Published : 05 Oct 2025, 09:29 AM
সোহাগী জাহান তনুর রক্তমাখা পোশাক, মোসারাত জাহান মুনিয়ার নিথর দেহ আর খাগড়াছড়ির গুঁইমারার এক মারমা কিশোরীর অসহায় আর্তনাদ—সবকিছুকে যেন একই সুতোয় গাঁথা যায়। আলাদা সময়, ভিন্ন ভিন্ন স্থান, কিন্তু মিল একটা আছে—ক্ষমতার কাছে ন্যায়বিচার পরাস্ত হওয়ার। তনুর মেডিকেল রিপোর্ট থেকে ধর্ষণের আলামত পেয়েও মুছে ফেলা হয়েছিল, মুনিয়ার পরীক্ষাই হয়নি আর খাগড়াছড়ির কিশোরীর ক্ষেত্রে ‘ধর্ষণ হয়নি’—এই পূর্বনির্ধারিত বয়ান চালিয়ে দেওয়া হল। যেন অপরাধ নয়, অপরাধীর ক্ষমতাই মূল সত্য।
ধর্ষণ ও হত্যার বিচারহীনতার বড় নজির কুমিল্লার নাট্যকর্মী ও ইতিহাসের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু। যাকে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে মৃ্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেনানিবাসের ভেতরে স্টাফ কোয়ার্টারে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তনু। হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধ্যায় ৩০০ গজ দূরে স্টাফ কোয়ার্টারেরই আরেকটি ছাত্র পড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। তার মাথায় আঘাত, শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন এবং পোশাকের অবস্থা থেকে ধর্ষণ ও হত্যার স্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়। কিন্তু এই ভয়াবহ ঘটনা যতটা দ্রুত জাতীয় আলোচনায় ওঠে এসেছিল, তার বিচারপ্রক্রিয়া ততটাই ধীরে এবং রহস্যজনকভাবে থেমে গিয়েছে।
পরের ঘটনাটিরও শিকার হলেন কুমিল্লার আরেকটি মেয়ে মোসারাত জাহান মুনিয়া। তবে ঘটনাস্থল কুমিল্লায় নয়, ঢাকায়। ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকার গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে আত্মহত্যা হিসেবে ঘটনাটি উপস্থাপন করা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি সম্ভাব্য ধর্ষণ ও হত্যার ধারণা তৈরি করে।
মুনিয়ার মৃতদেহ উদ্ধারের রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া। শুরু থেকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে এবং সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুনিয়ার বড় বোন তানিয়া তাকে ও তার পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ আনছিলেন। সংবাদমাধ্যম এই ঘটনায় সবসময় বেছে বেছে খবর প্রচার করেছে, অবশেষে অভিযুক্তরা অব্যাহতি পাওয়ার পর পুরোই নীরব হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে জনমানস থেকেও মুনিয়া হারিয়ে যেতে চলেছে।
এই দুটো ঘটনা গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার উদাহরণ, যেখানে তনু ও মুনিয়া হত্যায় অপরাধী বলে সন্দেহভাজনরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাভোগী জনগোষ্ঠীর অংশ, যা প্রমাণ করে, কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা অপরাধ ধামাচাপা দিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে, এটা তো প্রমাণ হয়নি। একদিন হয়তো শুনব তনু-মুনিয়াকে কেউ খুন করেনি, ওরা নিজে নিজেই মরে গেছে। তারপর যন্তর-মন্তর ঘরে মগজধোলাই শেষে আমরাই বলব তনু-মুনিয়া বলে কেউ ছিলই না। কাজেই বলা চলে গুঁইমারার মারমা কিশোরীটিকে তনুদের মতো মরে যেতে হয়নি, সেটা মন্দের ভালো।