আরও মজার বিষয়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারা নারী বিষয়ে যে সব অভিযোগ তুলছেন এবং ‘বেশ্যা’ শব্দের পাইকারি ব্যবহার করছেন, তা শুনে মনে হতে পারে, তাদের কাজে লাগা নারী ছাড়া সব নারীই আগাছা। সবাইকেই ফেলে দিতে হবে।
৫৫ বছর বয়সী বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় নির্বাচনে কখনও নারী প্রার্থী দেয়নি। শুধু তাই নয়, পুরো সময় ধরে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা চালাচ্ছে। এখন তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, আগে নারীর আদল ঠিক করা জরুরি, তারপর নারীর রাজনীতি নিয়ে ভাবা যাবে। নারীকে নিয়েই যত আলাপ। আর হৈ-চৈ হলেই ‘ক্ষমা’ চাওয়া বা ‘হ্যাক’ কৌশল প্রচার করা। কিন্তু ভোট চাচ্ছেন নারী ভোটারদের কাছেই।
জামায়াত এবং তার জোটের এসব নারীবিদ্বেষী এবং নারীকে ‘বেশ্যাকরণের’ রাজনীতির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং সরকার কী করছে? কী বলছে? না, কিছুই করছে না।
একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এমন নারীবিদ্বেষী বক্তব্য দেওয়ার পর পৃথিবীর ‘সভ্য’ কোনো দেশে রাজনীতি করার অধিকার পেতেন না, পাওয়া উচিত নয়। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের ‘সভ্যতা’য় পা দেওয়া দেশে নারীর বিরুদ্ধে এই ধরনের অসভ্যতা চলছেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চলবে আরও অনেকদিন। তাই এই কথিত সভ্যতার প্রতিরোধ তথাকথিত ‘বেশ্যা’দের থেকেই আসা উচিত।