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, এ বছর ২০২৫ সালে প্রথম ছয় মাসেই ধর্ষণের সংখ্যা ৪৪১টি। এর আগের বছর ২০২৪ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৪০১টি। এছাড়াও, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৪ হাজার ৭৮৭টি। আর শিশু ধর্ষণের ঘটনায় বলা হচ্ছে, গত আট বছরে তিন হাজার ৪৩৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতি বছর এ ধরনের নানান উপাত্ত প্রকাশ করা হয়, কিন্তু তারপরও বাংলাদেশে ধর্ষণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। Data Pandas-এর ধর্ষণ পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, ধর্ষণের হার অনুসারে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে ৭ম স্থানে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশকে দায়ী করছে, যেখানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও অপরাধীরা শাস্তি পায় না এবং বিচারপ্রক্রিয়া হয় অনুপস্থিত, নয় পক্ষপাতদুষ্ট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিলম্বিত। ধর্ষক যদি প্রভাবশালীবর্গের কেউ না হন, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে বিচার পাওয়া যায়, কিন্তু ধর্ষক যদি হন প্রভাবশালী, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলাই নেওয়া হয় না।
ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ধর্ষণ যেন শুধু লিঙ্গভিত্তিক অপরাধ নয়—এটি এখন ক্ষমতা প্রদর্শন এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু দমনের একটি রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়াও। ধর্ষণের ভুক্তভোগী যদি হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী, তখন পাহাড়ের মানুষের ওপর বাঙালি সেটেলারদের লেলিয়ে দেওয়ার উপায়ও হয়ে যায়। তনুর ঘটনা দেখায়, ক্ষমতার মাত্রাভেদে কখনো কখনো স্বয়ং রাষ্ট্র সেখানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। মুনিয়ার ঘটনায় পাওয়া যায়, তদন্তকে প্রভাবিত করার অভিযোগ। মোদ্দাকথা ক্ষমতাই এখানে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসাবে কাজ করে।

এরূপ বাস্তবতায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নারী যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া আরো জটিল হয়ে যায়। আদিবাসী নারীর শরীর ও তার জাতিগত পরিচয় উভয় মিলেমিশে তাকে আরো দুর্বল করে তোলে। তাই আদিবাসী নারী ধর্ষণের শিকার হলে এর বিচার প্রক্রিয়া অতটা সহজ হয় না। গ্রামীণ পর্যায়ে আদিবাসী নারী কোনো আদিবাসী পুরুষ দ্বারা ধর্ষণের শিকার হলে, সাধারণত নিজেদের কম্যুনিটির প্রথাগত আইন দ্বারা ধর্ষকের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু যখন ধর্ষক বাঙালি হয়, তখন সেখানে প্রথাগত আইন আর কার্যকর থাকে না। সেক্ষেত্রে, মূলধারার আইনি প্রক্রিয়ার শরণাপন্ন হতে হয় বিচারের জন্য। এধরণের মামলায় সমতলে যেভাবে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেভাবেই নেওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যায়, ধর্ষক বাঙালি হওয়ায়, প্রশাসন মামলা নিতে চায় না এবং নানানভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় ধর্ষণের ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে। ধর্ষণের ঘটনায় প্রশাসনের ধারাবাহিক অসহযোগিতা ন্যায়বিচার না পাওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি করেছে, তা আদিবাসীদের মধ্যে এক ধরনের সামষ্টিক ক্ষোভের বিস্তার ঘটিয়েছে।
এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে তা সবসময়ই সাম্প্রদায়িক দিকে মোড় নেয় বলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার ধর্ষণের কথা লুকিয়ে রাখে। তবে অনেক সময় ধর্ষণের ভুক্তভোগী সাহস সঞ্চয় করে বিচার চাইতে গেলে যা হওয়ার তাই হয়ে থাকে। প্রশাসন যেহেতু সাহায্য করতে অপারগ থাকে, তাই এটা নিয়ে প্রতিবাদ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, ধর্ষণের বিচার চাওয়া নিয়ে প্রতিবাদ বাংলাদেশের অন্য সব অঞ্চলে যেমনটা হয়ে থাকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে তা হয় না, এটি রূপ নেয় জাতিগত সংঘাতে। সম্প্রতি, খাগড়াছড়ির গুঁইমারায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তারই ফলাফল।
কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত তিন জনই জাতিতে বাঙালি। এর আগে মে মাসে বান্দরবানে ২৯ বছর বয়সী চিংমা খিয়াংকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে বীভৎসভাবে খুন করা হয়। সেই মামলার তদন্তেও প্রশাসনের গড়িমসি দেখা যাচ্ছে। চার মাস পেরিয়ে গেলেও বিচার শুরু করা যায়নি। সেই ঘটনার তদন্তের ব্যর্থতা যেন খাগড়াছড়িতে না ঘটে, তাই এবার প্রতিবাদ আরো জোরেশোরে করা হয়। যেহেতু ধর্ষক বাঙালি হলে সবসময়ই আইনি প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরির নজির দেখা যায়, তাই আদিবাসীরা সুবিচারের জন্য মানববন্ধন করে। কিন্তু সুবিচারের আশ্বাস দেওয়ার পরিবর্তে তাদের আন্দোলনে গুলি চালানো হয় পরপর দুদিন (২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর)। ঘর-বাড়ি, দোকানপাট পুড়িয়ে ফেলার পাশাপাশি হতাহতের ঘটনাও ঘটে। সংবাদমাধ্যমে তিন জন নিহত হওয়ার কথা বলা হলেও স্থানীয় আদিবাসীরা বলছেন, নিহতের সংখ্যা আরো বেশি।
এত বড় সহিংসতা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হল। কিন্তু আদিবাসীদের ন্যায্য দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশের পরিবর্তে আমরা দেখলাম ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। কেবলমাত্র জাতিগত পরিচয় ভিন্ন হওয়ার কারণেই যেন ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলনটির মধ্যে ‘ষড়যন্ত্র’ দেখতে পেলেন বৃহত্তর জাতির রাজনৈতিক নেতাসহ সাধারণ বাঙালিদের অনেকেই। তারা আদিবাসীদের এই আন্দোলনের দাবি কী, তা তোয়াক্কা না করেই তাদেরকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে লাগলেন এবং সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানালেন, তারা যেন যে কোনো রূপে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন হতে না দেয়, দরকারে পাহাড়িদেরকে হত্যা করা হোক। এমনকি কেউ কেউ পাহাড়ি নারীদের গণধর্ষণ করে শাস্তি দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন ফেইসবুকে। এ নিয়ে আদিবাসীরা অনেকেই ফেইসবুকে লেখেন, ‘চেয়েছিলাম ধর্ষণের সুবিচার, হয়ে গেলাম সন্ত্রাসী।‘
যদিও প্রধান উপদেষ্টা শুরু থেকেই একেবারেই চুপ ছিলেন এ ঘটনায়, যেন তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্য থেকে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, “দুর্গাপূজা যাতে শান্তিপূর্ণ না হতে পারে, সে জন্যই খাগড়াছড়ির ঘটনা ঘটানো হয়েছে।“ এ ঘটনায় তিনি দেশ ও দেশের বাইরে থেকে মদদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। দুর্গাপূজা না হতে দেওয়ার চক্রান্তের অভিযোগ থেকে স্পষ্ট, এর মাধ্যমে তিনি ভারতকেই দায়ী করছেন, অবশ্য নাম ধরেই ভারতের কথা বলেছেনও। উপদেষ্টার এহেন বক্তব্য অবশ্য শুধু সরকারের না, এমনকি বৃহত্তর সমাজ বাঙালিদের ফেইসবুকের প্রতিক্রিয়া থেকেও স্পষ্ট। আদিবাসীদের ন্যায্য দাবির মধ্যে ভারতের ইন্ধন দেখাটা জনপ্রিয় রাজনৈতিক বয়ানেরই অংশ। এমনকি সংবাদমাধ্যমগুলোর বেশির ভাগ জনপ্রিয় এই বয়ানকেই প্রতিফলিত করল তাদের রিপোর্টে।
এই জাতীয়বাদী সার্বভৌমত্বের ধারণা বাঙালি মননে অত্যন্ত আবেগের একটি জায়গা। জাতীয়তাবাদী চেতনায় যেন গণহত্যাও ন্যায্য, ঠিক যেমনটা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের হত্যা করা ন্যায্য ছিল পাকিস্তানিদের কাছে, যদিও বাংলাদেশের দিক থেকে এটা ছিল অন্যায়। ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা তাই খুবই রাজনৈতিক।

এতৎ ঘৃণাবাচক কথা, অপতথ্য, মিথ্যাতথ্য–এসবের মধ্যেও মারমা কিশোরী ধর্ষণ ও গুঁইমারায় সহিংসতার বিচার চেয়ে রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ ২৭ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ করছিলেন আদিবাসী তরুণ-তরুণীরা। এই রাষ্ট্র এখনও ন্যায়বিচার করতে সক্ষম, এমন সরল বিশ্বাস আর রাখে না আদিবাসীরা। তাই তাদের বিক্ষোভ থেকে বলা হয়, “আপনারা এত টালবাহানা না করে পাহাড়ের জন্য আইন করে দেন যে, যারা জাতে সেটেলার বাঙালি, ধর্মে মুসলিম তাদের জন্য ধর্ষণ বৈধ। আইন করে দেন পাহাড়ে ধর্ষণ হলে কোন প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করা যাবে না।” পাহাড়ের মানুষের এমন অনাস্থার মধ্যে নজিরবিহীনভাবে দ্রুত প্রকাশ করা হল ওই মারমা কিশোরীটির পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি বলে মেডিকেল রিপোর্টের তথ্য।
৩০ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) একটি মেডিকেল রিপোর্ট তাদের ফেইসবুক পেইজে প্রকাশ করে, যা মুহূর্তের মধ্যে শেয়ার হয়ে যায় হাজারে হাজারে। এতদিন ধরে আদিবাসীদের আন্দোলনকে যারা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসাবে দেখে আসছিলেন, তাদের বিশ্বাসকে এই রিপোর্ট যেন আরো জোরালো করে। জাতীয়তাবাদী ও সার্বভৌমত্বের চেতনায় অন্ধ হয়ে তারা তলিয়ে দেখতে ব্যর্থ হন কীভাবে অভিযোগকারীকে উল্টো দোষী সাব্যস্ত করার পরিপ্রেক্ষিত আগে থাকতেই তৈরি করা হচ্ছিল।
অধিকারকর্মী রাণী য়েন য়েন তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ‘ধর্ষণ হয়নি’ এই গুজব প্রথম ছড়ায় ঢাকায় কিছু সংগঠন, যারা ‘সার্বভৌমত্ব সচেতন শিক্ষার্থী জোট’ নামে পরিচিত। তারা তদন্ত রিপোর্ট আসার আগেই ২৬ সেপ্টেম্বর দাবি করে যে, ধর্ষণ হয়নি। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, পুরো ঘটনার একটি পূর্বপরিকল্পিত ন্যারেটিভ ছিল–প্রথমে ধর্ষণ অস্বীকার করা, তারপর একটি রিপোর্ট বানিয়ে সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, রিপোর্টে ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষার তারিখ দেওয়া আছে ২৮ সেপ্টেম্বর, অথচ ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটেছে এর পাঁচ দিন আগে। যৌন সহিংসতার মামলায় প্রতিটি ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শারীরিক আলামত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। নিয়ম হল, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ধর্ষণের ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষা করা। এত দেরি করে পরীক্ষা করার মানে একটাই, আলামত ধ্বংস হওয়ার সুযোগ দেওয়া। এরপর একটি ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট তৈরি করা খুব কঠিন নয়। এই মেডিকেল রিপোর্ট ফাঁস ও তার আগে পরে বিভিন্ন মহলের ন্যারেটিভ দেখে এটা বোঝা খুব কঠিন নয় যে, পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হল, চিংমা খিয়াংয়ের ঘটনার চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তার মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। কিন্তু এবারকার ঘটনায় তিন দিন ধরে ফেইসবুকে ‘ভুয়া ধর্ষণ’ বিষয়ক প্রচারণা চালানোর পর দ্রুততম সময়েই রিপোর্ট পাওয়া গেল, তাও আবার সেটলারদের সাংগঠনিক ফেইসবুক পেইজ থেকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা পুলিশের মাধ্যমে নয়।
সংবাদমাধ্যমগুলো এক্ষেত্রে পারত, এই মেডিকেল রিপোর্ট কীভাবে প্রশাসনের মাধ্যমে না এসে, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে আসল, সেই বিষয়ে প্রশ্ন করতে। কিন্তু এক্ষেত্রেও সংবাদমাধ্যম পাহাড় প্রসঙ্গে তাদের বিরূপতা দেখাল।
অথচ, বাংলাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ ভুক্তভোগীর বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের এবং তা দ্রুত রেকর্ড করার বিশেষ বিধান রয়েছে। বিবিসির সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে, ভুক্তভোগীর বাবা তার হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি আর আদালতে যাবেন না। আদালতে না যাওয়ার কারণ হিসেবে আর্থিক সামর্থ্যের ঘাটতির কথা বলেছেন। তবে শুধু তার আর্থিক অসঙ্গতিই নয়, ওখানে গেলেও রিপোর্ট নেগেটিভই আসবে বলে তার ধারণার কথাও বলে দিয়েছেন ওই বাবাটি। বিবিসির এই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, “ধর্ষণের আলামত সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে প্রভাবিত হওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না, প্রশ্ন করা হলে সরাসরি উত্তর দেননি খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ছাবের।“ প্রশ্ন তৈরি হয়, তনু, মুনিয়ার মতন এখানে অদৃশ্য শক্তিগুলো কী কী, যার কারণে সরাসরি উত্তর দেওয়া যায় না?
এই ঘটনা আমাদেরকে ২০১৮ সালের ২২ জানুয়ারি বিলাইছড়ির মারমা দুই বোনের ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়। তখনও প্রথমে ভুক্তভোগীর শরীরে রক্তক্ষরণের আলামত পাওয়া গিয়েছিল, পরে চাপ দিয়ে রিপোর্টকে ‘নেগেটিভ’বানানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতের সেই স্মৃতি আমাদেরকে সন্দিহান করে এবারের মারমা কিশোরীর ধর্ষণের রিপোর্ট নিয়েও। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের তনু হত্যার ক্ষেত্রেও মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণের প্রমাণ মুছে ফেলা হয়েছিল।
মারমা কিশোরীটি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত গুঁইমারার, তনু তো সমতলের, নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা একটি ক্যান্টনমেনের বাসিন্দা, কিন্তু উভয়ের ঘটনায় একটি মিল আছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতনভাবে যৌন সহিংসতার আলামত অস্বীকার করে এবং অপরাধীকে আড়াল করে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশে ধর্ষণ কেবল একটি লিঙ্গভিত্তিক অপরাধ নয়–এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় পরিচালিত একটি কাঠামোগত সহিংসতা।
তনু,মুনিয়া, চিংমা খিয়াং কিংবা গুঁইমারার মারমা কিশোরী—তাদের অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও, প্রতিটি ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধী যদি ক্ষমতাবান হয়, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই হয়ে ওঠে তার রক্ষাকবচ। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারীদের ক্ষেত্রে এই সহিংসতা আরও জটিল, কারণ সেখানে ধর্ষণ হয়ে ওঠে জাতিগত দমননীতির অংশ। প্রশাসনের অসহযোগিতা, আলামত ধ্বংস, এবং ‘ধর্ষণ হয়নি’— এই ধরণের বয়ানের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, বিচারহীনতা এখানে কেবল ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সচেতন রাষ্ট্রীয় কৌশল। এই বাস্তবতায়, ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না–এটি রাষ্ট্রের কাঠামো, সামরিকীকরণ এবং জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক প্রতিরোধ। যে ন্যায্যতার প্রসঙ্গে জুলাই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, সেই জমানায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের ঠিক করতে হবে, তারা কী ধরনের রাষ্ট্র চায়, কোন সমাজে বসবাস করতে চায় এবং কার নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিতে চায়। কারণ, নাগরিকের সামষ্টিক বোধের ওপরেই রাষ্ট্রের রূপরেখা নির্মিত হয়।